তারকার আলোয় কি হারিয়ে যাচ্ছে ফুটবলের আসল সৌন্দর্য

নিজ নিজ দেশের ফুটবলে এখনো সবচেয়ে বড় নাম নেইমার, মেসি ও রোনালদোরয়টার্স ফাইল ছবি

বিশ্বকাপ এলেই ফুটবল যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে থাকে ২২ জনের লড়াই, অন্যদিকে একজন মানুষের গল্প। মাঠে হাজারো পাস, অসংখ্য দৌড়, কৌশল, পরিকল্পনা আর আত্মত্যাগের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত আলো গিয়ে পড়ে একজনের মুখে। গোল করলে তিনি নায়ক, গোল না করলে তিনিই হতাশার প্রতীক।

এবারের বিশ্বকাপেও সেই চিত্র বদলায়নি। বরং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি করে ফুটবলকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলা হয়েছে। ম্যাচের ফলাফল, দলের সাফল্য কিংবা একটি দেশের দীর্ঘদিনের ফুটবল-সংস্কৃতি—সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে কয়েকজন তারকা ফুটবলার।

কোনো দল জিতলে এখন বলা হয় না যে তারা ভালো খেলেছে। বলা হয়, অমুক তারকা আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন। কোনো দেশের স্বপ্নপূরণকেও অনেক সময় একজন মানুষের ব্যক্তিগত অর্জনের গল্পে পরিণত করা হয়। যেন পুরো দলটি কেবল একজনের মহিমা প্রতিষ্ঠার জন্যই মাঠে নেমেছে।

পর্তুগাল বললে এখনো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর কথাই সবার আগে আসে।

একজন ফরোয়ার্ড গোল করেন ঠিকই, কিন্তু সেই গোলের পেছনে থাকে একজন ডিফেন্ডারের সঠিক ট্যাকল, একজন মিডফিল্ডারের নিখুঁত পাস, একজন কোচের পরিকল্পনা এবং আরও বহু অদৃশ্য অবদান। মাঠের প্রতিটি মুহূর্ত আসলে বহু মানুষের সম্মিলিত শ্রমের ফল।

‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’—কবি কামিনী রায়ের এই অমর পঙ্‌ক্তিটি যেন ফুটবলের জন্যই লেখা। ফুটবলের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, এখানে একা কেউ জেতে না।

তবু আধুনিক ফুটবল ক্রমে অন্য গল্প বলছে। ক্যামেরা এখন বলের চেয়ে বেশি খোঁজে মুখ। ম্যাচের মাঝখানে দর্শক গ্যালারি, সেলিব্রিটি কিংবা কোনো তারকা খেলোয়াড়ের অভিব্যক্তি দেখানো হয় বারবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, অথচ পুরো দলের কৌশলগত সাফল্য থেকে যায় আড়ালে।
ফলাফল হলো, আমরা ধীরে ধীরে ফুটবলের গভীরতাকে হারিয়ে ফেলছি। আমরা গোল দেখি, কিন্তু গোল তৈরির গল্প দেখি না। আমরা নায়ককে দেখি, কিন্তু নায়কের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকদের দেখি না।

আরও পড়ুন
২০২২ সালের মেসির বিশ্বকাপ জয়কে আমরা উদ্‌যাপন করি, কিন্তু আর্জেন্টিনার পুরো দলটি যে কী অসাধারণ সমন্বয় দেখিয়েছিল, সে আলোচনা অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়
রয়টার্স

ইতিহাসও একই কথা বলে। ম্যারাডোনার নাম উচ্চারিত হয় বারবার, কিন্তু তাঁর পাশে থাকা অসাধারণ সতীর্থদের কথা কতজন মনে রাখে? ২০২২ সালের মেসির বিশ্বকাপ জয়কে আমরা উদ্‌যাপন করি, কিন্তু আর্জেন্টিনার পুরো দলটি যে কী অসাধারণ সমন্বয় দেখিয়েছিল, সে আলোচনা অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়।

আসলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক গল্প বলা সহজ। একজন মানুষকে কেন্দ্র করে আবেগ তৈরি করা সহজ। কিন্তু ফুটবলকে তার পূর্ণতায় বুঝতে চাইলে আমাদের আরও গভীরে তাকাতে হবে। কারণ, ফুটবল কেবল একজন তারকার গল্প নয়। এটি একটি দেশের গল্প, একটি দলের গল্প, একটি সংস্কৃতির গল্প। এটি ৯০ মিনিটে লেখা এক সমষ্টিগত মহাকাব্য।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যও এখানেই। একজন খেলোয়াড় হয়তো ম্যাচের শিরোনাম হন, কিন্তু ইতিহাস লেখে পুরো দল। তাই ফুটবলকে যদি সত্যিই ভালোবাসতে হয়, তবে আমাদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখার পাশাপাশি সেই অদৃশ্য হাতগুলোকেও দেখতে হবে, যারা আলোটিকে সেখানে পৌঁছে দিয়েছে।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা