পারস্যের কবি হাফিজ ও জাতীয় কবি নজরুল
জ্ঞান ও প্রেম—এই দুইয়ের শক্তি বোধ হয় পৃথিবীর অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি। তাই বাংলাদেশ থেকে সুদূর পারস্য বারবার নজরুলকে টেনে নিয়েছে নিজের কাছে। প্রেম-সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে মহিমান্বিত কণ্ঠস্বর হাফিজ শিরাজি। যিনি ইরানিদের কাছে বুলবুল, অদৃশ্যের কণ্ঠস্বর আর পৃথিবীর মানুষের কাছে অনন্ত প্রেম, অযুত রহস্যের মর্মসন্ধানী হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রতি নিরবচ্ছিন্ন আকর্ষণ অনুভব করেছেন জ্ঞানপিপাসু ও সাহিত্যপ্রেমী নজরুল।
সম্পূর্ণ অংশ না হলেও প্রায় পরিপূর্ণ রূপেই হাফিজকে নিজের মধ্যে ধারণ করতেন নজরুল। এ জন্যই দুই কবির জীবনদর্শনে ব্যাপক মিল পাওয়া যায়। তাই প্রকৃতিও যেন ইচ্ছা করেই এই দুই কবির জীবনের সঙ্গে জীবন মিলিয়ে দিয়েছে। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, দুজনকেই শৈশবে হারাতে হয়েছে পিতা। বাঁচার জন্য করতে হয়েছে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই। জীবিকার জন্য করতে হয়েছে রুটির দোকানে কাজ। নিজের চেষ্টায় হতে হয়েছে বিশ্বখ্যাত, বিশ্ববিস্তৃত। আবার দুজনকেই সইতে হয়েছে পুত্রশোক। সেই সঙ্গে জীবন শেষে সমাধিও হয়েছে নিজের ইচ্ছার স্থানে।
নজরুলের জীবনে হাফিজ এতটাই প্রভাব বিস্তার করে ছিলেন, যেদিন নজরুল ‘দিওয়ানে হাফিজ’ অনুবাদ করতে শুরু করেন, সেদিনই তাঁর পুত্র বুলবুল জন্মগ্রহণ করেন। আর যেদিন অনুবাদ করা শেষ হয়, সেদিনই বুলবুল পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
হাফিজের অসংখ্য কবিতা, গান, সাহিত্য নজরুল অনুবাদ করেছেন, যার অন্যতম হলো গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের লেখা কবিতা, যা হাফিজ কতৃক পূর্ণতা পেয়েছিল। গজল সম্রাট হাফিজ শিরাজী চৌদ্দ শতকে সোনারগাঁয়ে অবস্থানরত গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের কাছে বিখ্যাত সেই পঙ্ক্তি পাঠিয়েছিলেন, যা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অনুবাদ করেছেন এভাবে, ‘আজকে পাঠাই বাংলায় যে ইরানের এই ইক্ষু শাখা, এতেই হবে ভারতের সব তোতার চঞ্চু মিষ্টি মাখা।’
নজরুল হাফিজকে বলতেন কবিসম্রাট। সাহিত্যে প্রেমের বিস্তার ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন হাফিজ। ‘বিশ্ববাসী হাফিজের আয়নায় দেখতে পায় নিজেদের। আর নজরুলের আয়নায় আমরা দেখতে পাই হাফিজকে।’ হাফিজের কবিতা ছিল প্রেম-সৌন্দর্য-আধ্যাত্মবাদ নিয়ে আর নজরুল প্রেমের সঙ্গে বিদ্রোহের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে অনন্য ধারার সৃষ্টি করেছেন। আরবি, ফারসি ও তুর্কি শব্দের ব্যবহার নজরুলের কবিতাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ-প্রাণবন্ত-আকর্ষণীয়। সেই সঙ্গে কবিতায় যোগ করেছে ভিন্ন দর্শন ও বলিষ্ঠ উচ্চারণ।
সময় চলে যায়, কেটে গেছে বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী। পানির ধারা ক্ষীণ হয়ে গেছে, মোসাল্লা মহল্লার মৃদুমন্দ বাতাসের বদলে গড়ে উঠেছে ব্যস্ততম হাফিজ অ্যাভিনিউ। তবু অমর হয়ে আছেন হাফিজ ও তাঁর রহস্যাবৃত অনন্ত প্রেমের কবিতা।
শাহবাগের নির্মল বাতাস হয়ে গেছে ধুলাময়, শান্ত শহর জনতার কোলাহলে হয়েছে ব্যস্ততর। তবু নজরুল যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছেন মানুষ থেকে মানুষে, দেশ থেকে দেশান্তরে।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা