এমন ভয়ংকর সময়ে তাজিম বাড়িতে নেই। পাড়ায় খেলতে গেছে সেই কখন! এখনো এলো না। তাজিমের মায়ের খুব চিন্তা হচ্ছে—কী যে করি! এই বলে ঝড়ের ভেতরেই তাকে খুঁজতে বের হলো। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মেঘ ডাকছে গুড়ুম গুড়ুম। সাদা সাদা শিলাও পড়ছে। সঙ্গে হালকা বৃষ্টি। কিন্তু বাতাস খুব ভয়ংকর! গাছের ডালাপালা সব মড়াত মড়াত করে ভেঙে ফেলছে। গাছের একটি ডাল তাজিমের মায়ের একেবারে পায়ের কাছে এসে পড়ল। একটুর জন্য রক্ষা। তাজিমের মা চমকে উঠল। কেঁদে কেঁদে বলল—হে আল্লাহ! আমার তাজিমের কী হবে! তুমি তাকে দেখো মালিক।
এই বলছে আর দোয়া-দরুদ পড়ছে। পড়তে পড়তে বাড়ি থেকে একটু দূরে প্রাইমারি স্কুলের মাঠে এসে পড়ল। দেখে কেউ নেই সেখানে। তাজিমের মা আরও ভয় পেয়ে গেল। তাজিম যে কোথায় গেল! ভাবতে ভাবতে একটা ভয়ংকর বজ্রপাত হলো একটু দূরে। তাজিমের মা ভয়ে দৌড়ে গিয়ে স্কুলের বারান্দায় উঠল। ঝড়ের গতি আরও বেড়ে গেল। তাজিমের মা হাউমাউ করে কান্না আরম্ভ করল। আর আল্লাহপাকের কাছে দোয়া করতে লাগল—হে আল্লাহ! আমার তাজিমকে দেখো। আমার তাজিমের যেন কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু ঝড় আর থামে না। ক্রমে বেড়েই চলছে। স্কুলমাঠের একটি নারিকেল গাছ ভেঙে পড়ল। কার যেন টিনের চালা উড়ে এসে পড়ল স্কুলের পুকুরে। পাশের বাগানের ডালপালা-পাখির বাসা উড়ে এসে পড়ছে স্কুলমাঠে। এসব দেখে তাজিমের মায়ের আর সহ্য হলো না। ভয়ংকর ঝড়ের মধ্যেই ‘তাজিম! তাজিম! বলে বের হয়ে গেল তাকে খুঁজতে।

দৌড়াতে দৌড়াতে চলে গেল মোল্লাদের আমবাগানে। বন্ধুদের সঙ্গে আম কুড়াতে হয়তো সেখানে যেতে পারে তাজিম। গিয়ে দেখে সেখানেও তাজিম নেই, গাছের তলায় ডালপালা আর কাঁচাপাকা অসংখ্য আম পড়ে আছে। সেখান থেকে আবার দৌড়ে চলে গেল তাজিমের বন্ধু রাতুলদের বাড়ি। সেখানেও তাজিমকে পেল না। আর পরানে সহ্য হচ্ছে না তাজিমের মায়ের। সন্তানের চিন্তায় সে কালবৈশাখীর মতো ঝড়কেও মালুম করল না। কেঁদে কেঁদে প্রচণ্ড ঝড়ের ভেতরেই নিরুপায় হয়ে ফিরে এলো বাড়ি; যদিও রাতুলরা তাকে আসতে অনেক নিষেধ করেছিল। বাড়ি এসে দেখে ঘরের এক কোণে কেমন জড়সড় হয়ে কাঁপছে তার ছেলেটি। তাকে খুঁজতে বের হওয়ার পরপরই সে দৌড়ে বাড়িতে এসে পড়েছিল। ছেলেটিকে দেখেই পরম আদরে বুকে জড়িয়ে নিল তাজিমের মা। ‘ঝড়ের ভিতর তুই কোথায় ছিলি বাজান!’ এ কথা বলে অনেক্ষণ ধরে তাজিমকে বুকে জড়িয়ে রাখল তার মা।

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন