শহরের স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর নতুন জীবন, নতুন বন্ধু, নতুন শিক্ষকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে চলতে হাঁপিয়ে উঠলাম। এর প্রভাব পড়ল প্রথম পরীক্ষার ফলে। আশানুরূপ হলো না। বাড়ির সবাই খুব ভেঙে পড়লেন। স্কুলের একটা ট্রেনিং থাকায় বাবা তখন বাইরে ছিলেন। আমার সময় আর কাটে না। বাবা কি খুব বকবেন আমাকে? সই করবেন মার্কশিটে? ভাবতে ভাবতে নাজেহাল অবস্থা আমার। বাবা বলেছিলেন, পরীক্ষায় গড়ে ৮০ শতাংশ নম্বর পেলে নতুন সাইকেল কিনে দেবেন। সাইকেল চালিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে যাব, ঘুরব। কিন্তু এসবের কিছুই হবে না। বাবার কাছে বকুনি খেতে হবে।

বাবা ট্রেনিং থেকে বাড়ি ফিরে আমার খারাপ রেজাল্টের কথা শুনলেন। কিন্তু আমাকে কিছু বললেন না। সন্ধ্যায় টিচার চলে যাওয়ার পর আমার পড়ার ঘরে এলেন। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। বাবা আমার মাথায় হাত রাখলেন। আমি ওনাকে জড়িয়ে ধরলাম। মার্কশিট দেখতে চাইলেন, আমি সেটা বের করে হাতে দিলাম। বাবা স্বাক্ষর করে মার্কশিটটা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেলেন।

পরের দিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে উঠানে একটা চকচকে নতুন সাইকেল দেখতে পেলাম। মা বললেন, বাবা আমার জন্য কিনে এনেছেন। সঙ্গে সঙ্গেই সাইকেল নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু বাড়ি ফিরতেই মনটা দুঃখে ভরে উঠল। মাকে বলতে শুনলাম, ‘তোমার জন্য মোবাইলটা কিনলে পারতে। কত কাজে দরকার এখন। খোকারে না হয় পরের মাসে কিনে দিতে সাইকেল। আমি বুঝিয়ে বললে ও বুঝত।’ বাবা কোনো জবাব দিলেন না। আমি নিঃশব্দে সাইকেল রেখে ঘরে এলাম। দুচোখ জলে ভরে উঠল। বাবাকে কিছু বলতে পারলাম না।

জানি না, বাবাকে আমি ঠিক কতখানি ভালোবাসি! তিনি আমার কাছে সকালের সূর্য ও রাতের তারার মতো অভ্যস্ততার। তাঁর ব্যক্তিত্ব, সততা, দায়িত্বশীল আচরণ আমাকে মুগ্ধ করে। আমার মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছা হয় চিৎকার দিয়ে বলি, ‘বাবা, তুমিই আমার জীবনের ম্যাজিশিয়ান। তুমি আর মা ছাড়া কোনো সম্পদ নেই জীবনে, তোমরা আমার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। খুব খুব বেশি ভালোবাসি বাবা।’

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, প্রথম আলো বন্ধুসভা, যশোর

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন