ফুটবল দুনিয়ার তিন স্থপতি

পেপ গার্দিওলা, কার্লো আনচেলত্তি ও স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনছবি: সংগৃহীত

ফুটবল মাঠে আমরা দেখি গোল, দৌড়, উল্লাস, আবেগ আর ঝলমলে আলো। এই আলোর পেছনে থাকে কিছু মানুষ, যারা নিজেরা আলোয় আসেন না—তাঁরা মাঠের বাইরেই দাঁড়িয়ে আঁকেন জয়ের নকশা। তাঁরা ভাবেন, বিশ্লেষণ করেন আর গড়ে তোলেন দলকে পরিবারের মতো করে। তাঁদেরই বলে কোচ বা ম্যানেজার।

ফুটবলকে শুধুই খেলায় সীমাবদ্ধ না রেখে যাঁরা এটিকে এক দর্শনে, এক জীবনচিন্তায় রূপ দিয়েছেন, তেমন তিনজন নাম বারবার ইতিহাসে ফিরে আসে—স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, পেপ গার্দিওলা ও কার্লো আনচেলত্তি। তিন প্রজন্ম, তিন রঙের দর্শন অথচ তিনজনেই ফুটবলকে বদলে দিয়েছেন চিরতরে।

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন
গ্লাসগোর এক সাধারণ শ্রমিক পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষটি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের অন্যতম সফল কোচ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ হিসেবে তাঁর ২৬ বছরের যাত্রা এক ইতিহাস। তিনি ক্লাবটির হয়ে জিতেছেন ১৩টি প্রিমিয়ার লিগ, ২টি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ৫টি এফএ কাপসহ মোট ৩৮টি বড় শিরোপা। অন্যান্য ক্লাব মিলিয়ে জিতেছেন ৪৯টি শিরোপা।

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন।

সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল তাঁর নেতৃত্বের দর্শন। তিনি বলতেন, ‘ফুটবল ইজ নাথিং উইদাউট প্যাশন’। ফার্গুসনের সাফল্যের রহস্য ছিল কঠোর শৃঙ্খলা ও অদম্য মানসিকতা। ডেভিড বেকহ্যাম, রায়ান গিগস, পল স্কোলস—যাঁরা একসময় ছিলেন তরুণ প্রতিভা, তাঁদের গড়ে তোলার পেছনে এই এক মানুষই ছিলেন ছায়া হয়ে।

ডেভিড বেকহ্যাম একবার বলেছিলেন, ‘তিনি কেবল একজন কোচ ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাবার মতো, যিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন কীভাবে স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়াই করতে হয়।’

ফার্গুসনের দল মানে যুদ্ধের সৈনিকদের মতো একতা। তিনি প্রত্যেক খেলোয়াড়কে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন যে অসাধারণত্ব জন্মায় কঠোর পরিশ্রমে, জাঁকজমকে নয়।

পেপ গার্দিওলা
পেপ গার্দিওলা যখন কোচিং শুরু করেন, তখন অনেকেই বলেছিল—‘এই ছেলেটা কি সত্যিই কোচ হতে পারবে?’ কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বার্সেলোনায় তিনি ফুটবলের ভাষা বদলে দিলেন।

প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি হাতে পেপ গার্দিওলা
রয়টার্স

‘টিকি-টাকা’—দুনিয়া পেল এক নতুন শব্দ, এক নতুন ছন্দ। মেসি, জাভি, ইনিয়েস্তাদের নিয়ে গড়া সেই দল ফুটবলকে পরিণত করেছিল ব্যালেতে। বল চলেছে পায়ে, মাঠে যেন নৃত্যের ধারা। বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ ও ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে পেপ জিতেছেন ৩টি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ১১টি লিগ শিরোপাসহ মোট ৩৫-৪০টি শিরোপা। তাঁর দর্শন একটাই, ‘বল দখলে রাখা মানেই শুধু বল পায়ে রাখা নয়, বরং খেলার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।’

লিওনেল মেসি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘গার্দিওলা খেলা আগে থেকেই বুঝে ফেলেন। তিনি আমাদের বিশ্বাস করিয়েছেন যে আমরা খুব ভালো, প্রায় নিখুঁতভাবে খেলতে পারি।’

বায়ার্ন মিউনিখে গিয়ে গার্দিওলা জার্মান ফুটবলে নতুন ছন্দ আনেন, ম্যানচেস্টার সিটিতে এসে সেটিকে পূর্ণ করেছেন—গতিশীলতা, পাসিং আর বুদ্ধির সংগমে তৈরি করেছেন আধুনিক ফুটবলের পাঠ্যবই। পেপ যেন এক সুরকার, যিনি প্রতিটি পাসে খুঁজে পান সংগীতের ছন্দ।

কার্লো আনচেলত্তি
সব কোচই যেখানে উন্মাদনা ও উত্তেজনায় কাজ করেন, কার্লো আনচেলত্তি সেখানে শান্তি ও ভারসাম্যের মাধ্যমে জয় আনেন। তাঁর ঠোঁটে সব সময় এক হালকা হাসি, চোখে মৃদু দৃঢ়তা।

তিনি এত সব কিছু জিতেছেন, যা অন্য কেউ পারেননি—পাঁচবার উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ চ্যাম্পিয়ন (২০০৩, ২০০৭, ২০১৪, ২০২২, ২০২৪) এবং একমাত্র কোচ যিনি ইউরোপের পাঁচটি প্রধান লিগেই (ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন) চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তাঁর দলগুলো কখনো অতি জাঁকজমকপূর্ণ নয়, কিন্তু সব সময় কার্যকর। তিনি বিশ্বাস করেন—নেতৃত্ব দিতে চিৎকার করতে হয় না। শুধু বিশ্বাস অর্জন করলেই হয়।

কার্লো আনচেলত্তি
ইনস্টাগ্রাম/আনচেলত্তি

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো একবার বলেছিলেন, ‘আনচেলত্তি হলো এমন একজন কোচ, যিনি আবার আপনাকে ফুটবল ভালোবাসতে শেখান।’

রিয়াল মাদ্রিদের ২০১৪ সালের দশম ইউরোপিয়ান কাপ জেতা ছিল আনচেলত্তির শান্ত কৌশলের ফলাফল। চাপের মধ্যেও তিনি শান্ত—যেন এক নদী, যার গভীরতা বোঝা যায় কেবল জয়ের পর।

ফার্গুসনের কঠোরতা, গার্দিওলার সৃজনশীলতা, আনচেলত্তির স্থিরতা—তিনজনের দর্শন আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—ফুটবলকে পরিপূর্ণ করা। তাঁরা তিনজনই প্রমাণ করেছেন, ফুটবল জেতার আগে জয় করতে হয় মানুষের মন। যে কোচ খেলোয়াড়ের মনে আস্থা জাগাতে পারে, সে-ই আসলে জেতে খেলার আগেই। তাই হয়তো এই তিনজনের প্রতিটি দলই হয়ে উঠেছে পরিবারের মতো, যেখানে মাঠের বাইরে ভালোবাসা, আর মাঠের ভেতরে যুদ্ধ।

আজকের ফুটবলে কোচ বদলায়, দর্শন বদলায়, কিন্তু ফার্গুসন, গার্দিওলা ও আনচেলত্তি রয়ে যান অনন্ত প্রেরণা হয়ে। ফার্গুসন শিখিয়েছেন নেতৃত্ব, গার্দিওলা শেখাচ্ছেন শিল্প আর আনচেলত্তি শেখান শান্তি।

তাঁরা তিনজন মিলে যেন ফুটবলের ত্রিমূর্তি—যাঁরা প্রমাণ করেছেন, ফুটবল কেবল গোল বা জয় নয়, এটি এক দর্শন, আবেগ, ও মানবিকতার পাঠ। যখন মাঠে ভেসে আসে বাঁশির শব্দ আর খেলোয়াড়েরা প্রস্তুত হয় নতুন লড়াইয়ের জন্য—তখনো কোথাও না কোথাও তাঁদের ছায়া থেকে যায়, প্রতিটি কৌশলে, প্রতিটি পরিকল্পনায়, প্রতিটি স্বপ্নে।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা