রোনালদোর ক্যারিয়ারের স্মরণীয় ১০ মুহূর্ত

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোছবি কোলাজ: এআই

পর্তুগালের ৭ নম্বর জার্সি গায়ে দীর্ঘ ২৩ বছর মাঠ মাতিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এই সময়ে কখনো দেশকে এনে দিয়েছেন আনন্দের উপলক্ষ, কখনো কেঁদেছেন ব্যর্থতার বেদনায়। গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড, জিতেছেন বড় শিরোপা। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার মধ্য দিয়ে শেষ হলো পর্তুগিজ ফুটবলের এক গৌরবময় অধ্যায়।

পর্তুগালকে ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৯ ও ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগ জিতিয়েছেন রোনালদো। জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে করেছেন ১৪৬ গোল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও গোল করার রেকর্ড—দুটিই তাঁর দখলে। এই দীর্ঘ যাত্রায় রয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় ঘটনা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১০টি মুহূর্ত তুলে ধরা হলো।

১. জাতীয় দলে অভিষেক
২০০৩ সালের ২০ আগস্ট। কাজাখস্তানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে পর্তুগালের জাতীয় দলে অভিষেক হয় ১৮ বছর বয়সী রোনালদোর। ম্যাচটি ১-০ গোলে জেতে পর্তুগাল। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন তিনি।

তখনই স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন রোনালদো। তাঁর পারফরম্যান্স নজর কেড়েছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের। এরপর শুরু হয় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হয়ে ওঠার যাত্রা।

২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারি, জুরিখে ফিফা ব্যালন ডি’অর হাতে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দ্বিতীয়বারের মতো বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি
রয়টার্স

২. ইউরো ২০০৪ ফাইনালে কান্না
২০০৪ সালে নিজেদের মাঠে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে পর্তুগাল। শিরোপার লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ ছিল গ্রিস। পুরো দেশ তখন প্রথমবারের মতো ইউরোপসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল।

কিন্তু ফাইনালে ১-০ গোলে হেরে যায় পর্তুগাল। শেষ বাঁশি বাজার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন ১৯ বছর বয়সী রোনালদো। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন সেবার পূরণ হয়নি। সেই স্বপ্ন পূরণ হতে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও ১২ বছর।

৩. ২০০৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল
২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে নামেন রোনালদো। ইরানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলের খাতা খোলেন তিনি। পর্তুগাল ম্যাচটি জেতে ২-০ গোলে।

এরপর নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শেষ ষোলো এবং ইংল্যান্ডকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে পর্তুগাল। তবে সেমিফাইনালে জিনেদিন জিদানের পেনাল্টি গোলে ফ্রান্সের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় দলটি। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানির কাছেও হারে তারা। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ হয় পর্তুগাল। তবে এই বিশ্বকাপেই বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দেন রোনালদো।

২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগাল বাদ পড়ার পর কাঁদছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
এএফপি

৪. ইউরো ২০১৬: প্রথম বড় শিরোপা
২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পর্তুগালের অধিনায়ক ছিলেন রোনালদো। গ্রুপ পর্বে খুব একটা ভালো করতে পারেনি দলটি। তবে নকআউট পর্বে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয়।

ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালের ২৫ মিনিটেই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় রোনালদোকে। মাঠ ছাড়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তবে ডাগআউটে বসেও সতীর্থদের উৎসাহ দিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে এদেরের গোলে ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয় পর্তুগাল। ১২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে রোনালদোর।

৫. ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক
২০১৮ সালের ১৫ জুন রাশিয়া বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে অসাধারণ এক ম্যাচ খেলেন রোনালদো। পেনাল্টি থেকে প্রথম গোল করেন তিনি। পরে ডেভিড দে হেয়ার ভুলে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় গোল করেন।

ম্যাচের শেষ দিকে দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক থেকে গোল করে পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক। তাঁর নৈপুণ্যে ৩-৩ গোলে ড্র করে পর্তুগাল। চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম পর্তুগিজ খেলোয়াড়ও হন তিনি। যদিও শেষ ষোলোতে উরুগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
রয়টার্স

৬. ২০১৯ সালে নেশনস লিগ জয়
২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো উয়েফা নেশনস লিগের আয়োজন করা হয়। প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন রোনালদো। তাঁর গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে পর্তুগাল।

ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল নেদারল্যান্ডস। পোর্তোর স্তাদিও দো দ্রাগাওয়ে অনুষ্ঠিত ম্যাচে গনসালো গুয়েদেসের একমাত্র গোলে জেতে পর্তুগাল। জাতীয় দলের হয়ে ইউরো জয়ের পর এটি ছিল রোনালদোর দ্বিতীয় বড় শিরোপা।

৭. আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা
রোনালদোর ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে দুটি গোল করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ইরানের আলী দাইয়ের ১০৯ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান।

সেই ম্যাচে শুরুতে পেনাল্টি মিস করেছিলেন রোনালদো। তবে শেষ মুহূর্তে দুটি গোল করে পর্তুগালকে জয় এনে দেন। পরে গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নিয়ে যান ১৪৬-এ।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখন আল নাসরে ব্যস্ত
রয়টার্স

৮. ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হার
কাতার বিশ্বকাপ ছিল রোনালদোর ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ জয়ের শেষ বড় সুযোগগুলোর একটি। শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে পর্তুগাল। কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে শুরু থেকে খেলতে পারেননি রোনালদো।

ইউসুফ এন-নেসিরির একমাত্র গোলে ম্যাচটি জিতে নেয় মরক্কো। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামলেও দলকে হার থেকে বাঁচাতে পারেননি রোনালদো। ম্যাচ শেষে চোখের জলে মাঠ ছাড়েন তিনি। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।

৯. ২০২৫ সালে আবার নেশনস লিগ জয়
২০১৯ সালের ছয় বছর পর আবারও নেশনস লিগের ফাইনালে ওঠে পর্তুগাল। এবার প্রতিপক্ষ স্পেন। ফাইনালে দুবার পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ায় পর্তুগাল।

ম্যাচের ৬১ মিনিটে গোল করে স্কোর ২-২ করেন রোনালদো। অতিরিক্ত সময়েও ব্যবধান না বদলানোয় খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৫-৩ ব্যবধানে জেতে পর্তুগাল। প্রথম দল হিসেবে দ্বিতীয়বার নেশনস লিগ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করে তারা। রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যুক্ত হয় আরেকটি শিরোপা।

পরাজয়ের বেদনা সঙ্গী করে মাঠ থেকে বিদায় নেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
ছবি: রয়টার্স
আরও পড়ুন

১০. জর্জ জেসুসের সঙ্গে বিরোধ ও বিদায়
রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি ছিল বেশ ঘটনাবহুল। পর্তুগালের কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয় নরওয়ের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে। সেদিন বেঞ্চে বসে পুরো ম্যাচ দেখেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। তাঁর দল ম্যাচটি জেতে ২-১ গোলে।

খেলার সময় ও দলে নিজের ভূমিকা নিয়ে কোচের সঙ্গে সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন রোনালদো। একপর্যায়ে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান তিনি। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

অবশেষে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রোনালদো। ২৩ বছরের ক্যারিয়ারে ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল ও তিনটি বড় শিরোপা নিয়ে শেষ হয় তাঁর পর্তুগাল অধ্যায়।

রোনালদোর এই যাত্রায় যেমন আছে শিরোপা জয়ের উচ্ছ্বাস, তেমনি আছে পরাজয়ের কান্না। কখনো মাঠে একাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন, কখনো সতীর্থদের পাশে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রেকর্ড ও শিরোপার বাইরেও পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান—একটি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো।

সূত্র: গোলডটকম