বিশের বরাতে বিষক্ষয়: স্মরণে ডিয়েগো জোতা

২০২৪–২৫ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিল লিভারপুল। ট্রফিটা হাতে পাওয়ার পর উচ্ছ্বাসে ভাসেন জোতারয়টার্স

১৯তম বারের মতো ইংলিশসেরার খেতাব জেতার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল সুদীর্ঘ তিন দশক। সেই সাপেক্ষে ২০তমবারের জন্য অপেক্ষাটা লিভারপুলের কমই ছিল; পাঁচ মৌসুম। তবে বিশেই হয়েছিল বিষক্ষয়। ইউরোপিয়ান সাফল্যে অনেকখানি এগিয়ে থাকলেও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বাগ্‌যুদ্ধে এগিয়ে থাকত স্রেফ একটি লিগ শিরোপা বেশি জেতায়। ২০তমবারের মতো ইংলিশ শীর্ষস্তরের শিরোপা জিতে লিভারপুল হলো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের সমানে সমান, করল আওয়াজ বন্ধ। বিষক্ষয় তো বটেই! আর এ উপলক্ষের সূচনাটা যেন করেছিলেন জার্সি নম্বর ২০, ডিয়েগো জোতা।

লিভারপুলের ২০তম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতার মৌসুম, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ মৌসুমটা লিভারপুল শুরু করেছিল ২০ নম্বর জার্সি পরিধান করা ডিয়েগো জোতার গোলে। ইপ্সউইচকে সেদিন লিভারপুল পরাজিত করেছিল ২-০ ব্যবধানে। মোহামেদ সালাহ জয় নিশ্চিত করার আগে দলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন জোতা। যদিও মৌসুমটা কেটেছিল জোতার চোটজর্জর, মাঠে যাওয়া-আসার মধ্যেই ছিলেন। তবু ২৬ ম্যাচে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিনিট খেলে করেছিলেন ৬টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট।

দিয়োগো জোতা (৪ ডিসেম্বর ১৯৯৬–৩ জুলাই ২০২৫)
এক্স

স্বাগতিক উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সের বিপক্ষেও অবতারের ভূমিকায় ছিলেন জোতা। নিজের সাবেক ক্লাবের বিপক্ষে সেদিন করেছিলেন জোড়া অ্যাসিস্ট। ইব্রাহিম কোনাতে তাঁর অ্যাসিস্ট থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নেওয়ার পর উলভস ফিরেছিল সমতায়; তবে লিভারপুল মাঠ ছেড়েছিল শেষ অবধি সালাহর গোলে ভর করে। আর সালাহ গোলটি করেছিলেন জোতার অ্যাসিস্ট থেকেই। এর ঠিক পরের ম্যাচেই আবারও গল্পের নায়ক জোতা। স্বাগতিক ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে তাঁর একমাত্র গোলেই জয়ীর বেশে মাঠ ছেড়েছিল লিভারপুল। অতঃপর স্বাগতিক নটিংহাম ফরেস্টের বিপক্ষে শুরুতে গোল হজম করে পিছিয়ে আছে লিভারপুল, ম্যাচের বাকি আর মিনিট বিশেক। বদলি নামা জোতাই সেদিন লিভারপুলকে এনে দিয়েছিলেন মূল্যবান পয়েন্টটি।

এর আগে ঘরের মাঠে ফুলহামের বিপক্ষে দুবার পিছিয়ে গিয়েও লিভারপুল মাঠ ছেড়েছিল ২-২ গোলের ড্র নিয়ে। ৮৬তম মিনিটে দলকে দ্বিতীয়বারের মতো সমতায় ফিরিয়েছিলেন বদলি নামা জোতা। সর্বশেষ নগর প্রতিদ্বন্দ্বী এভারটনের বিপক্ষে ঘরের মাঠে লিভারপুল সে মৌসুমে জয় পেয়েছিল তাঁর সুবাদেই, ম্যাচের ৫৭তম মিনিটে করেছিলেন ভাগ্য নির্ধারণী একমাত্র গোলটি। সেটি ছিল প্রিমিয়ার লিগের সে আসরে করা তাঁর সর্বশেষ গোল। সে মৌসুমের সর্বশেষ গোল।

আরও পড়ুন
দিয়োগো জোতা (১৯৯৬–২০২৫)
রয়টার্স

কে জানত, তাঁর জীবনের সর্বশেষ গোলটিও ছিল এটি!
যদিও এ লেখার মূল উদ্দেশ্য লিভারপুলের ২০তম প্রিমিয়ার লিগ জয়ের পেছনে ২০তম জার্সির মানুষটির প্রভাব; তবে আচমকা মাথায় এল ডিয়েগো জোতার আরও একখানা কাণ্ডের কথা।

জাতীয় দলের হয়ে ৪৯ ম্যাচে ২৬ গোলে অবদান রাখা জোতা সাম্প্রতিক সময়টায় কিঞ্চিৎ ব্রাত্যই হয়ে গিয়েছিলেন রাফায়েল লিঁয়াওর জন্য। তবে তাঁর অবদান রাখা ২৬তম গোলটি পর্তুগাল তো বটেই, ফুটবল ইতিহাসেরও অন্যতম বলার মতো একটি গল্প। উয়েফা নেশনস লিগ ২০২৪-২৫ মৌসুমের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম পর্বে সফরকারী পর্তুগাল ১-০ গোলে পরাজিত হয়। ফিরতি পর্বের শুরুতেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পেনাল্টি থেকে গোলের সুযোগ নষ্ট করে বসেন। সে ম্যাচটায় শেষ অবধি পর্তুগাল জিতেছিল ৫-২ গোলে। ৩-২ গোলে পিছিয়ে থাকার পরও প্রথম পর্বে করা গোলের সুবাদে সমতায় থাকা ডেনমার্ক খেলা নিয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। সেদিন অতিরিক্ত সময়ে পর্তুগাল আরও দুটি গোল দিয়েছিল, যার মধ্যে গনসালো রামোস দ্বিতীয় গোলটি করেছিলেন জোতার অ্যাসিস্ট থেকেই। পর্তুগালের জার্সিতে সেটিই ছিল সর্বশেষ গোলে তাঁর অবদান। এর ঠিক পরের ম্যাচেই মার্সিসাইড ডার্বিতে অ্যানফিল্ড তাঁর গোলেই মেতে উঠেছিল ডার্বি জয়ের আনন্দে।

এক বছর হয়ে গেছে জোতা আমাদের মাঝে নেই। তবে ক্রীড়ানুরাগী মাত্র নিশ্চিত, স্বর্গে বসেও তিনি আমাদের সঙ্গে একাত্মতা উপভোগ করছেন। একাত্ম আমরা হব নাই-বা কেন, বিশের রাতে এর চেয়েও সুন্দর বিষক্ষয় হওয়া তো সম্ভবই না!

মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা