শব্দের সুর

ফাইল ছবি

মাঝেমধ্যে মনে হয় কত কম শব্দ জানি আমি। লেখার সময় হাওয়া কে হাওয়া, রাস্তাকে রাস্তা, মন খারাপকে মন খারাপ লিখি। ভয় করে, এই কয়েকটা শব্দ সম্বল করে কত দূর আর যেতে পারব। ভয়ের ভেতর খাঁচা তৈরি হয়। সেই খাঁচায় পুষে রাখি লিখতে না পারা শব্দ। কখনো ভীষণ জ্বরের ঘোরে কথা জড়িয়ে গেলে, সেই খাঁচার দরজা আপনা–আপনি খুলে যেতে দেখেছি।

শব্দের অভাবে যে অনুভূতিগুলো দূরের পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, তার মধ্যবর্তী দূরত্বে ছোট্ট একখানা ঘর বাঁধার চেষ্টা করছি। যাতে হারিয়ে গেলে কোথাও অন্তত ফিরে আসতে পারি। হঠাৎ হঠাৎ ঠান্ডা হাওয়ায় যে ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসে, সেই ঘ্রাণ লিখে রাখতে ইচ্ছা করেনি, এমন অনেক দিন হয়েছে। হয়তো পরে কোনো শূন্যতায় জড়ানো বারান্দায় সেই না লেখা গন্ধ ফুল হয়ে ফুটেছে।

যতবার হোঁচট খাই লিখতে গিয়ে, কান্না আসে প্রথমে, তারপর আসে বিস্তৃত ধানখেত। সেই ধানখেতে নিজেকে শুয়ে থাকতে দেখেছি ঘুড়ির চশমা দিয়ে। শব্দ খুঁজতে ইচ্ছা করেনি যে সমস্ত দিন, এক মুঠো করে ধান তুলে রেখে রেখেছি নিজের কাছে। এমন কত দিন হয়েছে ভাতের ফ্যান গালতে গিয়ে কবিতা এসেছে, লিখতে বসে কেবলই খিদে।

একই শব্দ লিখব না বলে সাদা কাগজ চিঠির খামে ভরে পাঠিয়েছি তোমায় গত শ্রাবণেও। তোমার অভিমানে বলা প্রতিটি শব্দ যত্ন করে লিখে রেখেছি ডায়েরিতে। ভেবেছি কখনো না কখনো আমারও তো অভিমান হবে, তখন না হয় ফিরিয়ে দেব। প্রয়োজনে ডায়েরি খুলে দেখেছি, সে সব শব্দেরা নিজেরাই অভিমান করে নদী হয়ে গেছে, দুখানা নৌকা আঁকা ছাড়া কিই বা করার থাকে মানুষের।

আজকাল শব্দ হাতে পেলে ভেঙে ফেলি। সুন্দর সুর তৈরি হয়। তাতে অন্ধকার মিশিয়ে দিলে স্বপ্ন দেখি, পৃথিবীর সব ভাষার সব শব্দের মানে এক হয়ে যাচ্ছে। তারপর একে একে তারা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গুঁড়ো হয়ে উড়ে যাচ্ছে রংবেরঙের আবির হয়ে। আমি বইঠা ছাড়া নৌকায় বসে আছি শব্দ থেকে তৈরি হওয়া সেই নদীর বুকে আর না লেখা গন্ধের সেই একগুচ্ছ ফুল হাতে নিয়ে তুমি দাঁড়িয়ে আছ দূরের ধানখেতে।

তোমায় কিছু বলতে যাব, দেখি আমার ভয়ের ভেতরের সেই খাঁচায় পাখি ভর্তি। অথচ উড়ে যেতে ইচ্ছা করছে আমার।