গ্রুপ পর্বে নজর কাড়ছে ছোট দলগুলো
বিশ্বকাপ মানেই সাধারণত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগালের মতো বড় দলগুলোর গল্প। কারা শিরোপা জিতবে, কোন তারকা আলো ছড়াবেন কিংবা কোন দল ফেবারিট—আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকে এসবই। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের অর্ধেকের বেশি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। নতুন বা তুলনামূলক ছোট দলগুলো এবার শুধু অংশগ্রহণকারী হয়ে থাকতে চায় না। গ্রুপ পর্বের এই পর্যায়ে এসে অন্তত এতটুকু বোঝা যাচ্ছে—তারা বড় দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই করতে প্রস্তুত, আর সুযোগ পেলে ম্যাচের ফলও নিজেদের দিকে নিতে পারে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রায়ই দেখা গেছে, বড় দলগুলোর নাম ম্যাচ শুরুর আগেই এগিয়ে থাকে। কিন্তু মাঠে সেই ব্যবধান সব সময় থাকে না। এবারের বিশ্বকাপের শুরুতেও দেখা যাচ্ছে, র্যাঙ্কিং আর পরিচিতির বাইরে গিয়ে ছোট দলগুলো নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর চেষ্টা করছে।
এ তালিকায় শুরুতেই আসে গত ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ কাতারের কথা। এই বিশ্বকাপের শুরুতে তারা আলোচনায় এসেছে অন্যভাবে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ ড্র করা দলটি ম্যাচের শেষ দিকে ফিরে এসে তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম পয়েন্ট তুলে নেয়। ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ কম থাকলেও সুযোগ তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা কাতারকে আলাদা করেছে।
আইভরিকোস্টের গল্প আরও ভিন্ন। ইকুয়েডরের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয় শুধু তিন পয়েন্ট নয়, আফ্রিকান ফুটবলের ধারাবাহিক অগ্রগতিরও একটি ইঙ্গিত। তুলনামূলক কম আলোচনায় থাকা দলগুলো এখন শুধু প্রতিরোধ করছে না, ম্যাচ জেতার মানসিকতা নিয়েও মাঠে নামছে।
চমক দেখিয়েছে মিসরও। বেলজিয়ামের মতো ইউরোপের প্রতিষ্ঠিত দলের বিপক্ষে ১-১ ড্র করে তারা দেখিয়েছে, অভিজ্ঞতা আর সংগঠিত ফুটবল থাকলে ব্যবধান কমানো সম্ভব। দ্বিতীয় ম্যাচেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ গোলের ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছে তারা।
একইভাবে সৌদি আরব উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-১ ড্র করে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে বড় দলের বিপক্ষে লড়াই এখন আর অসম্ভব কিছু নয়। গত বিশ্বকাপে তারা আর্জেন্টিনাকেও হারিয়েছিল।
ঘানাও নিজেদের ম্যাচে জয় তুলে নিয়েছে। পানামার বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জিতে তারা দেখিয়েছে, আফ্রিকান দলগুলোর উপস্থিতি এবারও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। দ্বিতীয় ম্যাচে অন্যতম ফেবারিট ইংল্যান্ডকে গোলশূন্য রুখে দিয়ে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে নিয়েছে তারা।
আবার সব চমক শুধু ফলাফলে হয়নি। পর্তুগালের বিপক্ষে কঙ্গোর ১-১ ড্র, স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের গোলশূন্য ড্র এবং উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র; কিংবা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জাপানের ২-২ ফল—এসব ম্যাচ দেখিয়েছে, ছোট দলগুলো এখন আর শুধু রক্ষণ করে সময় কাটাতে চায় না। নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে খেলতে নামছে তারা। দ্বিতীয় ম্যাচে জাপান প্রতিপক্ষকে চার গোলে উড়িয়ে দিয়েছে।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে হারলেও সেনেগালও প্রশংসা পাওয়ার মতো ফুটবল খেলেছে। স্কোরলাইন দেখে ম্যাচের পুরো গল্প বোঝা যায় না; বিশ্বকাপের বড় দলগুলোকেও যে ছন্দে আসতে পরিশ্রম করতে হচ্ছে, সেনেগাল সেই বাস্তবতার উদাহরণ।
অবশ্য গ্রুপ পর্বের মাত্র একটি বা দুটি ম্যাচ দিয়ে পুরো টুর্নামেন্টের চিত্র আঁকা যায় না। সামনে আরও গ্রুপ ম্যাচ, এরপর নকআউট পর্ব—যেখানে চাপ, অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতা আরও বড় ভূমিকা রাখে। বড় দলগুলোও সময়ের সঙ্গে নিজেদের ভুলগুলো ঠিক করে আরও সংগঠিত হয়ে ফিরে আসার সুযোগ পাবে। তাই এখনই কোনো দলকে এগিয়ে রাখা বা পিছিয়ে দেওয়ার সময় হয়নি।
তবে এই ম্যাচগুলো অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে বিশ্বকাপের ব্যবধান আগের মতো নেই। র্যাঙ্কিং, ইতিহাস কিংবা পরিচিত নাম এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মাঠে ফল নির্ধারণ করছে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা আর সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষমতা। নতুন বা তুলনামূলক ছোট দলগুলোও এখন শুধু অংশগ্রহণের মানসিকতা নিয়ে আসে না, তারা ম্যাচে প্রভাব রাখতে চায়, পয়েন্ট নিতে চায় এবং নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চায়।
বিশ্বকাপের পরের পথচলায় এই দলগুলো কত দূর যেতে পারবে, তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে গ্রুপ পর্বের শুরুটা অন্তত এটুকু বলছে—এবারের বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর পাশাপাশি ছোট দলগুলো নতুন গল্প লেখার প্রস্তুতিও নিয়ে এসেছে।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা