সাহিত্য এক বহমান জলধারা, যার আদি উৎস রহস্যে ঘেরা আর শেষ সীমানা মানব হৃদয়ের গহনতম প্রদেশে। সেই অনন্ত স্রোতে অবিরাম খেলা করে যুগান্তরের স্বপ্ন, সমাজ-বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিবিম্ব এবং সৃষ্টির নিগূঢ় মনস্তত্ত্ব। নদী থেকে উৎসারিত তরঙ্গের মতোই কিছু প্রাজ্ঞ ও মননশীল প্রবন্ধের আশ্রয়ে আলোয় এসেছে গবেষক ও প্রাবন্ধিক মো. রেজাউল করিমের অনবদ্য সংকলন সাহিত্য পথের জলছবি গ্রন্থ। প্রাত্যহিক জীবনের যান্ত্রিক কোলাহলের মধ্যে এই গ্রন্থ যেন এক প্রদীপ্ত মশাল, যা পাঠকের জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি অন্তর্জগতেও আশ্চর্য আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়।
চারটি সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই গ্রন্থের প্রেক্ষাপট কাল ও সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকতার এক সুবিস্তৃত ক্যানভাসকে স্পর্শ করেছে। গ্রন্থের প্রথম পর্ব ‘সাহিত্য ও দর্শন’-এ শামস তাবরিজির সুফি দর্শনের আলোকে আধ্যাত্মিক প্রেমকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর পরপরই আলবেয়ার কামুর লেখনীতে মূর্ত অস্তিত্ববাদ থেকে শুরু করে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের জাদুবাস্তবতার এক গভীর ও চুলচেরা বিশ্লেষণ রয়েছে এই অংশে। পাশাপাশি বিশ্বভ্রমণের পরিব্রাজকরূপে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কীভাবে প্রকৃতি ও বহুমাত্রিক জীবনবোধকে আপন সত্তায় আত্মস্থ করেছিলেন, তারও এক অনবদ্য বুদ্ধিবৃত্তিক খতিয়ান তৈরি করেছেন লেখক।
বইটির দ্বিতীয় অধ্যায় ‘উপনিবেশ-উত্তর সাহিত্য’ বিশ্বজ্ঞানের এক বিস্তৃত দিগন্তকে উন্মোচিত করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর রুশ ধ্রুপদি সাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টি এবং রুশ কথাসাহিত্যের অভ্যন্তরে প্রচ্ছন্ন থাকা বিপ্লবী চেতনার প্রতিচ্ছবি এখানে নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে। বিশেষত আন্তন চেখভের গল্প বিশ্বে যে মানবিক স্বপ্ন ও সূক্ষ্ম সংবেদনার বুনন রয়েছে, তা লেখকের নিজস্ব ব্যাখ্যায় নতুন মাত্রা লাভ করেছে। এর সমান্তরালে নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক আবদুলরাজাক গুরনাহর সাহিত্যকীর্তির আশ্রয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের এক কাব্যিক অনুসন্ধান পাঠকের চিন্তার জগৎকে নতুনভাবে আন্দোলিত করে।
তবে কেবল আন্তর্জাতিক তত্ত্ব নয়, এই গ্রন্থের মূল শিকড়টি প্রোথিত রয়েছে স্বদেশি রসধারা ও বাঙালি দর্শনের গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মধ্যে। ‘বাংলা ও বাঙালি সাহিত্য বিশ্লেষণ’ নামের তৃতীয় পর্বে লেখক মহুয়া গীতিকার শাশ্বত প্রেম, চন্দ্রাবতীর জীবনের ট্র্যাজিক আখ্যান, জীবনানন্দের রহস্যময় অন্বেষণ এবং নজরুলসংগীতে পরমাত্মার মিলনকে এক নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন। গ্রন্থের শেষ পরিচ্ছেদে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের আত্তীকরণ এবং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সাহিত্যের পৌঁছানোর পথে বিদ্যমান সংকট ও সম্ভাবনার এক বস্তুনিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সাহিত্য পথের জলছবির প্রতিটি গদ্য যেন একেকটি মননশীল স্ফুলিঙ্গ, যা পাঠককে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক তৃপ্তি দেয় না; বরং অনুভবের এক অতল সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই গ্রন্থের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অতীত ও বর্তমানের, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এবং আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে জাগতিকতার এক শাশ্বত সংলাপের অবতারণা। সাহিত্য যে কেবল পাঠের বিষয় নয়; বরং এক গভীর আত্মিক অনুভূতির নাম—এই দৃঢ়প্রত্যয় থেকেই বইটির সৃষ্টি। মননশীল ও চিন্তাশীল পাঠকদের জন্য সমাজচিন্তক ও লেখক মো. রেজাউল করিমের এই গ্রন্থটি অন্তরে একধরনের ভিন্ন অনুভবের জন্ম দেবে, পাঠ করতে গিয়ে যা আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে। গ্রন্থটি প্রকাশনা করেছে বিজয় প্রকাশ, মূল্য ৩২০ টাকা।
লেখক, গবেষক ও কবি