জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সবাই নিজ নিজ মা–বাবার পা ধুয়ে দেয়। প্রথম পর্বে শিক্ষক, অতিথি এবং অভিভাবকেরা নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। মধ্যাহ্নভোজের পর আমি বাবাকে আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে। অনেক খোঁজার পর বাবাকে দেখি মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অসুস্থতার কারণে আম্মু আসতে পারেননি। আমার সঙ্গে দেখা হতেই বাবা বললেন, ‘বাপরে তোদের ক্যাম্পাস অনেক সুন্দর!’ আমিও বললাম, ‘এখানের সবকিছুই সুন্দর এবং সুশৃঙ্খল।’

চলে গেলাম অডিটরিয়ামের দিকে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় পর্ব শুরু। অনেকেই তাঁদের মা–বাবাকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে বিভিন্ন উপহার দিচ্ছেন। আগের দিনই বাবা ঢাকায় চলে আসেন। তখন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বাবা তোমার পছন্দের জিনিস কী?’ বললেন, ‘কেন?’ আমি বললাম, ‘কালকের অনুষ্ঠানে তোমাকে কিছু উপহার দিতে চাই।’ জবাবে বললেন, ‘আমার এখন কিছু লাগবে না। তুই আগে ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ কর, একটা ভালো চাকরি কর। তখন আমিই তোর কাছ থেকে সব চেয়ে নেব।’ বললাম, ‘তোমাকে একটা পাঞ্জাবি কিনে দেব।’ বাবা হেসে বললেন, ‘দাঁড়া!’ এই কথা বলে ব্যাগ থেকে দুটি পাঞ্জাবি বের করে বললেন, ‘দেখ তো কালকের জন্য কোনটা গায়ে দেব? আমাকে কোনটা ভালো মানাবে?’ আমি বললাম, ‘সবুজ পাঞ্জাবিটা।’ অনেক জোর করেও সেদিন বাবাকে কিছু নেওয়ার জন্য রাজি করাতে পারিনি।

অডিটরিয়ামে বসে আছি। হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা এল। রাজু স্যারের কাছে গিয়ে বললাম, ‘স্যার, আমি সবার সামনে বাবাকে কোলে নিতে চাই।’ তিনি শুনে খুশি হয়ে বললেন, ‘মঞ্চে ডাকো।’ বাবাকে মঞ্চে ডাকলাম। বাবা জানতেন না কেন আমি তাঁকে মঞ্চে ডেকেছি।

রাজু স্যার ঘোষণা দিলেন, ‘বাবা-মাকে বহন করার শক্তির পারফরম্যান্স করবে আমাদের একজন ছাত্র।’ স্যারের ঘোষণার পরেই আমি প্রথমবার বাবাকে কোলে নিয়ে মঞ্চে হাঁটতে থাকলাম। বাবা আমার দুই গালে কপালে চুমু খাচ্ছিলেন শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আমাদের বাবা-ছেলের এই দৃশ্য দেখে সবাই দাঁড়িয়ে হাততালি দিলেন। মনের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে।

সবাই বলল আমি নাকি পৃথিবীর সবচাইতে দামি উপহারটা দিলাম। বাবা আমার বাসায় তিন দিন ছিলেন। বড় আপুর বাসায় ছিলেন ২৫ তারিখ পর্যন্ত। ওখান থেকে তবলিগ জামাতে চলে যান। পরদিন, সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। জানতাম না, সেটাই শেষ কথা ছিল। রাত ১০টায় অজানা একটি নম্বর থেকে কল আসে। রিসিভের পর অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে, ‘তোমার বাবা খুবই অসুস্থ, আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি।’ তখন বড় ভাইকে ফোন দিয়ে আমি হাসপাতালে চলে গেলাম। পৌঁছে দেখি বাবা নেই। না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

লেখক: অর্থ সম্পাদক, প্রথম আলো বন্ধুসভা, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন