পরিবারের এমন উদ্ভট আচরণের ভুক্তভোগী আমি ও ছোট মামা। ছোট মামা একটু অদ্ভুত ধরনের মানুষ। বয়সে আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড়। মামার সঙ্গে আমার বন্ধুর মতো সম্পর্ক। দুজনের অনেক কিছুই মেলে। পরিবারের সবাই আমাদের মানিকজোড় বলে ডাকে।

একদিন সন্ধ্যায় আমরা সবাই ছোট মামার জন্য পাত্রী দেখতে যাই। পাত্রীর বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবারের সবাই কথা বলল, পাত্রীও দেখা হলো। শুধু আমি আর ছোট মামা চুপচাপ ছিলাম। এর মধ্যে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। পাত্রীপক্ষের নাকি আমাকে পছন্দ হয়েছে। তাঁরা এখন ছোট মামা নয়, আমার সঙ্গেই বিয়ে দিতে আগ্রহী। আমি চোখ বড় বড় করে মা আর বড় মামার দিকে তাকালাম। কিন্তু তাঁদের দেখে মনে হলো যেন কিছুই হয়নি। বেশ স্বাচ্ছ্যন্দেই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন।

এদিকে আমার মাথার ওপর যেন বাজ পড়ল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম ছোট মামার দিকে, আর তিনি তাকিয়ে আছেন ঘরের সিলিংয়ের দিকে। আমার পরিবারের লোকজনের মতিগতি আমার কাছে ভালো ঠেকল না, মনে হচ্ছে তাঁরা আমাকে বিয়ে করিয়েই এখান থেকে নিয়ে যাবেন। আমি ছোট মামার হাত ধরে একপ্রকার জোর করেই সেখান থেকে বের হয়ে ছাদে গেলাম। প্রায় কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে মামাকে বললাম,
—মামা, তাড়াতাড়ি কোনো বুদ্ধি বের করো। না হলে আমি কিন্তু এই ছাদ থেকে লাফ দেব বলে দিচ্ছি।
—আরে থাম, একটু ভাবতে দে।
—রাখো তোমার ভাবাভাবি। যা করার দ্রুত করো, না হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
—না না, এই মামা বেঁচে থাকতে তোর এত চিন্তা করতে হবে না।
—হ্যাঁ, তা হবে কেন, শুধু মামাকে বাকি রেখে বিয়েটাই করতে হবে।
ভেংচি কাটলাম আমি। এবার মনে হয় মামা আসলেই চিন্তায় ডুবে গেলেন। পাঁচ বছরের বড় মামা অবিবাহিত থাকতে ভাগনের বিয়ে! না, এ যে বড় লজ্জার কথা! মামা অনেকক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর হঠাৎ বললেন,
—পেয়ে গেছি।
—কী পেয়ে গেছ? কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলাম।
—সমাধান পেয়ে গেছি। তুই এখানে থাক, আমি ভাইজানের সঙ্গে কথা বলে শিওর হয়ে আসি বিয়েটা আজই হচ্ছে কি না।
—মানে কী, তুমি কি বিয়ে ভাঙার প্ল্যান করছ, নাকি বিয়ে করানোর প্ল্যান?
—সেটা তোর মোটা মাথায় ঢুকবে না। তুই এখানে থাক, যা করার আমিই করব।

এই বলেই মামা সেখান থেকে চলে গেলেন। সেই যে গেলেন ফেরার আর নাম নেই। এদিকে অন্ধকারে মশার কামড় খেতে খেতে আমার অস্থিরতা কেবল বাড়ছে।
মিনিট বিশেক পর আমি নিচে গেলাম। গিয়ে দেখি বিয়ের তোড়জোড় চলছে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ছোট মামা কোথায়। মা জানালেন, সে নাকি কাজি আনতে গেছে। কাজি ছোট মামার বেশ পরিচিত। এলাকায় খুব নামডাক আছে। সঙ্গে নাকি জিন আছে। হাত দেখেই ভাগ্য বলে দিতে পারে সেই জিন। ছোট মামা নেই শুনে এমনিতেই মেজাজ খারাপ, তার ওপর মায়ের এমন ফালতু গল্প আর সহ্য হচ্ছিল না।
খানিকবাদেই কাজি নিয়ে ছোট মামা উপস্থিত। আমি তাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম হচ্ছেটা কী? মামা দেখেও যেন না দেখার ভান করলেন। বিয়ের কাজ শুরু করার জন্য আমাকে কাজি সাহেবের সামনে বসানো হলো। এর মধ্যে মেয়ের বাবা বললেন, ‘হুজুর ছেলের হাতটা একটু দেখুন তো, বিবাহ–পরবর্তী জীবন কেমন কাটবে।’
হুজুর দীর্ঘ সময় বসে আমার হাত উল্টেপাল্টে দেখে কপাল কুঁচকে চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘ছেলের ভবিষ্যৎ বেশ ভালো। ভালো চাকরি, সুন্দরী বউ সবই আছে।’ এইটুকু শুনে ঘরের সবার মুখেই হাসি ফুটে উঠল। আবার বলা শুরু করলেন হুজুর, ‘কিন্তু এই মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে হলে সাত দিনের মাথায় মেয়ের বাবার মৃত্যু হবে।’
এ কথা শোনার পর সবার মুখ শুকিয়ে গেল। পরিবেশ একদম থমথমে। হুজুর আরও বলতে লাগলেন, ‘জিন মারফত জানতে পেরেছি, এই আসর থেকে কন্যাকে অবিবাহিত উঠিয়ে নিলে গোটা পরিবারের ওপর ভয়ানক বিপদ নেমে আসবে। ভয়াবহ বিপদ!’
পুরো ঘরভর্তি সবার চেহারায় শঙ্কার ছায়া। মেয়ের বাবা শঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে এখন উপায়?’ হুজুর একটা পান মুখে নিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বললেন, ‘উপায় একটা আছে। এই ঘরে আরেকজন অবিবাহিত ছেলে আছে, যাঁর ভাগ্যরেখার সঙ্গে মেয়ের ভাগ্যরেখার হুবহু মিল আছে। সেই ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান।’

তখন প্রায় সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘কে সেই ছেলে?’
হুজুর ছোট মামার দিকে ইশারা করলেন। ছোট মামা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে না বলে দিলেন। তাঁর জন্য মেয়ে দেখতে এসে ভাগনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটায় তিনি নাকি অনেক অপমানিত বোধ করেছেন। তাই এই বিয়ে তাঁর পক্ষে সম্ভব না। সবাই তখন মেয়ে ও মেয়ের বাবার জীবন রক্ষার জন্য ছোট মামাকে এই বিয়েটা করতে অনুরোধ করতে লাগল। মেয়ের বাবা তো পারলে ছোট মামার পায়ে পড়েন!
এবার আমি মামার চালটা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। মনে মনে মামার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না। কাজিকে দিয়ে কীভাবে এত বড় মিথ্যাটা বলিয়ে নিল, সেটাই কেবল আমার মাথায় ঢুকছে না। শেষমেশ সবার জোরাজুরিতে ছোট মামা বিয়েটা করেই ফেললেন।

বন্ধু, ঢাবি বন্ধুসভা

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন