বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এমন মুষলধারে বৃষ্টি আমি আগে কখনো দেখিনি। আমাদের পাঁচতলা ফ্ল্যাট থেকে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত দেখা যায়। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। রাস্তাঘাটে কোনো মানুষ নেই। চারপাশ অদ্ভুত রকমের নীরব। দুটো পাতিকাক নিজেদের মধ্যে গা–ঘেঁষাঘেঁষি করে একটি মেহগনিগাছের পাতার ফাঁকে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাক দুটি ভিজে একাকার।

চৈতির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল অমর একুশে বইমেলায়। সেটাও কাকতালীয় ভাবে। একটা মজার ঘটনার মধ্য দিয়ে। সেদিন সব কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যায় অমর একুশে বইমেলায় যাই। বেশ কয়েকটি বই কিনি। রাত ১০টার দিকে যখন মেলা থেকে বের হচ্ছি, তখন ছবির হাটের গেটের পাশে দেখতে পাই কিছু বইসমেত একটি ব্যাগ। মনে মনে ভাবলাম, কারও হাত থেকে পড়ে গেছে হয়তো। এসব ভাবতে ভাবতে ব্যাগটি তুলে নিলাম। তারপর বাসায় গিয়ে দেখি, ব্যাগের মধ্যে আনিসুল হকের লেখা ‘মা’, শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ ও বিখ্যাত জাপানি কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির ‘নরওয়েজিয়ান উড’ উপন্যাসটি। সঙ্গে আরও কয়েকজন তরুণ লেখকের বইও ছিল। চিন্তায় পড়ে গেলাম। বইয়ের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো মাধ্যম যে নেই। ওই ব্যাগে বই ছাড়া আর কিছু ছিল না। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বইপড়ুয়াদের ফেসবুক গ্রুপে ব্যাগটির ছবিসহ পাওয়া গেছে বলে একটা পোস্ট দিলাম। তবে বইয়ের ছবি দিইনি।

রাত ১২টার দিকে মেসেঞ্জারের রিকোয়েস্ট মেসেজ অপশনে গিয়ে দেখি এক অচেনা আইডি থেকে মেসেজ, ‘এক্সকিউজ মি! আপনি যে বইয়ের ব্যাগটি পেয়েছেন ওটা আমারই।’ ব্যাগে কী কী বই আছে, তা জানতে চাইলাম। চৈতি তা–ও ঠিকঠাক বলতে পারল। আরেকটা মুঠোফোন নম্বর দিয়ে আমাকে সময় করে বইমেলায় তার সঙ্গে দেখা করতে বলল। দুই দিন পর এক বিকেলে বইয়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে মেলায় যাই। চুলে বেলি ফুলের খোঁপা, হলুদ পাড়ের শাড়ি পরে এক লাস্যময়ী তরুণী আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণের জন্য যেন তার সৌন্দর্যে ডুবে গেলাম। ওর কণ্ঠ শুনে সংবিৎ ফিরে পাই।
—হ্যালো, আমি চৈতি। আপনি যে বইয়ের ব্যাগটি পেয়েছেন, ওটা আসলে আমারই ছিল। তাড়াহুড়া করে রিকশায় ওঠার সময় পড়ে গিয়েছিল।
—ও আচ্ছা।
তাকে কোথাও বসে কফি খেতে বললাম। কিন্তু সে মাঠে বসে বাদাম খেতে খেতে গল্প করা প্রাধান্য দিল। এভাবে চৈতির সঙ্গে আমার পরিচয়। তিন মাস পর্যন্ত টুকটাক মেসেঞ্জারে কথা হয়। খুবই সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে চৈতি। আমি মুগ্ধ হতাম। সেই মুগ্ধতা ধীরে ধীরে অনুভূতির সৃষ্টি করে। সেই অনুভূতির কথা চৈতিকে আমি নিজ মুখে বলতে পারিনি। দ্বারস্থ হয়েছিলাম ভার্চ্যুয়াল ডাকপিয়নের। যেদিন ভার্চ্যুয়াল ডাকপিয়ন আমার সেই অনুভূতির কথা পৌঁছে দিল তাঁর পাঁচ ইঞ্চির জাদুর বাক্সে, সেদিন চৈতির নম্বর থেকে কল পেয়ে চমকে উঠি। ভাবলাম, হয়তো বকাঝকা করবে। কিন্তু আমার এলোমেলো ভাবনাগুলোকে ভুল প্রমাণ করে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে চৈতি বলল, ‘আপনার মনে কি এতটুকুনও সাহস নেই কথাগুলো আমাকে সরাসরি বলার। কী আজব মানুষরে বাবা। চলুন আজ বিকেলে দেখা করি।’

সেই যে আমাদের গল্পের শুরু, তারপর কেটে গেছে চারটি বছর। এই চার বছরে আমরা হয়ে উঠি একে অপরের আত্মার বন্ধু। চার বছরে বইমেলা এল চারবার, বসন্ত হলো চারবার। বৈশাখ হলো চারবার। স্মৃতিগুলো এখনো জ্বলজ্বল করছে চোখে। একটা সময় চৈতির শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধে। আমাদের দুই পরিবার প্রাণপণে চেষ্টা করে তাকে সুস্থ করে তুলতে।
বাইরে এখনো প্রচুর বৃষ্টি। থামার লক্ষণ নেই। জানালার পাশে থাকা নারকেলগাছটা ঝড়–বাতাসের ঝাপটায় দুলছে। চৈতিকে আমি হাসপাতালের বেডে কথা দিয়েছিলাম, ‘নরওয়েজিয়ান উড’ পড়ে তাকে এর অনুভূতি জানাব। চৈতি সেদিন আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে বলেছিল, ‘কেন এত পাগলামি করছ। এত মিছে স্বপ্নই বা কেন বুনছ।’ আমি বলি, ‘বন্ধু হয়েছি পাশে থাকব বলে। পালিয়ে যেতে নয়।’

মাত্র ‘নরওয়েজিয়ান উড’ পড়ে শেষ করলাম। ষাটের দশকের শেষ দিকে জাপানের টোকিও শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে পড়তে আসা তরু ওয়াতানাবেকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে উপজীব্য করে এগিয়ে যাওয়া উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পরপরই মৌলিক রচনার মধ্যে দ্রুত পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সহজ–সরল বর্ণনায় কাল্পনিক চরিত্রগুলো বাস্তবিক হয়ে উঠেছে। উপন্যাসের শুরুতে একটা সময় গিয়ে মনে হবে অন্তরঙ্গতা এর মূল বিষয়বস্তু। কিন্তু আরেকটা সময় চমকপ্রদ কিছু ঘটনার সাবলীল বর্ণনা সেই ভুল ভাঙিয়ে পাঠকের হৃদয়ে ঢেউ তুলবে। আকুতি জানিয়ে অশ্রুসিক্ত করবে দুই নয়ন।

ভাবছি শাহবাগ মোড় থেকে কিছু ফুল নিয়ে উপন্যাসের রিভিউ একটা রঙিন কাগজের মোড়কে বন্দী করে চৈতিকে দিয়ে আসব। সে যেখানে শুয়ে আছে সেই গোরস্থানে।

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন