বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

(দুই)

সফরসঙ্গী মূকাভিনেতা মীর লোকমান আর নারেকের বন্ধু তুশ।হোটেল থেকে আনলিমিটেড গতির ড্রাইভ করে সোজা সেভান লেকে গিয়ে থামেন নারেক।

আর্মেনিয়ার সমুদ্র নামে খ্যাত এই লেক। সেভানের নির্মল জলতরঙ্গ উপভোগ করলাম। এরপর এগিয়ে চলেছি ভিন্ন এক পৃথিবীর পথে।যেতে যেতে পড়ছে উঁচু উঁচু পাহাড়-পর্বত। সবুজে সবুজে ভরপুর। দূর থেকে এসব পাহাড় দেখে মনে হয় ঘোর অরণ্য। ভীতিকর পরিবেশ। কাছাকাছি যেতেই উন্মোচন হয় অন্তরালের ছোট ছোট শহর। পাহাড়ের ঢালুতেই গড়ে ওঠা এ শহর। অসংখ্য সুরম্য দালান। খাদের কিনারায় অট্টালিকা। মনে হবে, এই বুঝি ভেঙে পড়ছে অট্টালিকাগুলো। কিন্তু না। এভাবে টিকে আছে শত শত বছর ধরে!

দুর্গম পথ বেয়ে আমাদের গাড়ি উঠতে থাকে উঁচু থেকে আরও উঁচুতে। কিছুক্ষণ পর প্রবেশ করি একটি টানেলে। টানেলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার নতুন অভিজ্ঞতা। বুক কেঁপে উঠছে। শিহরণ জাগছে! দুই কিলোমিটারের বেশি পথ! জগতের বিস্ময় নিয়ে ট্যানেল থেকে বের হই। দেখি নতুন দুনিয়া। যার সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। খণ্ড খণ্ড মেঘমালা! মেঘের বুক চিরে এগিয়ে চলছে গাড়ি। উঠতে থাকে আরও উঁচু পথে। এভাবে প্রায় নয় হাজার ফুট উঁচুতে উঠে পড়ি । সেখান থেকে নিচে নেমে প্রবেশ করি সরু এক গলির দিকে। আমরা পৌঁছে যাই আরও ঘোর অরণ্যে!

নারেকের মুখে কোনো কথা নেই। তুশও চুপচাপ। একটু পর নীরবতা ভাঙেন তুশ। নারেককে কিছু একটা বলছেন। বুঝতে পারছি না কী বলছেন। পেছনে ফিরে তাকাই। দেখি নারেকের বন্ধুদের গাড়িটি নেই। সেভান লেক থেকে মূলত তার বন্ধুদের আরেকটি গাড়ি আমাদের সঙ্গে যাত্রা করে। কিন্তু কোন দিকে হারিয়ে গেছে বুঝিনি। নারেক বা তুশ কেউই ইংরেজি বোঝেন না। ‘ইয়েস, নো, ওয়াটার’ শব্দগুলোও তাদের কাছে অপরিচিত। শুধু ইশরায় চলছে সফর। এখানে আমাদের ভাষা ‘অঙ্গভঙ্গি’!

আশঙ্কার দালান তৈরি হচ্ছে। ভয় লাগছে। কিছু বলতে চাচ্ছি, সম্ভব হচ্ছে না। হাজারও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কোথায় নিয়ে চলেছেন নারেক? তুশের দৃষ্টি হঠাৎ আমাদের ভীতসন্ত্রস্ত মুখের দিকে পড়ল! দ্রুত ফোন বের করলেন। মনে হলো, স্ত্রী এনাকে কিছু একটা বলছেন! হয়তো তিনি বুঝেছেন আমরা ভীত। তুশের স্ত্রী ইংরেজিতে দক্ষ। তিনি ইয়েরেভানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ছেন। মীর লোকমানের দিকে ফোনটি এগিয়ে দিলেন তুশ। এনা অভয় দিলেন লোকমানকে! ভয়ের কিছু নেই! আমরা নিরাপদেই আছি। এনার সঙ্গে কথার পর স্বস্তি পাই। বিব্রতও হই বিশ্বাস হারানোর জন্য।

default-image

(তিন)

নারেকের মুখে তৃপ্তির হাসি। হয়তো গন্তব্যে চলে এসেছেন বলে । ঠিকই! আমরা পৌঁছে গেছি দিলিজানে।আর্মেনিয়ার আরেকটি আকর্ষণীয় পর্যটন শহর। ভাতুশ প্রদেশের ক্ষুদ্র পৌর শহর এটি। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত আর্মেনিয়ান সুইজারল্যান্ড বা লিটল সুইজারল্যান্ড হিসেবে। শুধু পর্যটনের খ্যাতিই নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির অনেক প্রথিতযশা শিল্পী, সুরকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্ম এই শহরে। ঐতিহ্যবাহী আর্মেনিয়ান স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এই শহরের বুকের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলছে আমাদের গাড়ি। যেতে যেতে বিরতি দিচ্ছেন নারেক। বিরতির সময় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছি। স্থানীয়রা ইংরেজিতে একেবারেই অদক্ষ। তথ্য পেতে কষ্ট হচ্ছে। তবে একটি পিৎজাহাটের সামনে গিয়ে কথা হলো জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দিলিজান সম্পর্কে চমকপ্রদ তথ্য দিলেন। জানালেন দিলিজান নামকরণের অতীত কথা!

সে বহুকাল আগের কথা! দিলি নামে এক মেষপালক ছিল। গ্রামের ছেলে, যে কিনা তার মালিকের মেয়ের প্রেমে পড়ে। ক্রমেই গভীর হয়ে ওঠে সম্পর্ক। দুজন দুজনকে পাগলের মতো ভালোবাসতে শুরু করে। গোপনে দেখা হয় দুজনের। কোনো বৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় মেষপালক দিলির সঙ্গে মালিকের মেয়ের চলে সুসজ্জিত অভিসার। এভাবে বছরের পর বছর চলতে থাকে ধনী-গরিবের অমীয় প্রেম। প্রেম বৈষম্য মানে না। প্রেম হলো সাম্যের প্রতীক। তা প্রেমিক-প্রেমিকামাত্রই বিশ্বাস করেন। কিন্তু প্রচলিত অন্ধ সমাজ তা বুঝবে কেন!

দিলির প্রেমের কাহিনি জানাজানি হয়ে যায় একটা সময়। কানাঘুষা চলে গ্রামজুড়ে। আপত্তিকর কথা রটে যায়। এ খবর চলে যায় দিলিজানের হবু শ্বশুরের কাছেও! তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন তিনি। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। সামান্য মেষপালক কিনা ভালোবাসে তার মেয়েকে। যে কিনা আবার তারই গোলাম। মেষপালকের এমন দুঃসাহস মেনে নিতে পারেননি মেয়ের বাবা। ভালোবাসার অপরাধে কঠিন শাস্তি হয় দিলির। কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে প্রিয়তমার সামনেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় দিলিকে। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া প্রেমিকার কিছুই করার ছিল না! প্রিয়তম দিলির মৃত্যু শোকে একসময় পাগল হয়ে যায় মালিকের মেয়ে! ওদিকে প্রাণের চেয়ে প্রিয় সন্তান দিলির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে অসহায় মা আর্তনাদ করে ওঠেন। উন্মাদের মতো রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন সন্তানের খোঁজে। লাশের খোঁজে ঘুরে বেড়ান এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। কিন্তু কোথাও খোঁজ মেলে না দিলির লাশের। কীভাবে খোঁজ মিলবে! দিলির মৃতদেহও রাখেননি প্রেমিকার বাবা! আদরের সন্তানের খোঁজে ‘দিলি জান, দিলি জান’ নাম জপে জপে সারা শহর প্রদক্ষিণ করতে থাকেন দিলির মা। মায়ের এই আহাজারি ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। একসময় ‘দিলি জান’ নামটি সর্বস্তরের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে। এভাবে শহরটির নামকরণ ‘দিলিজান’! ১৬৬৬ সালে ফরাসি পরিব্রাজক জিন শারদিনের লেখায় প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলের নাম ’দিলিজান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়!

