শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে বাঙালির হৃদয়াবেগ ও মানবিকতার অনন্ত পাঠ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবির্ভাব রবীন্দ্র-প্রতাপের এমন এক সময়ে, যখন বাংলা সাহিত্যের আকাশে রবীন্দ্রনাথের দীপ্তি প্রায় সর্বগ্রাসী। সাহিত্যরুচি, ভাষা, কাব্যবোধ, মনন ও নন্দনতত্ত্ব—সবখানেই রবীন্দ্র-প্রভাবের প্রবল বিস্তার। সেই সময়েই শরৎচন্দ্র এলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক স্বর নিয়ে। তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করলেন না, বঙ্কিমচন্দ্রের ঘটনাবহুল আখ্যানের পুনরাবৃত্তিও করলেন না; বরং প্রবেশ করলেন মানুষের একান্ত অন্তঃপুরে—যেখানে প্রেম আছে, অভিমান আছে, দারিদ্র্য আছে, লজ্জা আছে, সামাজিক নিষেধ আছে, পরাজয় আছে, অথচ সবকিছুর গভীরে আছে এক অবিনাশী মানবহৃদয়।

এ কারণেই বাঙালি পাঠক শরৎচন্দ্রকে কেবল একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে গ্রহণ করেননি; তাঁকে আপনজনের মতো করে হৃদয়ে ধারণ করেছেন। বাংলা কথাসাহিত্যে এমন পাঠক সম্পৃক্ততা বিরল। তাঁর চরিত্রেরা আমাদের চারপাশের মানুষ—আমাদের ঘরের মানুষ, পাশের বাড়ির মানুষ, গ্রামের মানুষ, শহরের মধ্যবিত্ত মানুষ, সমাজের প্রান্তে পড়ে থাকা মানুষ। তাদের কান্না আমাদের কান্নার মতো, তাদের ব্যর্থতা আমাদের ব্যর্থতার মতো, তাদের প্রেম আমাদের দীর্ঘশ্বাসের মতো। ফলে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য পড়া মানে কেবল একটি গল্প পড়া নয়; বরং নিজেরই কোনো বিস্মৃত অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড়ানো।

হুমায়ুন আজাদ যথার্থই বলেছিলেন, শরৎচন্দ্র বাঙালির ‘ভাবাবেগের জায়গাটি’ খুলে দিয়েছিলেন। তবে এই ভাবাবেগকে আরও নির্দিষ্ট করে ‘হৃদয়াবেগ’ বলতে চাই। শরৎচন্দ্রের মানুষেরা কেবল আবেগপ্রবণ নয়; তারা হৃদয় দিয়ে পৃথিবীকে বিচার করে। যুক্তি, সামাজিক বিধান, জাতপাত, অর্থনৈতিক স্বার্থ—এসবের ঊর্ধ্বে কখনো কখনো তাদের হৃদয় একটি স্বতন্ত্র নৈতিক বিধান তৈরি করে। সেই বিধানই শরৎসাহিত্যের গভীরতম শক্তি।

শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’ গল্পের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতপাত, বর্ণভেদ ও সামাজিক শ্রেণিবিভাজনে জর্জরিত এক সমাজে সাপুড়ের মেয়ে বিলাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসা মৃত্যুঞ্জয়ের জীবনকে আমূল পরিবর্তিত করে। মৃত্যুঞ্জয় শুধু সামাজিক বিধিনিষেধ অতিক্রম করে বিলাসীকে গ্রহণই করে না; তার জীবনযাপন, পরিচয় ও মূল্যবোধেও ঘটে এক গভীর রূপান্তর। এখানে প্রেম কোনো অলংকার নয়, কোনো রোমান্টিক আয়োজনও নয়; প্রেম হয়ে ওঠে সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ প্রবল মানবিক বিদ্রোহ।

‘মেজদিদি’তে কেষ্টার প্রতি হেমাঙ্গিনীর মমতা একই মানবিক বোধের অন্য রূপ। রক্তের সম্পর্ক যেখানে ব্যর্থ, সেখানে হৃদয়ের সম্পর্ক আশ্রয় দেয়। সমাজের বিধান মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু মানবিকতা তাকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনে। শরৎচন্দ্র যেন বারবার দেখাতে চান—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার জাতিতে নয়, বর্ণে নয়, সম্পদে নয়; তার প্রকৃত পরিচয় হৃদয়ের সক্ষমতায়।

এই মানবিকতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রকাশ ‘মহেশ’-এ। গফুরের নিজের ঘরে অন্ন নেই, নিজের সন্তানের মুখে খাবার নেই; তবু মহেশ তার কাছে নিছক একটি গবাদিপশু নয়। মহেশ হয়ে ওঠে তার সংসারের এক সদস্য, তার দারিদ্র্যের সঙ্গী, তার নিঃসঙ্গতার আশ্রয়। নিজের খাবার থেকে ভাগ দিয়ে, ভাঙা ঘরের ছন ছিঁড়ে খেতে দিয়ে অভাবের মধ্যেও প্রাণীটির প্রতি যে মমতা গফুর দেখায়—তা নিছক পশুপ্রেমের সীমায় আবদ্ধ থাকে না। মহেশ ক্রমে ব্যক্তিসত্তার মর্যাদা পেয়ে যায়।

১০ টাকায় মহেশকে বিক্রি করার পর তাকে যখন রশি ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন গফুরের আকস্মিক উন্মত্ততা পাঠককে শুধু আবেগাপ্লুত করে না; মানুষের অসহায় ভালোবাসার এক নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করায়। যে মানুষটি নিজেই ক্ষুধার্ত, সেই মানুষটির হৃদয়ে অন্য একটি প্রাণীর জন্য এত গভীর মমতা কীভাবে জন্ম নেয়—এই প্রশ্নের মধ্যেই শরৎচন্দ্রের মানবতাবাদ নিহিত।

আধুনিক বস্তুবাদী সভ্যতা মানুষকে ক্রমশ হিসাবি করে তুলছে। সম্পর্কের মধ্যেও লাভ-ক্ষতির অঙ্ক প্রবেশ করেছে। ভালোবাসা কখনো কখনো সুবিধার সমীকরণে পরিণত হচ্ছে। মানুষ তার প্রয়োজনের বাইরে তাকাতে ভুলে যাচ্ছে। অথচ শরৎচন্দ্রের সাহিত্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ যতই যান্ত্রিক হোক, তার অন্তর্গত হৃদয় সম্পূর্ণ যন্ত্রে পরিণত হয় না। কোথাও না কোথাও মমতার একটি ক্ষীণ প্রদীপ জ্বলে থাকে। সেই প্রদীপই মানুষকে মানুষ করে রাখে।

শরৎচন্দ্রের চরিত্র সৃষ্টির আরেকটি অনন্য দিক তাঁর নারী চরিত্র। বাংলা সাহিত্যে নারীর জীবনকে এত গভীর সহানুভূতি, মমতা ও অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে উপস্থাপনকারী লেখক খুব বেশি নেই। তাঁর নারীরা কেবল প্রেমের উপকরণ নয়, কেবল পুরুষের জীবনের পরিপূরকও নয়; তারা নিজস্ব যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদা, সিদ্ধান্ত ও স্বপ্ন নিয়ে পূর্ণ মানুষ।

‘বড়দিদি’, ‘দেবদাস’, ‘পরিণীতা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘শুভদা’, ‘দত্তা’, ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’, ‘শেষপ্রশ্ন’—প্রতিটি রচনায় নারীজীবনের ভিন্ন ভিন্ন সংকট, সম্ভাবনা ও অন্তর্গত ক্ষতকে তিনি উন্মোচন করেছেন। বিশেষ করে সমাজের তথাকথিত পতিতা বা পতিত চরিত্রগুলোর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিস্ময়করভাবে মানবিক। তিনি তাদের পেশা দিয়ে বিচার করেননি; তাদের মানুষ হিসেবে দেখেছেন। ফলে পাঠকের মনে ঘৃণার পরিবর্তে মায়া জন্ম নেয়, অবজ্ঞার পরিবর্তে সহানুভূতি জাগে। একজন শিল্পীর মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।

শরৎচন্দ্রের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কেউ কেউ পাশ্চাত্য সাহিত্যিকদের প্রভাবের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এমিল জোলা, দস্তয়েভস্কি কিংবা ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাবের কথাও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু শরৎচন্দ্রকে কেবল পাশ্চাত্য প্রভাবের আলোয় বিচার করলে তাঁর সৃষ্টির নিজস্ব মাটির গন্ধটি অনুধাবন করা কঠিন। তাঁর সাহিত্য মূলত বাংলার মাটি, নদী, গ্রাম, মধ্যবিত্ত সংসার, সামাজিক বিধিনিষেধ, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং মানুষের সহজাত অনুভূতি থেকে উৎসারিত। তিনি জীবনকে দূর থেকে দেখেননি; জীবনের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন।

তাঁর নিজের ভাষাতেই বলা যায়—জীবনে সঞ্চিত অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন তাঁর সাহিত্যে। এই জীবন-অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যের প্রধান পুঁজি। ভবঘুরে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ এবং সমাজের বিভিন্ন স্তর পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা তাঁকে এমন এক বাস্তবতাবোধ দিয়েছিল, যা কেবল কল্পনার আশ্রয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।

‘শ্রীকান্ত’ তার অনন্য প্রমাণ। শ্রীকান্ত যেন এক ব্যক্তিমানুষের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, আর তার ভেতর দিয়ে শরৎচন্দ্র দেখেছেন বিস্তৃত ভারতবর্ষীয় সমাজকে। ইন্দ্রনাথ চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় কিশোর চরিত্র। সাহস, দুরন্তপনা, উদারতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক দৃঢ়তায় সে অনন্য। রাত্রির অন্ধকারে শ্রীকান্তকে সঙ্গে নিয়ে মাছ চুরি করতে যাওয়া যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি মরদেহকে নৌকায় তুলে নেওয়ার ঘটনায় তার ‘মরার আবার জাত কী রে!’ উচ্চারণটি তার চরিত্রের অন্তর্গত অসাম্প্রদায়িক মানবতাকে একমুহূর্তে উন্মোচিত করে।

এই একটি বাক্যেই যেন শরৎচন্দ্রের বৃহৎ মানবতাবাদী দর্শনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। জীবিত মানুষের জাত নিয়ে যে সমাজ এত বিভক্ত, মৃত্যুর পরও সে মানুষকে জাতের খাঁচায় বন্দী করতে চায়। ইন্দ্রনাথ সেই বিভাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলে, মৃত মানুষের আবার জাত কী? এই প্রশ্ন শুধু একটি চরিত্রের সংলাপ নয়; এটি এক গভীর সামাজিক প্রশ্ন।

‘রাজলক্ষ্মী’ ও ‘শ্রীকান্ত’-এর সম্পর্কেও শরৎচন্দ্র প্রেমকে প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে নিয়ে গেছেন। সেখানে প্রেম শুধু মিলনের আকাঙ্ক্ষা নয়; প্রেম স্মৃতি, দায়িত্ব, অপরাধবোধ, আত্মমর্যাদা, বিচ্ছেদ এবং প্রত্যাবর্তনের এক জটিল মনস্তত্ত্ব। শরৎচন্দ্রের প্রেম তাই নিছক রোমান্টিক নয়; তার সঙ্গে মিশে থাকে জীবনের নির্মম বাস্তবতা।

‘দেবদাস’-এর জনপ্রিয়তার রহস্যও এখানেই। দেবদাস কেবল একজন ব্যর্থ প্রেমিক নয়; সে এক সামাজিক ও মানসিক পরাজয়ের প্রতীক। পার্বতীর সঙ্গে তার সম্পর্ক সামাজিক শ্রেণিবিভাজন, পারিবারিক অহংকার ও ব্যক্তিগত দুর্বলতার কাছে পরাজিত হয়। চন্দ্রমুখীর ভালোবাসা তার সামনে মুক্তির একটি সম্ভাবনা তৈরি করলেও দেবদাস নিজের অন্তর্গত দুর্বলতার কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে ‘দেবদাস’ কেবল প্রেমের গল্প নয়; এটি আত্মবিনাশী দ্বিধা, সামাজিক সংকোচ এবং অপূর্ণতার এক চিরন্তন আখ্যান।

শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ তাঁর অসাধারণ গল্প বলার ক্ষমতা। তিনি পাঠককে গল্পের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন না; গল্পের ভেতরে টেনে নেন। ‘বড়দিদি’ প্রকাশের পর পাঠকের একাংশের ধারণা হয়েছিল, এটি রবীন্দ্রনাথের লেখা। পরবর্তী সময়ে ‘শ্রীকান্ত’-এর ধারাবাহিক প্রকাশের ক্ষেত্রেও পাঠকের আগ্রহ তাঁকে একাধিক খণ্ড রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। এই পাঠক সম্পৃক্ততাই তাঁর সাহিত্যিক জনপ্রিয়তার গভীর ভিত্তি।

তবে জনপ্রিয়তা মানেই শিল্পের সরলীকরণ নয়। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে কেবল আবেগনির্ভর বা অতিরিক্ত বর্ণনাময় বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া তাঁর শিল্পসত্তাকে খাটো করা। যে লেখক সাধারণ মানুষের দুঃখকে এমন সর্বজনীন করে তুলতে পারেন, যে লেখক প্রান্তিক মানুষের বেদনা পাঠকের ব্যক্তিগত বেদনায় রূপান্তরিত করতে পারেন, তাঁর শিল্পের ভিত নিছক আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। সেখানে রয়েছে সূক্ষ্ম সমাজবোধ, চরিত্র পর্যবেক্ষণ এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি।

একালের পাঠক নতুন তত্ত্ব, নতুন দর্শন, নতুন নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত। আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা, নারীবাদ, মার্ক্সবাদ, মনোবিশ্লেষণ, অস্তিত্ববাদ—সাহিত্য পাঠের নানা নতুন দরজা আমাদের সামনে খুলেছে। এসব দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু নতুন তত্ত্বের আলো হাতে নিয়ে পুরোনো শিল্পকে অন্ধকার বলে ঘোষণা করা কখনোই প্রজ্ঞার লক্ষণ নয়। রবীন্দ্রনাথ বড় না নজরুল বড়—এই প্রশ্ন যেমন অবান্তর, তেমনি শামসুর রাহমান বড় না আল মাহমুদ বড়, বঙ্কিম বড় না শরৎ বড়—এ ধরনের তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণও সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন নয়।

প্রত্যেক মহৎ স্রষ্টার নিজস্ব মহাকাশ আছে। রবীন্দ্রনাথের আকাশ রবীন্দ্রনাথের, নজরুলের আগুন নজরুলের, বঙ্কিমের স্থাপত্য বঙ্কিমের, শরৎচন্দ্রের হৃদয়জগৎ শরৎচন্দ্রের। একজনের আলো দিয়ে অন্যজনের সূর্য মাপা যায় না।

শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রচলিত অভিযোগগুলোর একটি হলো—তিনি সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু সমস্যার উত্তরণের পথ দেখাননি। এ অভিযোগের মধ্যেও কিছু সত্য থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্যকে কি সর্বদা সমাধানের নির্দেশিকা হতে হবে? একজন ঔপন্যাসিক সমাজের অসুখ শনাক্ত করবেন, মানুষের যন্ত্রণা দেখাবেন, সংকটের অন্তর্গত কারণ উন্মোচন করবেন—এটিও তো সাহিত্যের বড় কাজ। চিকিৎসক রোগনির্ণয় করেন; প্রত্যেক রোগীর জীবনযাপনের সম্পূর্ণ বিধান তিনি লিখে দেন না। সাহিত্যিকও তেমনি সমাজের আয়না ধরতে পারেন। সেই আয়নায় নিজের মুখ দেখে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পাঠকই নেবেন।

‘গৃহদাহ’-এ মহিম, অচলা ও সুরেশের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র যে নৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব নির্মাণ করেছেন, তার পরিণতি নিয়েও বিতর্ক আছে। কিন্তু বিতর্কই তো সাহিত্যকে জীবন্ত রাখে। একইভাবে ‘চরিত্রহীন’, ‘শেষপ্রশ্ন’ কিংবা ‘পথের দাবী’—প্রতিটি রচনায় তিনি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। কোথাও তিনি অগ্রসর, কোথাও তাঁর সময়ের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ; কিন্তু তাঁর প্রশ্ন করার সাহসকে অস্বীকার করা যায় না।

এখানেই শরৎচন্দ্রকে পুনরায় পাঠ করার প্রয়োজন। তাঁকে কেবল ‘জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক’ বলে ছোট করা যেমন অন্যায়, তেমনি তাঁকে তাঁর সময়ের বাইরে দাঁড় করিয়ে বিচার করাও অনুচিত। একজন শিল্পীকে বুঝতে হলে তাঁর সময়, সমাজ, মূল্যবোধ ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাঁকে দেখতে হয়। শরৎচন্দ্র তাঁর সময়ের সন্তান, কিন্তু তাঁর মানবিকতা সময়ের সীমানা অতিক্রম করেছে।

বঙ্কিমচন্দ্রের শিল্পশক্তি অসামান্য; রবীন্দ্রনাথের মনোজগৎ অনন্ত; কিন্তু শরৎচন্দ্র মানুষের চোখের জল, ঘরের অন্ধকার, অভাবের দীর্ঘশ্বাস, প্রেমের অপমান, নারীর নিঃশব্দ বেদনা, প্রান্তিক মানুষের অবহেলা এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গোপন আলোকে এমনভাবে সাহিত্যে ধারণ করেছেন যে তাঁর পাঠ কখনো সম্পূর্ণ পুরোনো হয়ে যায় না।

আজকের পৃথিবীতে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক বেশি একা। প্রযুক্তি মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্বও বাড়িয়েছে। সম্পর্ক দ্রুত তৈরি হয়, দ্রুত ভেঙে যায়। অনুভূতি প্রকাশের ভাষা বেড়েছে, কিন্তু অনুভব করার ক্ষমতা যেন কোথাও ক্ষীণ হয়েছে। এই সময়েই শরৎচন্দ্রের কাছে ফিরে যাওয়া জরুরি।

শরৎচন্দ্র আমাদের শেখান—মানুষকে তার পরিচয়ে নয়, তার হৃদয়ে দেখতে। পতিতাকে কেবল পতিতা হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দেখতে; দরিদ্রকে করুণার বস্তু না করে তার মর্যাদা বুঝতে; পশুর মধ্যেও স্নেহের অধিকারী এক প্রাণকে চিনতে; নারীকে কেবল সংসারের অলংকার নয়, পূর্ণ মানবসত্তা হিসেবে গ্রহণ করতে; জাতপাতের প্রাচীরের ওপারে গিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে।

শরৎচন্দ্র তাই কেবল গল্পকার নন; তিনি বাঙালির হৃদয়ের এক নিবিড় ভাষ্যকার। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়, সভ্যতার সমস্ত বাহ্যিক চাকচিক্য, মতবাদ, দর্শন ও তর্কের শেষে মানুষকে মানুষ করে রাখে তার হৃদয়। যত দিন মানুষের চোখে জল থাকবে, যত দিন ভালোবাসা অসম্পূর্ণ থেকেও মানুষের জীবনকে আলোড়িত করবে, যত দিন সমাজের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কোনো একটি কোমল হৃদয় দাঁড়িয়ে যাবে, তত দিন শরৎচন্দ্র পাঠের প্রয়োজন ফুরাবে না।

মানুষই যেখানে শেষ কথা, সেখানে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য কখনো অসাড় হতে পারে না। তাঁর কলমের কালি দিয়ে কেবল কাহিনি লেখা হয়নি; সেখানে মিশে আছে বাঙালির দীর্ঘদিনের কান্না, ভালোবাসা, অভিমান, মমতা ও মানবিকতার উষ্ণ রক্তধারা।

এ কারণেই শরৎচন্দ্রকে বারবার পড়তে হয়। নতুন তত্ত্বের চোখে নয় শুধু, নিজের হৃদয়ের চোখেও। তাঁকে পুনর্মূল্যায়ন করার অর্থ অতীতকে আঁকড়ে থাকা নয়; বরং বর্তমানের যান্ত্রিকতার মধ্যে মানুষকে আবার মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করা।
শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই। তিনি আমাদের ভুলতে দেননি যে মানুষ শেষ পর্যন্ত একটি হৃদয়বান প্রাণী। আর সেই হৃদয়ের ভাষা যত দিন পৃথিবীতে থাকবে, শরৎচন্দ্রও তত দিন বেঁচে থাকবেন পাঠকের অন্তরে।

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