চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ হবে কবে

চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। ছোড়া পাথরের আঘাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ট্রেনের যাত্রীরাছবি: লেখকের সৌজন্যে

কু ঝিক ঝিক কু ঝিক ঝিক করে ছুটে চলেছে ট্রেন। মাঝপথে হঠাৎ বাইর থেকে পাথর এসে পড়ল মাথায়, রক্তাক্ত হলো শরীর! একবার ভাবুন যাত্রাপথে যদি এসব পরিস্থিতিতে পড়তে হয় কেমন লাগে? চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারার ঘটনাটি দেশে নতুন নয়। ১৮৫৩ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ট্রেন যাত্রা শুরু করে। নিরাপদ যাত্রার অন্যতম মাধ্যম বাংলাদেশ রেলওয়ে। ট্রেনযাত্রা মানে আরামদায়ক ভ্রমণ। রেলওয়ে খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা দরকার। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতিদিন প্রায় ১৪ হাজারের বেশি ট্রেন নিরাপদে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রদেশে আসা–যাওয়া করে। সকালে ট্রেনে করে অফিস গিয়ে আবার নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসেন চাকরিজীবীরা।

রাজধানী এক্সেপ্রেসে কলকাতা থেকে দিল্লি গিয়েছিলাম; এত চমৎকার আসনব্যবস্থা, ট্রেনের অভ্যন্তরে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনা এত সুন্দর, যে কেউ দেখে মুগ্ধ হবে। বেশির ভাগ যাত্রীর হাতে বই। ট্রেনে বসে সবাই বই পড়ছে। অন্যদিকে আমাদের দেশে সবার হাতে হাতে মুঠোফোন থাকে; কেউ কারও সঙ্গে গল্পও করে না, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মুঠোফোন ব্যবহার করে।

আমাদের হাতেগোনা কয়েকটি আন্তনগর ট্রেন। তাও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। চুরি–ছিনতাই লেগেই থাকে। নিরাপত্তা বা নিরাপদ শব্দ দুটি আমাদের অভিধানে আছে, বাস্তবে নেই। নিরাপদ যাত্রার জন্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারে সুবর্ণ এক্সপ্রেস, সোনার বাংলা ও পর্যটক এক্সপ্রেসে আসা–যাওয়া করে দেশের সাধারণ মানুষ। নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা যদি হয় মৃত্যুফাঁদ, কেমন লাগে?

ইদানীং চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। ছোড়া পাথরের আঘাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ট্রেনের যাত্রীরা। এই ঘটনা নতুন নয়, ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। ১৮ এপ্রিল সোনার বাংলায় করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফিরছিলাম। লাকসামের কাছাকাছি আসতে হঠাৎ ট্রেনের জানালা দিয়ে পাথর ছুড়ে মাড়ল। একটুর জন্য মাথায় লাগেনি। প্রায় দিনই ঘটছে এমন ঘটনা।

২৭ এপ্রিল কক্সবাজার আন্তনগর ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। চকরিয়া এলাকায় ছোড়া পাথরের আঘাতে হিমেল আহমেদ নামে এক যাত্রীর চারটি দাঁত ভেঙে গেছে। একই বগিতে আবু সাঈদ নামে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁরা দুজনে দিনাজপুর থেকে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন, ফেরার পথে পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হলেন। গত ২০ জানুয়ারি কক্সবাজার পর্যটক এক্সপ্রেসে ট্রেনের বাইর থেকে ছোড়া পাথরে গুরুতর আহত হয় ৯ বছর বয়সী একটি শিশু। ৮ জানুয়ারি সুবর্ণ এক্সপ্রেসে কুমিল্লা ময়নামতি এলাকায় বাইর থেকে ছোড়া পাথরে এক যাত্রীর মাথা ফেটে যায়। মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে এই রুটে চারবারের বেশি পাথর নিক্ষেপ হয়েছে; বছরে গড়ে ১০০ বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীরাও রেহাই পাচ্ছেন না পাথরের আঘাত থেকে। শিশু থেকে শুরু করে যুবক–যুবতী, বৃদ্ধা কেউ রেহাই পাচ্ছে না। পাথর ছুড়ে মারার হটস্পট কিংবা পাথর নিক্ষেপের জায়গাগুলো এখনই চিহ্নিত করা জরুরি।

দেশের ১৫টির বেশি জায়গা আছে যেখানে প্রায় দিনই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায় কিছু বিপথগামী শিশু ও কিশোর গ্যাং, দুর্বৃত্ত, বখাটেরা। তাদের কাছে হয়তো বিষয়টা ক্ষণিক আনন্দের। কিন্তু তারা জানে না ছুড়ে মারা ছোট পাথর অনেক পরিবারের জন্য সারা জীবনের কান্নার। চট্টগ্রামের ২নং গেট রেলক্রসিং, পাহাড়তলী, ভাটিয়ারী, বাড়বকুণ্ডু, চকরিয়া, হারবাং, কুমিল্লা, ফেনীর ফাজিলপুর, কালদহ, নরসিংদী, জিনারদী, ঘোড়াশাল, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারীর সৈয়দপুর, আক্কেলপুর, উল্লাপাড়া, যমুনা সেতু, খুলনার ফুলতলা, বেনাপোল এলাকায় বিভিন্ন সময়ে চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ।

২০২৩ সালে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ট্রেনে অন্তত ১৪৫ বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছে ৩৯ জনের বেশি। কক্সবাজার রুটে হয়েছে সবচেয়ে বেশি ৩৮টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা, ১৪ জনের বেশি আহত হয়েছে। ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী কৌশিক পাল শাটল ট্রেনে করে সন্ধ্যায় শহরে ফিরছিলেন; ২নং গেট রেলক্রসিং এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ছোড়া পাথরের আঘাতে মারাত্মক আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হতে হয়েছিলেন।

গত ৮ বছরে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙেছে, বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছুদিন আগে সুবর্ণ এক্সপ্রেসে বাড়ি যাচ্ছিলাম; কুমিল্লা–ফেনীর মাঝখানে জায়গাটার নাম মনে নেই। জানালার ফটক দিয়ে বিশাল সাইজের পাথর এসে পড়ে এক যাত্রীর মাথায়। মাথা ফেটে গুরুতর আহত হন। ২০১৩ সালে ঈদের ছুটি শেষে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরছিলাম। ট্রেনের অন্য বগিতে ছিল প্রকৌশলী প্রীতি দাশ (২৪); বিয়ে হয়েছে মাত্র ১৭ মাস। ভাটিয়ারী এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ছুড়ে মারা পাথরের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে খুলনা–বেনাপোল রোডে কমিউটার ট্রেনে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরের আঘাতে চলন্ত ট্রেনের পরিদর্শক বায়েজিদ মারাত্মক আঘাত পান। ৪১ দিন পর মৃত্যুর কাছে হার মানেন। সৈয়দপুরে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরে এক শিশুর চোখ নষ্ট হয়ে যায়। চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনা বারবার হচ্ছে, কিন্তু প্রতিকার নেই। কর্তৃপক্ষ দেখে দেখে তন্দ্রাবিলাস করছে।

এই ব্যাধি থেকে ট্রেনের যাত্রীরা পরিত্রাণ চায়। এ জন্য চাই জনসচেতনতা। ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দিব কোথা’ ভেবে বসে থাকলে চলবে না। পাথর ছোড়ার এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ওই এলাকায় সচেতনতামূলক বিভিন্ন ক্যাম্পেইন, মাইকিং, বস্তি এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে মানববন্ধন, কাউন্সেলিং, স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম করা যেতে পারে। তার আগে রেললাইনের পাশে বস্তিগুলো উচ্ছেদ করা জরুরি। রেললাইনের পাশে অনেক সরকারি সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে। অনেক রাঘববোয়াল রেলওয়ের জমি গ্রাস করে নিয়েছে। সরকারি জমিগুলো উদ্ধারের নাম-বালাই নেই। রেললাইনের আশপাশে গড়ে ওঠা ভাসমান বস্তিগুলো অপরাধজোন হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন এলাকায় খুন, ছিনতাই, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, গাঁজা, মাদক ও ইয়াবা, আইস ব্যবসা এসব বস্তি এলাকায় থেকে হয়ে থাকে। সংবাদপত্রে এসব নিয়ে লেখালেখি নিয়মিত হয়।

পুলিশ প্রশাসন বিশেষ করে রেলওয়ে পুলিশ এবং রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের আরও বিচক্ষণ ও সজাগ হওয়া জরুরি। সাধারণ জনগণের ট্রেনযাত্রা নিরাপদ করার লক্ষ্যে পাথর নিক্ষেপ করা জায়গাগুলো চিহ্নিত করে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা যেতে পারে।

চলন্ত ট্রেনে কেউ পাথর নিক্ষেপ করবেন না। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। রেলওয়ে আইনে ১২৭ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৩০২ ধারা অনুযায়ী পাথর নিক্ষেপে কারও মৃত্যু হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

উপদেষ্টা, পটিয়া বন্ধুসভা