default-image

বিয়োগান্ত এ ঘটনা শুনে অসহায় বোধ করছি! প্রেম করে মরে গেল দিলিজান! কী অবাক, কী নিষ্ঠুর দুনিয়া! মানুষ হত্যা মহাপাপ। ভালোবাসার অপরাধে হত্যা তার চেয়ে বড় পাপ! মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে, এটাই কাম্য ও স্বাভাবিক। ভালোবাসার অপরাধে দিলিজানের ওপর যে অবিচার, নির্মম অত্যাচারের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো, তার ইতিহাস নিষ্ঠুর! দিলিজান বিশ্বপ্রেমিক। নিজেকে দিলিজানের উত্তরসূরি মনে হচ্ছে। বিদ্রোহী হয়ে উঠছে মন। চরম বিক্ষুব্ধ প্রেমিক হৃদয়। মনে হচ্ছে, দিলিকে নয়, আমাকেই হত্যা করা হয়েছে। আমি যেন মৃত দিলিজান!

ভালোবাসার মানুষের জন্য যে দিলিজান জীবন দিয়ে গেল, তার নামে একটি শহর গড়ে উঠেছে! আর সেখানে আমাদের বিচরণ। নারেক দক্ষ ড্রাইভার। নয়তো এই ভয়ংকর পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ড্রাইভ করা সহজ নয়। ব্রোঞ্জ বা প্রথম লৌহযুগের দিলিজান অঞ্চল। আমরা প্রবেশ করেছি আঘস্তেভ নদীর পাড় ধরে বয়ে যাওয়া দিলিজানের ন্যাশনাল পার্কে। পার্কের অসাধারণ, সুসজ্জিত ও গোছানো একটি লেক ‘লেক পারজ’। পাহাড়ি ঢালুতে গড়ে ওঠা লেক পারজে এসে যাত্রাবিরতি আমাদের। ওদিকে মাঝপথে হারিয়ে যাওয়া নারেকের বন্ধুদের গাড়িটিও ফিরেছে। নারেকের গাড়িটি দীর্ঘ যাত্রার ধকল সহ্য করেছে। তবে নারেকের কোনো ক্লান্তি দেখছি না। ভ্রমণে আমারও ক্লান্তি আসে না। যদিও দিলিজানের ঘটনা শুনে হৃদয় কিছুটা বিষণ্ন। মন চাইছে, হারিয়ে যাই এই অরণ্যে। খুঁজে ফিরি দিলিজানের স্মৃতিচিহ্নটুকু আর তার প্রিয়তমার নৃশংস বাবাকে ধরে শাস্তির মুখোমুখি করি। প্রেমিক হত্যার দায়ে প্রেমিকার বাবার ফাঁসি কার্যকর করা পুণ্য কাজ হবে! জানি, হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই মানুষকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কোনো অজানা গন্তব্যে হারিয়ে গেছে দিলিজান। আমারও গন্তব্যহীন হয়ে যেতে মন চায়। চলতে চলতে যেখানে থেমে যাব, সেখান থেকে আবার ফিরব অন্য পথে। এভাবে চলতে থাকলে কেমন হতো! কিন্তু তা সম্ভব নয়। আমাদের ফিরতে হয় ঘরে। থামতে হয় কোনো না কোনো গন্তব্যে।

গন্তব্যে ছুটছে আমাদের গাড়ি। এরই মধ্যে লেক পারজকে বিদায় জানিয়েছি। চলতে চলতে অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি। অপূর্ব সব দৃশ্যকল্প হাতছানি দিচ্ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে কিছু ছবি তুলে নিচ্ছি। কিছু পথ চলার পর পথেই বিরতি দেন নারেক। দাঁড়িয়ে যান আমাদের সঙ্গে ছবিতে পোজ দিতে। বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলে আবারও চলতে থাকি আমরা। চলতে চলতে কোনো এক বাঁক খাওয়া পথ ধরে নারেকের বন্ধুদের গাড়ি বিদায় নেয়। আমাদের চলতে হবে আরও বহু পথ...।

লেখক: প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন