আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ১০টি উপায়
অনেক সফল মানুষ তাঁদের নিজস্ববোধ ও আত্মবিশ্বাসকে সাফল্যের কারণ হিসেবে কৃতিত্ব দেন। তবে কীভাবে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হয় বা কীভাবে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা যায়, তা প্রকৃতপক্ষে অনেকেই ব্যাখা করেন না। ব্যাপারটি জটিল। কারণ, আত্মবিশ্বাস বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নির্মিত হয়। সামগ্রিকভাবে এটি সেসব অভিমত ও অর্জনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, যা আপনার আবেগের সঙ্গে খাপ খায় এবং যা আপনাকে পরিতৃপ্ত ও গর্বিত করে তোলে। এই বিষয়গুলো আবিষ্কার করা আপনার জীবনের অন্যতম সার্থক সাধনা। আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ১০টি উপায়—
১. কাজ সম্পন্ন করুন
আত্মবিশ্বাস অর্জনের ওপর নির্মিত হয়। আপনি যদি ছোট ও বড় লক্ষ্যগুলো অর্জন করেন, তবে আপনি নিজে আরও ভালো বোধ করবেন। এটি আপনার প্রতিদিনের লক্ষ্য দিয়ে শুরু হয়। আপনার আজ কী অর্জন করা দরকার এবং আপনার লক্ষ্য পূরণে সহায়তার জন্য এ সপ্তাহে আপনার কী প্রয়োজন? আপনি যদি প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করেন, তবে আপনি সাপ্তাহিক বা মাসিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে শুরু করবেন, যা আপনাকে দ্বিবার্ষিক ও বার্ষিক লক্ষ্যগুলোর আওতায় নিয়ে আসবে। মনে রাখবেন, অগ্রগতি ক্রমবর্ধমান এবং বড় পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। আপনার এমন মনে হবে যে আপনি বড় কোনো প্রকল্প নিতে পারেন এবং একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন। কারণ, আপনি বিশ্বাস করেন যে আপনি এটি পূরণ করতে পারেন। নিজের জন্য একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং এগিয়ে যান।
২. অগ্রগতি নিরীক্ষণ করুন
বড় বা ছোট হোক, আপনার লক্ষ্যে পৌঁছানোর সর্বোত্তম উপায় হলো সেগুলোকে ছোট ছোট লক্ষ্যে বিভক্ত করা এবং লক্ষ্যের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা। আপনি হয়তো পদোন্নতি ও উন্নততর চাকরি পেতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে, পেশা পরিবর্তন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বা ১০ কেজি ওজন কমানোর প্রয়াস করছেন। এসব বিষয়ে আপনার অগ্রগতি হচ্ছে কি না, তা জানার সেরা উপায় এটি পর্যবেক্ষণ করা। আপনার অর্জন পরিমাপ করার চেষ্টা করুন। আপনি চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য কতগুলো আবেদন জমা দিচ্ছেন, কতটা অনুশীলন করছেন এবং আপনার লক্ষ্যটি যা–ই হোক, তা লিখুন। এটি আপনাকে অবশ্যই অবিচ্ছিন্ন থাকতে সহায়তা করবে। আপনি বাস্তবে যে অগ্রগতি করছেন, তা দেখে আপনার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।
৩. সঠিক কাজটি করুন
বেশির ভাগ আত্মবিশ্বাসী মানুষ একটি মৌল ব্যবস্থা অনুসরণ করেন। সেই মৌল ব্যবস্থার ভিত্তিতে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, এমনকি কঠিন সময়ে নিজেদের স্বার্থ না মিটলেও অন্তত অধিকাংশ লোকের মঙ্গলের জন্য। আপনার ক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত আপনার চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করে। তা–ই করুন, যা আপনি হওয়ার জন্য উদ্গ্রীব। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন এবং সেটিই করুন, তা যত কঠিন হোক। এ কারণে আপনাকে কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করতে হলেও। কারণ, পরবর্তী সময়ে আপনার কাছে নিজের কদর বেড়ে যাবে এবং আপনি নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করবেন।
৪. অনুশীলন
অনুশীলন আপনার স্বাস্থ্যের উপকারের পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে সহায়তা করে, মনোযোগ বৃদ্ধি করে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে ও বিষন্নতা প্রতিরোধ করে। যখন অতিরিক্ত শক্তি থাকে না, তখন উদ্বেগ সৃষ্টি হয় না। এভাবেই অনুশীলন আপনার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতিসাধন করে। তাই সক্রিয় থাকুন ও নিজের খেয়াল রাখার জন্য সময় তৈরি করুন।
৫. নির্ভীক হোন
ব্যর্থতা আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং ব্যর্থতার ভয়ই আসলে আপনাকে পঙ্গু করে। আপনি যদি বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেন এবং বড় স্বপ্ন দেখে থাকেন, তা আপনার কাছে অত্যধিক ভারী বলে মনে হতে পারে। আপনি অবশ্যই অনুভব করবেন যে আপনার দ্বারা এটি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এই মুহূর্তগুলোতে আপনাকে নিজের ভেতরের প্রতি বিন্দু সাহস সংগ্রহ করতে হবে। কেবল চালিয়ে যেতে হবে। প্রত্যেক সফল ব্যক্তিই ভয়ের সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা কাজ চালিয়ে গিয়েছেন এবং ঝুঁকি নিয়েছেন। তাঁরা যা অর্জন করার চেষ্টা করেছেন, তা তাঁদের কাছে ব্যর্থ হওয়ার ভয়কে ছাপিয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বলে মনে হয়েছে। আপনি নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে কতটা উদ্গ্রীব, তা ভেবে দেখুন। তারপর আপনার ভয়কে পাশ কাটিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে যান।
৬. আত্মসমর্থন করুন
যখন আপনার লক্ষ্য, প্রকল্প ইত্যাদি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে এবং কেউ বলে যে আপনার লক্ষ্য অর্থহীন বা আপনি এটি করতে পারবেন না, তখন তাদের বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হবে। কারণ, তা আপনার মাথার ভেতরের সন্দেহগুলোরই প্রতিধ্বনি। স্বাভাবিকভাবেই আপনার মনে হবে, এই ব্যক্তি ও আমার মাথায় থাকা সব সন্দেহ আমাকে বারণ করার পরও আমি এটি কীভাবে অর্জন করতে পারব? আমার নিশ্চয়ই ভুল হচ্ছে, আমার পরিকল্পনা অর্থহীন। তখন আপনাকে সেই লোকগুলোকে, বিশেষত আপনার ভেতরের প্রতিধ্বনিগুলোকে বলতে হবে যে, তারা ভুল। আপনার পক্ষে এটি করা সম্ভব। সুতরাং তাদের বলুন, আপনি আপনার লক্ষ্যতে বিশ্বাস রাখেন, আপনি নিজেকে বিশ্বাস করেন, তাই আপনি এটি সম্পাদন করতে যাচ্ছেন। ‘10 things I Hate About You’ চলচ্চিত্রে একটি দুর্দান্ত পঙ্ক্তি রয়েছে; যখন নায়ক নায়িকার অনুসন্ধান ছেড়ে দিতে যাচ্ছিলেন, তখন নায়কের বন্ধু তাকে কিছু উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলেছিলেন, ‘কাউকে কখনো এতটা প্রশ্রয় দিয়ো না, যাতে তারা তোমাকে এমনটা বোধ করায় যেন তুমি যা চাও, তা তোমার প্রাপ্য নয়।’
৭. অনুসরণ করুন
মানুষ তাদের সম্মান করে, যারা নিজেদের কথামতো কাজ করে। আপনি নিজের কথামতো চলে নিজেকেই শ্রদ্ধা করবেন। নিজের ওপর বিশ্বাস আরও বাড়বে। আপনি জানেন যে আপনি কাজটি সম্পর্কে ভীত নন। আপনার কাজকর্মই আপনার মুখের কথাগুলোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। এটি আপনাকে আপনার লক্ষ্য অর্জনে, সম্পর্কগুলোকে শক্তিশালী করতে ও নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার পথকে প্রশস্ত করতে সহায়তা করে।
৮. দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করুন
দুঃখের ভিত্তি হলো স্বল্পমেয়াদি স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য গৃহীত সিদ্ধান্ত, যা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে বাধা দেয়। আপনি যদি অর্থ সাশ্রয়ের চেষ্টা করেন, তবে আপনাকে মিতব্যয়ী হতে হবে। যদি আপনি GMAT বা LSAT-এর লক্ষ্য রাখেন, তাহলে আপনাকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘন ঘন ঘোরাঘুরি বাদ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। আপনি যদি ওজন হ্রাস করতে চেষ্টা করেন, তবে আপনাকে ফার্স্ট ফুড খাওয়া কমাতে হবে ইত্যাদি। বড় লক্ষ্যের জন্য বড় ত্যাগের প্রয়োজন হয়। নিজেকে সংযত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে হয়। স্বল্পমেয়াদি আরাম আপনার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি না, তা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য স্বল্পমেয়াদি আরামের চেয়ে ভবিষ্যৎ জীবনে আপনাকে আরও বেশি সুখ এনে দেবে৷
৯. অন্যের নেতিবাচক চিন্তাভাবনাকে অগ্রাহ্য করুন
অনেক লোক বলবে, আপনি নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন না। এটি নিয়োগকর্তার প্রত্যাখ্যানই হোক, বন্ধু বা পরিবারের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই হোক না কেন, লোকেরা আপনাকে নানাভাবে বলার চেষ্টা করবে, আপনার লক্ষ্য অনেক বড়। আপনি প্রস্তুত নন বা আপনি এটি করতে পারবেন না ইত্যাদি। তাদের কথায় কান দিলে চলবে না। আপনাকে লক্ষ্যে অবশ্যই অটল থাকতে হবে। যখন তারা আপনাকে প্রতিকূলতার কথাবার্তা বলে দমিয়ে দিতে আসবে, শুধু মনে রাখবেন, বেশির ভাগ লোকেরা অধিকাংশ বিষয়েই ভুল জানে। মানুষ প্রতিদিনই পৃথিবী পরিবর্তন করে যাচ্ছে চারপাশের লোকজন তাদের নিরুৎসাহিত করা সত্ত্বেও। যদি মনে করেন আপনি এটি করতে পারবেন, তবে নিশ্চয়ই করতে পারবেন। তাদের কথায় কান না দিয়ে নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন এবং এগিয়ে যান।
১০. আপনাকে যা খুশি করে, তা আরও বেশি করে করুন
আপনার অতিরিক্ত সময়ে আপনি কী করতে পছন্দ করেন? ভ্রমণে যেতে, পাহাড়ে চড়তে, নৌবিহারে যেতে বা দেশের বাইরে যেতে, নাকি আপনি বাসায় আরাম করে দুর্দান্ত সব সিরিজ দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? আপনি যেটাই পছন্দ করেন না কেন, এর জন্য সময় তৈরি করুন। কারণ, জীবন অনেক ছোট। সর্বোত্তম স্থানে আরোহণ করার জন্য আপনার জীবনকে সমৃদ্ধ করতে হবে। নিজেকে সতেজ রাখতে হবে।
লেখক: কো-ফাউন্ডার, গ্লোবাল সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড লার্নিং, যুক্তরাষ্ট্র