default-image

কুয়াশার চাদর ফুঁড়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে দুটো জ্বলজ্বলে চোখ। জ্বলজ্বলে বলা বোধ হয় ভুলই হলো। কারণ বানরটুপির খোলসে নিজের মুখ আর মোটা কাঁথায় নিজের শরীরটাকে সেঁদিয়ে, যতটুকু বার করলেই নয় ভঙ্গীতে দুই হাতে খৈনি ডলে সেটা মুখে চালান করে দেওয়ার মুহূর্তে চৌকিদার সাহেব দেখতে পেলেন এক জোড়া ঘোলাটে চোখ এগিয়ে আসছে ধীর লয়ে।

গ্রামের চৌকিদার এর জন্য প্রস্তুতি ছিলেন না। খৈনিটা তালুতে রাখার মুহূর্তে হাতটাকে ওইভাবে রেখে স্থিরমূর্তি হয়ে তিনি প্রথমেই ভাবলেন, নিজের চার ব্যাটারির টর্চটা বের করে আলো জ্বালবেন কি জ্বালবেন না। কারণ আলোর দিকে আলো তাক করে মারার ব্যাপারে কোনা নির্দেশনা নেই। টর্চ তো মারতে হয় অন্ধকারের দিকেই।

পরক্ষণেই তাঁর মনে পড়ে গেল, শুধু টর্চ নয়, আরও একটা অস্ত্র আছে। কোমরের বিছার মতো একটা দেড় বিঘৎ সুতোয় বেঁধে রাখা বাঁশিটা টেনে ঠোঁটজোড়ার কাছাকাছি আনলেন। শরীর এ সময় চাইছে তামাকের উত্তাপ। উল্টো সূচের মতো বিদ্ধ হচ্ছে হিমালয় থেকে ধেয়ে আসা বরফছোঁয়া হিমহিম বাতাস। সেই ঠান্ডার কারণেই হোক, খৈনির অভাবে কিংবা উত্তেজনায়, ফুটবল রেফারির বাঁশিটার মতো দেখতে ঘুলঘুলিটা থেকে তেমন আওয়াজ বেরোল না। ফ্রুউউউউউউ শব্দের বদলে কেমন জানি লাজুক লাজুক ফরররর একটা আওয়াজ করে থেমে গেল।

বিজ্ঞাপন

ততক্ষণে গ্রামের আলভাঙা মেঠোপথে গরুর চাকায় ঘসে তৈরি করা পথ ধরে এগিয়ে আসা দুই ঘোলাটে চোখের বাক্সটা একদম সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কেউ একজন ওর ভেতর থেকে হাঁক দিল, 'ও চাচা, সুলতানগঞ্জ গ্রামটা কোন পাকে কবার পারেন?'

চৌকিদার প্রথমে ডান দিকে, তারপর বাম দিকে হাত তুলে নির্দেশ করলেন। তিনমাথার মোড়মতোন এই সংযোগস্থলে বসে থাকা এই রাতপ্রহরী ঠিক কোন দিকে যেতে বলছে বুঝতে না পেরেও, ‘আচ্ছা ধন্যবাদ আপনাকে’, বলে জানলার কাচ তুলে দিয়ে চলে গেল শহুরে যুবক। ক্ষণিকের ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেলে কী হবে, চৌকিদার তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আড়চোখে ততক্ষণে দেখে নিয়েছে, মাইক্রোর ভেতরে আরও ছয়-সাতজন ছিল। আর কী যেন পোঁটলার গাদি।

এত রাতে এই গ্রামে মাইক্রোবাস কেন? গেল আগুন (অগ্রহায়ণ) মাসে ওই পাড়ার ছোকরাটার বিয়ে উপলক্ষে একটা ভাঙাচোরা মাইক্রো এসে ঢুকেছিল বসে। কিন্তু রংপুর-দিনাজপুর হাইওয়ে থেকে অনেক দূরের এই গ্রামে তেলচালিত বাহন কদাচিৎ দেখা মেলে। মটর সাইকেলই আছে হাতে গোণা। সেখানে চার চাকার গাড়ি! তাও এত গভীর রাতে? আচ্ছা, ডাকাতের দল-টল নয় তো!

অদূরবর্তী গ্রামে ডাকাত পড়লেও পড়তে পারে এমন শঙ্কার ভাবনাকে আরও কিছুক্ষণ জমিয়ে ভাবার জন্যই হয়তো চৌকিদার মুখে চালান করে দিলেন খৈনি। আকাঙ্ক্ষিত তামাকের স্বাদ কিংবা সম্ভাব্য ডাকাতির খোঁজ পাওয়ার কারণেই হোক, চৌকিদারের শরীর উষ্ণ হয়ে উঠল। নাহ, সকাল বেলায় গিয়ে খোঁজটা নিতেই হবে। কার কার বাড়িতে কী কী হলো।

আপাতত ডিউটি মুলতবি রেখে তেমাথার বটতলায় নিজের বিছিয়ে রাখা চৌকিতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি। চৌকিদার শব্দটা নিয়ে ভাবলেন। কথাটাকে চৌকি-দাঁড় না বলে চৌকি-শোয়া বললেই হয়তো ভালো হতো। নিজের কৌতুকে নিজেই খানিকক্ষণ হেসে ঘুমিয়ে পড়লেন।

সকাল বেলা সেই চৌকিদার প্রথমেই খোঁজ নিলেন সুলতানগঞ্জ গ্রামের কয়েকটা বাড়িতে। নামের শেষে গঞ্জ থাকলে কী হবে, এই গ্রাম একেবারে গ্রামস্য গ্রাম। পাশে শুকিয়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ঘাঘট নদীর শাখাটা যখন যৌবনবতী ছিল, তখন হয়তো এখানে কোনো কালে হাট-টাট বসত।

এখন নদী নেই। সেই গঞ্জ নেই। নেই সুখও। আছে শুধু হাহাকার। ঘরভর্তি উপচে পড়া অভাব। কার্তিকের মঙ্গার ঘা পৌষেও শুকোয়নি। বরং মাঘ মাসের শীতে বাঘের থাবায় জীবন যায় যায়। অনেকের গরম কাপড়টি নেই। শতছিন্ন কাঁথা টাটি বেড়ার ফাঁক দিয়ে বেহুলা-বাসরের সূতোসাপের মতো ঢুকে পড়া শীতকে থামাতে পারে না কিছুতেই।

বিজ্ঞাপন

আহা, মানুষ শুধু এই অভাগাদের খেতে না পারার কথা বলে। কিন্তু জারের নাগান কষ্ট আর কিছুত নাই বাহে! হয়তো শরীরটাও আধপেটা থাকে বলে ঠান্ডা একটু বেশিই লাগে। মা নিজেকে কাঁথার আড়ালে রাখবে, নাকি হাঁপরে-কুঁকড়ে ওম খোঁজা বাচ্চাটাকে!

কিন্তু আজ কী এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটেছে। সবাই সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখে, উঠোনে পড়ে আছে কীসের যেন একটা বান্ডিল। আর সেটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে সুয়েটার, জ্যাকেট, মাফলার, শাড়ি, শার্ট, কম্বল! কে রেখে গেল? চোর-ডাকাত নয়তো? হয়তো ভুল করে রেখে গেছে!

একটু খোঁজ নিতেই বেরিয়ে এল, এ রকম গ্রামের সব বাড়ির উঠোনে কি ঘরের দরজার সামনে সবাই একটা করে পুঁটলি আবিষ্কার করেছে। কাঁয়ও কাঁয়ও বিদেশি জাম্পারও পাইছে বাহে, শরিলত দিলে আর প্যান্ট পরা নাগে না। হেই হেত্ত লম্বা!

এ তো তবে ভুল করে রেখে যাওয়া ডাকাতের কাজ নয়! এ তো ঈশ্বরের দূতের কাজ!

