প্রকৃতির কোলে বাধাহীন ছুটে বেড়ানোর দিনগুলোতে জমে আছে কত স্মৃতি। ছেলেবেলায় কানামাছি কিংবা লুকোচুরি খেলা, প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে চড়ুইভাতির আয়োজন করা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরে সাঁতার কেটে মায়ের বকুনি খাওয়া, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা, নানা রকমের গাছ লাগিয়ে বাড়ির আঙিনা ভরে ফেলা, পুতুলের বিয়ে দেওয়া, মাটির ব্যাংকে টাকা জমানো—এমন স্মৃতির দিনগুলো চাইলেও কি ভোলা যায়?

তখন ডিপ্রেশন বলতে বুঝতাম আদরের পুতুলের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার শোক, শখের মাটির ব্যাংকটা ভেঙে যাওয়া কিংবা সমবয়সীদের সঙ্গে ঝগড়ায় হেরে আসা। একবার একটা ঘুঘুর বাচ্চা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম, তিন দিন ধরে সেবাযত্ন, খুদ-কুঁড়া খাওয়ানোর পরও যখন সে মরে গেল, তখন কী যে মন খারাপ হয়েছিল!

বর্ষা আমার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু। বৃষ্টিতে ভিজে সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আম কুড়াতে যেতাম। তখন শর্ষেখেত দেখলেই ছবি তুলতে যেতাম না, বরং একদৃষ্টে তাকিয়ে দিগন্তবিস্তৃত হলুদের সমারোহ উপভোগ করতাম। এখন যেমন গোলাপ, কৃষ্ণচূড়া কিংবা কাঠগোলাপ পছন্দ, তখন পছন্দের তালিকায় ছিল বর্ষার কদম কিংবা শরতের শিউলি ফুল।

ছেলেবেলায় কানে হেডফোন গুঁজে গান শোনা হতো না। তবে সাদাকালো টিভিতে আলিফ লায়লা, ছায়াছন্দ কিংবা শুক্রবার বাংলা ছায়াছবি ইত্যাদি দেখার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকতাম। বিমানের আওয়াজ শুনেই দৌড়ে দেখতে যেতাম আর ভাবতাম—আচ্ছা, মানুষ কীভাবে এত উঁচুতে বিমানে চড়ে?

সময়ের বিবর্তনে সেই দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি। দুরন্ত জীবন বর্ণ থেকে শব্দ হয়ে বাক্যগুলো গল্প হওয়ার প্রতিক্ষায় কীভাবে যেন হুট করে বড় হয়ে গেলাম। এখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসজীবনের প্রথম বর্ষে এসে সারা দিন বন্ধুদের সঙ্গে এখানে–ওখানে ঘুরে বেড়ানো, বটতলার আড্ডা কিংবা টিএসসির ঘাসে বসে বিকেল পার করা, কার্জনের পুকুরপাড়ে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা অথবা চারুকলার নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশে একটু স্বস্তি খোঁজার মধ্যে শৈশবের দিনগুলো স্মৃতিতে ভেসে ওঠা জানান দেয়, বয়স বাড়লে শৈশব হারিয়ে যায়, একেবারে হারিয়ে যায় কি?

সাদিয়া ইসলাম স্মৃতি: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়