শুভ জন্মদিন ‘জাদুকর’ লিওনেল মেসি
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট ছেলেটা হয়তো কখনো ভাবেনি, একদিন কোটি কোটি মানুষের আবেগের আরেক নাম হয়ে উঠবে। ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের সমস্যার কারণে যার ফুটবল ক্যারিয়ারই থেমে যেতে পারত। সেই ছেলেটাই পরিবারের ত্যাগ, নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে পৌঁছে যায় বার্সেলোনার লা মাসিয়ায়। সেখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাস লেখা।
একে একে ক্লাব ফুটবলে জেতার মতো সবকিছুই তিনি জিতেছেন। লিগ শিরোপা, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ক্লাব বিশ্বকাপ, কোপা দেল রে, ব্যালন ডি’অরসহ যা কিছু একজন ফুটবলারের স্বপ্ন হতে পারে, তার প্রায় সবই নিজের করে নিয়েছেন। তবু একটা আক্ষেপ বারবার ফিরে আসত—আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ জয়। সেই অপেক্ষাই হয়তো তাঁর গল্পটাকে আরও বেশি মহাকাব্যিক করে তুলেছে।
এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য আমরা শুধু একজন ফুটবলারের খেলা দেখিনি। আমরা একজন কিংবদন্তির অসংখ্য সমালোচনার ভার কাঁধে নিয়েও বারবার ঘুরে দাঁড়ানো, ব্যর্থতা পেরিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটা দুই হাতে উঁচিয়ে ধরার অবিস্মরণীয় যাত্রার সাক্ষী হয়েছি।
আজ এই মহানায়কের জন্মদিন। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে আবারও বইছে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। এমন এক সময়ে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই বিশ্বকাপের স্মৃতিগুলোয়, যেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রজন্মের আনন্দ, কান্না, হতাশা আর পরিপূর্ণতার গল্প।
ফিরে যাই, ২০০৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে। মহানায়কের প্রথম বিশ্বকাপ। তখন আমার কাছে ফুটবল মানে গোল বল আর রঙিন জার্সির খেলা। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ছাড়া অন্য কোনো দেশের নামও ঠিকমতো জানতাম না। কেউ জিজ্ঞেস করলে আর্জেন্টিনা বলতাম। কেন বলতাম, সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারব না। মনেও পড়ে না কিছু। হয়তো বড় ভাইয়া ব্রাজিল করত বলে আমি তার বিপরীত দলেই থাকব! তখন জানতাম না, এই দলকে সমর্থন করাটাও একটা মহাকাব্যের মতো হয়ে যাবে।
২০১০ সালে ফুটবল একটু একটু বুঝতে শেখা শুরু করেছি। চারদিকে একটা নাম নিয়ে মাতামাতি। লিওনেল মেসি। সবাই তাঁকে নিয়ে কথা বলে, আমিও শুনি। মেসির জন্যই আর্জেন্টিনাকে পুরোপুরি নিজের দল বানিয়ে ফেলি। আজ আমার ক্লাস থ্রির একটা স্টুডেন্ট আমার সঙ্গে ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে তর্ক করে, তাকে দেখে প্রায়ই হাসি পায়। কারণ, ২০১০ সালে আমিও ঠিক ক্লাস থ্রির স্টুডেন্ট ছিলাম। ওর মতোই কথা বলতাম।
২০১৪ সাল, এবার ফুটবল খেলা ভালোই বুঝি। ক্লাস সেভেনে পড়ি। চৌদ্দোর বিশ্বকাপে ছিল অন্য রকম অনুভূতি। বিভিন্ন পত্রিকার বিশ্বকাপের ম্যাগাজিন সংগ্রহ করা, খেলার খবরের জন্য টিভির সামনে বসে থাকা, রাত জেগে খেলা দেখা। সবকিছু মিলিয়ে এক অন্য রকম সময়। মেসির প্রতিটা গোলের পর উল্লাসটা এখনো চোখে ভাসে! তারপর সেই ফাইনাল। মারাকানার গ্যালারিতে হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের চোখে পানি ছিল। টিভির এপাশে বসে থাকা আমাদের চোখেও। খেলা শেষ হওয়ার ৭ মিনিট আগেই আমাদের হৃদয় ভাঙে। ট্রফির পাশে লিওনেল মেসির শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে থাকার সেই দৃশ্যটা! আহা!
২০১৮ সালে আসলে ভেতরে–ভেতরে বিশ্বাসটা তখন অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে। টানা দুই কোপা আমেরিকার ফাইনাল হার, ২০১৬ সালে মেসির অবসর ঘোষণা, তারপর আবার ফিরে আসা। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল বিশ্বকাপটা হয়তো আর কখনো মেসির হাতে দেখব না।
ওদিকে আন্তর্জাতিক ট্রফির হিসাবে রোনালদো এগিয়ে গেছে ২০১৬-তে ইউরো জিতে। আর মেসি? অলিম্পিক স্বর্ণ ছাড়া জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা নেই। তবু একটা কথাই বলতাম, ট্রফি থাক বা না থাক, আমাদের কাছে সেরা খেলোয়াড়ের নাম লিওনেল মেসি। সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য ট্রফির প্রয়োজন নেই। মেসিই বিশ্বসেরা আমাদের কাছে। মেসির বিশ্বকাপ তো নেই, কী হয়েছে! মেসিই সর্বকালের সেরা, বিশ্বসেরা। তবু কোথায় গিয়ে যেন আটকে যেতাম!
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে অপেক্ষার অবসান। তারপর ফিনালিসিমা। ৩৬ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রা। সবকিছু যেন ঠিকঠাক এগোচ্ছিল। তারপর ২০২২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হার। ট্রল, বিদ্রূপ, হাসাহাসি—সব আবার ফিরে এল। কিন্তু কিংবদন্তির গল্পগুলো বোধ হয় এমনই হয়। আবারও আর্জেন্টিনা আরও একবার ফাইনালের মঞ্চে। লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই রাত শুধু একটা ফুটবল ম্যাচ ছিল না; সেটা ছিল আবেগ, ভয়, আশা, হতাশা আর প্রত্যাবর্তনের এক মহাকাব্য। ১২০ মিনিট শেষে, টাইব্রেকারের পর, যখন মেসির হাতে সোনালি ট্রফিটা উঠল। তখন মনে হয়েছিল বোধ হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো।
আমার মুখ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বের হয়েছিল একটাই কথা—সর্বকালের সেরা বলতে আর বাধা কোথায়?
মজার ব্যাপার হলো, এই বিশ্বকাপের আগে মেসি খেলেছেন পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ। প্রতিটি বিশ্বকাপেই আমাদের এই প্রজন্মের বয়স, ফুটবল বোঝা সবই বদলেছে। কিন্তু মেসিকে দেখার অনুভূতিটা কি বদলেছে? যেন আমাদের বড় হয়ে ওঠার গল্পটা কোথাও গিয়ে মেসির বিশ্বকাপ যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে এসে আমরা অনেকটাই নির্ভার। এবার আর কোনো চাওয়াপাওয়া নেই। কিন্তু নামটা যে লিওনেল মেসি। ৩৯ ছুঁই ছুঁই বয়সে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল! সতীর্থ জুলিয়ান আলভারেজের কথায়, ‘আসলে বলার মতো খুব বেশি কিছু নেই। আমরা সবাই তাঁকে দেখছি। টানা ২০ বছর ধরে সে বিশ্বের সেরা, এরই মধ্যে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা...এই বয়সেও সে তার প্রতিভা আর জাদুকরি ক্ষমতার প্রদর্শন করে চলেছে।’
আরেকবার দ্য গ্রেটেস্ট অব অল টাইমের হাতে আরেকটা বিশ্বকাপ উঠলে কেমন দেখাবে? ভাবুন তো! ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হোক বা না হোক, কোনো আক্ষেপ নেই। ২০২২ সালে অধরা সেই ট্রফিটা ধরার অনেক আগেই মেসি আমাদের হৃদয় জিতে নিয়েছিলেন।
শুভ জন্মদিন জাদুকর লিওনেল মেসি। আমাদের শৈশব, কৈশোর আর বড় হয়ে ওঠার অসংখ্য স্মৃতির অংশ হয়ে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
সভাপতি, নোয়াখালী বন্ধুসভা