অনেক দির পর সুলতানগঞ্জ গ্রামে যেন ঈদের আনন্দ। অন্য সময় হলে কে বেশি পেল আর কে কম, কার ভাগ্যে ভালো সোয়েটার কি কম্বলটা পড়ল দেখে হিংসে হতো। কিন্তু আজ কারও চেয়ে কারও আনন্দ কম হচ্ছে না। শরীরের চেয়ে একটু ঢলঢলে, একেবারে আনকোরা নতুনও নয়। কিন্তু নতুন পাওয়া জামার চেয়েও দ্বিগুণ আনন্দ হচ্ছে ছোট্ট বাচ্চাগুলোর। ছুটে ছুটে আনন্দ করছে, ভুলে গেছে সকালে না খেয়ে থাকার কষ্ট।

বড়রা খুলিতে (উঠান) বসে এই রহস্য ভাঙার চেষ্টা করছে। সেই আড্ডায় আছেন চৌকিদার সাহেবও। তার ভাবখানা এমন, আমি কি আর সব জানি না। সবই জানি। দেখেই বুঝেছিলাম। শহর থেকে কয়েকটা ছেলেপুলে এসেছিল। নাহ, ছেলেপুলে নয়, আল্লাহ খাস দিলের বান্দা। দেবদূত!

***

অনেক কাল আগে, আমি যখন রংপুর বন্ধুসভা করতাম (সদস্য ছিলাম না লিখে ‘করতাম’ ইচ্ছে করে লিখলাম। কারণ আসলেই সেটা আমাদের ২৪ ঘণ্টার কাজ ছিল), একবার শীতে, পুরো উত্তরবঙ্গ যখন কাঁপছে, সে সময় ঢাকা অফিস থেকে আসা ও আমাদের নিজস্ব চেষ্টায় সংগ্রহ করা শীতের কাপড়গুলো আমরা এমন এক গ্রামে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, যেখানে সহজে পৌঁছানো যায় না।

বুদ্ধিটা রুজু ভাইয়ের (আরিফুল হক, প্রথম আলো রংপুর প্রতিনিধি) মাথা থেকে এসেছিল। শীতবস্ত্র বিতরণের ছবিগুলোতে দেখলে বোঝা যেত না, কে দিচ্ছে আর কে নিচ্ছে। একটা কম্বল ২০ জন মিলে দেওয়ার রহস্যটা কী? রহস্য হলো প্রচার! শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো চেয়ে ফটোসেশন করা বেশি জরুরি।

এ কারণে সবাই হাতের কাছে থাকা গরিব মানুষদেরই শীতবস্ত্র দেয়। এমনও হয়েছে, একজনই হয়তো সেই শীতে সাত-আটবার শীতবস্ত্র পেয়েছে। আর যে এসব মচ্ছবের নামই শোনেনি কোনো দিন, সেই প্রত্যন্ত গ্রামের অভাবী মানুষটা, তার কাছে কিছুই নেই। রুজু ভাই তাই বললেন, আমরা এবার শীতবস্ত্র দেব একদম গভীর গ্রামে। যতটা ভেতরে যাওয়া যায় গাড়ি নিয়ে। আর দেব গভীর রাতে, যেন কেউ আমাদের কথা না জানে। ছবিও তোলা হবে না একটাও।

***

সারা দেশে শীতার্ত, বন্যার্ত, অভাবী মানুষদের পাশে আপনারা যাঁরা দাঁড়ান; আপনারা জানেন না, কত মানুষ দু হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে মন থেকে দোয়া করে আপনাদের জন্য। আপনারা তাদের কাছে সাক্ষাৎ দেবদূত। আমার খুব হিংসা হয় আপনাদের। একদিন আমিও তো তাদের দলে ছিলাম। জানি, ওই কাজের আনন্দ, গর্ব কতটা!

এক সংগঠন হয়তো সফল হয়, কিংবা ব্যর্থ হয়। কিন্তু মনে রাখবেন, মন থেকে সংগঠন করা মানুষটা কখনো ব্যর্থ হয় না। হতেই পারে না!

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন