এবারও বিশ্বকাপ জিতলে ইতিহাসের কোথায় থাকবেন মেসি
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের পর অনেকেরই মনে হয়েছিল, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি শেষ হয়ে গেছে। লিওনেল মেসি অবশেষে বিশ্বকাপ জিতেছেন, আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিনের বিতর্কেরও যেন অবসান ঘটিয়েছেন। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এর চেয়ে নিখুঁত সমাপ্তি আর হতে পারে না।
মেসির ক্যারিয়ার সব সময়ই তুলনার মধ্যে বন্দী ছিল। আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে ডিয়েগো ম্যারাডোনার উপস্থিতি এতটাই বিশাল যে মেসির প্রতিটি অর্জনকেই তাঁর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু দুই কিংবদন্তির গল্প একেবারেই ভিন্ন। ম্যারাডোনার জীবন ছিল নাটকীয় মোড়, বিতর্ক, সাফল্য এবং পতনের সমন্বয়ে তৈরি এক মহাকাব্য। অন্যদিকে মেসির পথচলা ছিল অনেক বেশি ধারাবাহিক—একজন অসাধারণ প্রতিভাবান কিশোর থেকে বিশ্ব ফুটবলের দীর্ঘস্থায়ী সম্রাট হয়ে ওঠার গল্প।
তবু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে—তিনি কি দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারবেন?
কাতারে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছিল। তবে শুধু ট্রফি জেতা নয়, টুর্নামেন্টজুড়ে মেসির ভূমিকাও ছিল আলাদা। দীর্ঘদিনের নীরব স্বভাবের মানুষটি নেতৃত্বের নতুন রূপ দেখিয়েছিলেন। ২০২১ সালে ব্রাজিলে কোপা আমেরিকা জয়ের পর থেকেই তিনি দলের ভেতরে আরও সক্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন। সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করা, চাপের মুহূর্তে সামনে দাঁড়ানো—সবই ছিল তাঁর পরিবর্তিত চরিত্রের অংশ।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে উত্তেজনাপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনালের পর ওয়াউট ভেগহর্স্টের উদ্দেশে বলা তাঁর বিখ্যাত ‘Que mira, bobo?’ মন্তব্যটি সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। অনেকের কাছে সেটি ছিল এমন একজন মানুষের প্রকাশ, যিনি বছরের পর বছর নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।
কাতার বিশ্বকাপের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য ছিল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ১৯৯৫ সালে কাতারেই আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতেছিল। সেই দলের সদস্য ছিলেন বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বর্তমান কোচিং স্টাফের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ওয়াল্টার সামুয়েল ও পাবলো আইমার। ২০০৫ সালের যুব বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ ছিলেন মেসি নিজে। আবার ২০০৭ সালের শিরোপাজয়ী দলে ছিলেন পাপু গোমেজ ও অ্যানহেল দি মারিয়া।
অর্থাৎ আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের যুব ফুটবল সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এক অর্থে শুরু হয়েছিল কাতারে আর ২০২২ সালে এসে সেই গল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্যও ধরা দেয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে।
বিশ্বকাপ জয়ের পর যদি মেসি অবসরের ঘোষণা দিতেন, তাহলে সেটি হয়তো চলচ্চিত্রের নিখুঁত সমাপ্তির মতো হতো। ট্রফি হাতে বিজয়ী অধিনায়ক, কোটি মানুষের স্বপ্নপূরণ এবং তারপর বিদায়। কিন্তু বাস্তবতা অন্য পথে এগিয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে আর্জেন্টিনা আবারও মেসিকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবেই দেখছে। বিশ্বকাপ চলাকালে তাঁর বয়স হবে ৩৯ বছর। এতে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ খেলা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হবেন। যদিও পুরো টুর্নামেন্ট বিবেচনায় তিনি হবেন মাত্র দশম বয়স্ক খেলোয়াড়। আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার আগের তুলনায় অনেক দীর্ঘ হচ্ছে।
মেসির সামনে এখন কী লক্ষ্য
অনেকের মতে, মেসির আর কিছু প্রমাণ করার নেই। তিনি ক্লাব ফুটবলের প্রায় সব শিরোপা জিতেছেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলেও সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের সেরা ক্রীড়াবিদদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—তাঁরা প্রায়ই নিজেদের সীমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা মানতে রাজি নন। সম্ভবত মেসিও তেমনই ভাবছেন।
যদি আর্জেন্টিনা আবার বিশ্বকাপ জেতে, তাহলে মেসি শুধু ম্যারাডোনার সমকক্ষ নন, অনেকের চোখে তাঁকে ছাড়িয়েও যেতে পারেন। কারণ, ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ জিতেছিলেন একবার; মেসির সামনে সুযোগ রয়েছে দ্বিতীয়বার সেই কীর্তি গড়ার।
তবে বাস্তবতা সহজ নয়। কাতার বিশ্বকাপে মেসির খেলার ধরনই বলে দেয় বয়স তাঁর ওপর প্রভাব ফেলছে। তিনি আর আগের মতো পুরো মাঠ দাপিয়ে বেড়ান না। অনেক সময় ম্যাচের বাইরে থেকেও হঠাৎ একটি মুহূর্তে খেলার গতিপথ বদলে দেন। তাঁর এই ভূমিকাকে কার্যকর করতে রদ্রিগো ডি পল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জুলিয়ান আলভারেজ ও এনজো ফার্নান্দেজও তাঁকে ঘিরে বিশাল পরিশ্রম করেছিলেন।
বর্তমানে মেসি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে খেলছেন। কাতার বিশ্বকাপের আগে যেখানে তিনি ফ্রান্সের লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিয়মিত খেলতেন, এখন তাঁর প্রতিযোগিতার মান তুলনামূলক কম। চলতি বছরে তিনি ১৪টি এমএলএস ম্যাচ এবং ২টি কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপ ম্যাচ খেলেছেন।
তবু জাতীয় দলের হয়ে মেসির কার্যকারিতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সর্বশেষ কোপা আমেরিকা জয়ের অভিযানে এবং পরবর্তী বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচগুলোয় তিনি এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও একটি জায়গায়। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর তিনি কী করবেন, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। কোচিং, টেলিভিশন বিশ্লেষণ কিংবা অন্য কোনো পেশা কোনোটির প্রতিই তিনি প্রকাশ্যে খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি। ফলে ফুটবল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার চিন্তা হয়তো তাঁর জন্য সহজ নয়।
কাতার বিশ্বকাপকে একসময় নিখুঁত উপসংহার মনে হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়দের গল্প সব সময় প্রচলিত নিয়ম মেনে শেষ হয় না। সম্ভবত কাতার ছিল না শেষ অধ্যায়; বরং আরও বড় কোনো সমাপ্তির সূচনা।
হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক অধ্যায়। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে কিছু সমাপ্তি আসলে নতুন কিংবদন্তির জন্ম দেয়। চলমান বিশ্বকাপ সেই রকম কোনো গল্পের সাক্ষী হবে কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—মেসির শেষ বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা ফুটবল–বিশ্ব।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা