করোনা অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীদের জীবন

বিজ্ঞাপন
default-image

চারদিকে সুনসান পরিবেশ বিরাজ করছে। নেই শিক্ষার্থীদের রাস্তায় চলাচল, আর দেখাও মেলে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের পদচারণ। এ যেন শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে উঠেছে বিভীষিকাময় জীবন! মহামারি করোনার কারণে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীদের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দফায় দফায় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাকার্যক্রম স্থগিত অবস্থায় থাকায় অনিশ্চয়তায় ঝুঁকছে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন টানা বন্ধের ঘটনা আর ঘটেনি।

কতটা অনিশ্চয়তার মাঝে আছে শিক্ষার্থীরা?
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী তাবাসসুম রাবেয়া বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। ইচ্ছা ছিল উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি চুকিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে অচিরেই পৌঁছে যেতে পারব। কবে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হবে, কবেই বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব, সবটাই যেন অনিশ্চয়তা, ধোঁয়াশা ও অস্পষ্ট। সব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝে সময় অতিবাহিত করছি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মৌসুমী আফরোজ হতাশার সঙ্গে বলেন, ‘একদিকে বাঁচার লড়াই ও মহামারিতে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন, অন্যদিকে আগে থেকে চলে আসা সেশনজট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তায় জীবনের অর্থ আজকাল তেমন খুঁজে পাই না। একাডেমিক ক্যালেন্ডার থেকে একটি বছর হারিয়ে যাবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একটি বছর হারিয়ে গেলে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বিচ্যুতি ঘটবে। প্রতিনিয়ত এই শঙ্কা, আশঙ্কা, ভয় নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি।’

শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, সমানভাবে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাও অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শ্রেয়া বিশ্বাস বলেন, ‘সেশনজটে না পড়লেও সেমিস্টার পরীক্ষা নিয়ে বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে আমাদের। বছরে দুই সেমিস্টারে পরীক্ষা হয়ে থাকে। কিন্তু মহামারি করোনার কারণে এক সেমিস্টার পরীক্ষা পিছিয়ে গেল। ফলে চরম বিপাকে পড়ব বললেই চলে। তবুও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জোরেশোরে পড়ালেখা শুরু করতে হবে। অনলাইনে ক্লাস হলেও গ্রামে দুর্বল নেটওয়ার্কের জন্য ক্লাসও তেমন করতে পারছি না। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত কারণ সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। দোদুল্যমান ভবিষ্যৎ নিয়ে টানাপোড়েনের মাঝে আছি।’

শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তার হাতছানি। ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

সালমান আহমেদ পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছেন। জুন মাসে তাঁর চাকরির পরীক্ষা ছিল, কিন্তু মহামারি করোনার কারণে সব চাকরির পরীক্ষা স্থগিত। কবে নাগাদ পরীক্ষা হবে, এ নিয়ে এখনো কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি। বাংলাদেশের হাজারো সম্ভাবনাময় তরুণ পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু আজ তাঁরা অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন। তাঁদের জীবনের গতিপথের গতিশীলতা আজ নিলামে উঠছে। চারপাশে গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন, আলোর দিশা মিলবে কি না, সন্দিহান শিক্ষার্থীরা ও চাকরিপ্রত্যাশীরা।

শিক্ষার্থী নিসার হোসেন ছোটবেলা থেকেই মালয়েশিয়াতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুক। স্বপ্ন পূরণের জন্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার গণ্ডি পেরিয়েই আবেদন করেছিলেন। অনেক ঝামেলা পেরিয়ে ভিসাও হাতে পেয়েছিলেন। কিন্তু মহামারি করোনার কারণে স্থগিত হয়ে গেছে স্বপ্নপূরণের দেশে পাড়ি জমানো আর থমকে গেছে আশা–ভরসার জায়গাগুলো। হতাশা, কষ্ট, অনিশ্চয়তা, শঙ্কা থেকে তিনি বলেন, ‘যত দিন যাচ্ছে, নিশ্বাস নিতে ততই কষ্ট হচ্ছে। মাঝেমধ্যে নিজের আমি সত্তা খুঁজে পাই না। মনে হয়, কোথায় যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, দূতাবাস থেকেও আলোর দিশা মিলছে না। মহামারি করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মালয়েশিয়াতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিগগিরই উপযুক্ততার সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মহামারি করোনার কারণে বাইরের দেশগুলোর সরকার অন্য দেশের নাগরিক প্রবেশ করানোর বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে আশ্বস্ত করে মালয়েশিয়ার দূতাবাস। অনেক গণমাধ্যমে জানা যায়, যত দ্রুত করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তত দ্রুত বিদেশে উচ্চশিক্ষার কার্যক্রম শুরু হবে।

শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তায় সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে গিয়ে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছেন। ফলে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হচ্ছে, তা কখনোই দেশ ও জাতির জন্য কাম্য নয়। আজকের সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের ওপর দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। তাই শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ বিষয়টিও সরকারের নজরে রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণরূপে তৈরি করতে হবে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ, যা শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননকে শাণিত করবে। এভাবেই সম্ভব হবে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করা।

শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ

বন্ধুসভায় লেখা পাঠানোর ঠিকানা: bondhushava@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন