সেই দিন দূরে নয়, আফ্রিকার দলও থাকবে শিরোপার দাবিদার

বিশ্ব ফুটবলের নতুন পরাশক্তি মরক্কোএএফপি

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই একসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি কিংবা ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিরা। অন্যদিকে আফ্রিকার দলগুলোর নাম উচ্চারিত হতো সম্ভাবনা আর চমকের তালিকায়। কোনো আফ্রিকান দল যদি গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে উঠত, সেটিই ধরা হতো বড় অর্জন। কোয়ার্টার ফাইনাল কিংবা সেমিফাইনালের স্বপ্ন ছিল অনেকটা অলীক। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ধারণা বদলে যেতে শুরু করেছে। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ।

২০২২ সালে মরক্কো হয়ে উঠেছিল পুরো আফ্রিকা মহাদেশের আশার প্রতীক। বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় শক্তিকে টপকে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল তারা। বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষ মরক্কোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। শুধু আফ্রিকার সমর্থকেরাই নন, নিরপেক্ষ ফুটবলপ্রেমীরাও চেয়েছিলেন মরক্কোর রূপকথা আরও দীর্ঘ হোক। যদিও শেষ পর্যন্ত শিরোপা ছোঁয়া হয়নি, তবু তারা প্রমাণ করেছিল, আফ্রিকার দলগুলো আর শুধু অংশগ্রহণ করতে আসে না, তারা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও দেখতে পারে।

অনেকেই মনে করেছিলেন, মরক্কোর সেই সাফল্য হয়তো একবারের জন্যই। কিন্তু চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করল। এবার শুধু মরক্কো নয়, আফ্রিকার আরও কয়েকটি দল নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছে। বড় দলের বিপক্ষে সাহসী ফুটবল খেলেছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে এবং কোটি দর্শকের হৃদয় জয় করেছে। শিরোপা না জিতলেও আফ্রিকার দলগুলো এবার বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

বহু আফ্রিকান তরুণের স্বপ্ন দ্রগবা-ইতোর মতো হওয়ার
ছবি: টুইটার

বদলে যাওয়া এক মহাদেশের গল্প
আফ্রিকার ফুটবলের ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রতিভার কখনো অভাব ছিল না। জর্জ উইয়াহ, রজার মিলা, স্যামুয়েল ইতো, দিদিয়ের দ্রগবা, ইয়ায়া তুরে, জে-জে ওকোচা কিংবা সাদিও মানের মতো ফুটবলাররা বহু আগেই দেখিয়েছেন, আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বমানের খেলোয়াড় জন্ম নেয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন সব সময় থেকেই গেছে—এত প্রতিভা থাকার পরও কেন আফ্রিকার কোনো দল বিশ্বকাপের শেষ চার কিংবা ফাইনালে নিয়মিত জায়গা করে নিতে পারে না?

এর উত্তর লুকিয়ে ছিল অবকাঠামো, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতার ঘাটতিতে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা, আধুনিক একাডেমি, শক্তিশালী ঘরোয়া লিগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের আরও এগিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে আফ্রিকার অনেক দেশ প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরি করলেও সেই প্রতিভাকে ধরে রাখার মতো পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেনি।

গত এক দশকে চিত্রটা বদলাতে শুরু করে। মরক্কো, সেনেগাল, মিসর, আইভরিকোস্ট, ঘানা কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়ায়। আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হয়, তরুণদের জন্য একাডেমির সংখ্যা বাড়ে, ইউরোপে বেড়ে ওঠা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফল ধীরে দেখা যেতে শুরু করে।

২০২২ বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে খেলেছিল মরক্কো
ছবি: রয়টার্স

মরক্কো দেখিয়েছিল পথ
২০২২ সালের আগে আফ্রিকার কোনো দল কখনো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেনি। ক্যামেরুন (১৯৯০), সেনেগাল (২০০২) এবং ঘানা (২০১০) কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে থেমে গিয়েছিল। তাই মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা ছিল শুধু একটি দেশের সাফল্য নয়, এটি পুরো মহাদেশের আত্মবিশ্বাসের পুনর্জন্ম।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের কোচ, সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকেরা একটি বিষয় বারবার বলেছেন—মরক্কো প্রমাণ করেছে যে শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা এবং সঠিক কৌশল থাকলে ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিধর দলগুলোকেও হারানো সম্ভব। সেই বিশ্বাসই যেন ২০২৬ বিশ্বকাপে অন্য আফ্রিকান দলগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

এবার মরক্কো আবারও নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার আফ্রিকার অন্য দলগুলোও নিজেদের পরিচয় নতুনভাবে তুলে ধরেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সংগঠিত ফুটবল দিয়ে নজর কেড়েছে, কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসে সবাইকে চমকে দিয়েছে, ডিআর কঙ্গো বহু বছর পর ফিরে এসে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া পরিচয় ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে মিসর, আলজেরিয়া, সেনেগাল, ঘানা এবং আইভরিকোস্টও বড় দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই করে বুঝিয়ে দিয়েছে, আফ্রিকার ফুটবল আর আগের জায়গায় নেই।

একসময় বিশ্বকাপে আফ্রিকার দলগুলোর লক্ষ্য ছিল গ্রুপ পর্ব পার হওয়া। এখন সেই মানসিকতা বদলে গেছে। মাঠে নামার আগেই তারা নিজেদের ছোট দল হিসেবে ভাবছে না; বরং প্রতিটি ম্যাচে সমানতালে লড়াই করছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকার দলগুলোর সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো ট্রফি নয়। তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়া। এখন আর আফ্রিকার দলকে শুধু ‘ডার্ক হর্স’ বলা হয় না। তাদের অনেকেই সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নের তালিকায় রাখতে শুরু করেছেন।

এবারের বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করা দলগুলোর গল্প ভিন্ন ভিন্ন। কারও গল্প প্রত্যাবর্তনের, কারও প্রথমবারের বিশ্বকাপ, কারও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিজেকে ফিরে পাওয়ার।

আরও পড়ুন
দক্ষিণ কোরিয়াকে ১–০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এবার বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠে দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের পর উদ্‌যাপনটা তাই দেখার মতোই হলো
রয়টার্স

দক্ষিণ আফ্রিকা
একসময় আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৯৬ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ের পর দলটি নিয়ে প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বিশ্বমঞ্চ থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। ২০১০ সালে স্বাগতিক হিসেবে বিশ্বকাপ খেললেও এরপর আর বিশ্বকাপে দেখা যায়নি তাদের।

২০২৬ বিশ্বকাপ সেই অপেক্ষার অবসান ঘটায়। দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে আসে ‘বাফানা’। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, এবার তারা স্বাগতিক হওয়ার সুবাদে নয়, কঠিন বাছাইপর্ব পেরিয়ে নিজেদের যোগ্যতায় বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দলগত সমন্বয়। হয়তো দলে মেসি, এমবাপ্পে বা ভিনিসিয়ুসের মতো সুপারস্টার ছিল না, কিন্তু প্রত্যেক খেলোয়াড় নিজের দায়িত্বটা নিখুঁতভাবে পালন করেছেন। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও তারা রক্ষণভাগকে সংগঠিত রেখে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করে।

বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু বড় তারকা থাকলেই ভালো ফুটবল খেলা যায় না। পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস থাকলেও বড় দলগুলোর সঙ্গে সমানতালে লড়াই করা সম্ভব। যদিও তাদের যাত্রা খুব বেশি দূর এগোয়নি, তবু মাঠে তাদের লড়াকু মানসিকতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে এসেই ইতিহাস গড়ল কেপ ভার্দে
রয়টার্স

কেপ ভার্দে
এই বিশ্বকাপে যদি কোনো দলকে ‘সবচেয়ে বড় চমক’ বলা যায়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে কেপ ভার্দে।
মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। অনেকেই ভেবেছিলেন, অভিষেক বিশ্বকাপে তারা হয়তো শুধু অভিজ্ঞতা অর্জন করেই ফিরে যাবে। কিন্তু মাঠে নেমে কেপ ভার্দে যেন সবাইকে ভুল প্রমাণ করল।

গ্রুপ পর্বে তারা সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলের বিপক্ষে ড্র করে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। অথচ বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান ছিল অনেক নিচে। কিন্তু র‍্যাঙ্কিং যে সব সময় বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না, সেটিই প্রমাণ করেছে কেপ ভার্দে।

নকআউট পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ম্যাচের আগে অনেকেই বড় ব্যবধানে আর্জেন্টিনার জয় অনুমান করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেপ ভার্দে দুইবার সমতায় ফিরে আসে এবং শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয়। শেষ মুহূর্তের গোল না হলে ম্যাচটি টাইব্রেকারেও গড়াতে পারত।

ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসিও কেপ ভার্দের প্রশংসা করে বলেন, ‘বিশ্বকাপে কেউ কাউকে বিনা লড়াইয়ে কিছু ছেড়ে দেয় না।’ এই মন্তব্যই বলে দেয়, ছোট্ট একটি দেশ কীভাবে পুরো ফুটবল–বিশ্বকে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে।

কেপ ভার্দের গল্প শুধু ফুটবলের নয়; এটি বিশ্বাসের গল্প। সীমিত জনসংখ্যা, সীমিত সম্পদ—সব সীমাবদ্ধতা পেছনে ফেলে তারা দেখিয়েছে, স্বপ্ন বড় হলে ছোট দেশও বিশ্বমঞ্চে বড় গল্প লিখতে পারে।

বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গো হয়তো শিরোপার দাবিদার ছিল না, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচেই তারা লড়েছে
রয়টার্স

ডিআর কঙ্গো
আফ্রিকার ফুটবলের ইতিহাসে ডিআর কঙ্গোর নাম নতুন নয়। তবে দীর্ঘ কয়েক দশক তারা বিশ্বকাপ থেকে দূরেই ছিল। ১৯৭৪ সালের পর আবারও বিশ্বকাপে ফিরে আসা ছিল দেশটির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা। নতুন কোচিং স্টাফ, ইউরোপে খেলা কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি এবং তরুণদের ওপর আস্থা—সব মিলিয়ে দলটি ধীরে নিজেদের গুছিয়ে তোলে।

বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গো হয়তো শিরোপার দাবিদার ছিল না, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচেই তারা লড়েছে। বিশেষ করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাদের শারীরিক সক্ষমতা, গতি এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল নজর কেড়েছে। নকআউট পর্বেও তারা সহজে হার মানেনি।

ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত ফলাফলে নয়; বরং পুরো আফ্রিকাকে আবার মনে করিয়ে দেওয়া যে এই দেশের ফুটবলে এখনো অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।

রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনাকে প্রায় হারিয়ে দিয়েছিল মিশর
রয়টার্স

মিসর
আফ্রিকার সবচেয়ে সফল দলগুলোর তালিকায় মিসরের নাম সব সময়ই থাকবে। সাতবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ী এই দল বহু বছর ধরেই মহাদেশের অন্যতম শক্তি।

২০২২ বিশ্বকাপে না খেলতে পারার হতাশা কাটিয়ে ২০২৬ সালে তারা আবার বিশ্বকাপে ফিরে আসে। শুরু থেকেই দলটি ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের সমন্বয়ে গড়া স্কোয়াড প্রতিটি ম্যাচেই ধৈর্য ধরে খেলেছে।
বিশেষ করে নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে মিসর অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। তারা জানত, বড় দলের বিপক্ষে একমুহূর্তের ভুলই ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে। তাই রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রেখে সুযোগ পেলেই আক্রমণে ওঠার কৌশল নিয়েছিল।

মিসরের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের অভিজ্ঞতা। বহু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা দলটিকে কঠিন মুহূর্তে শান্ত থাকতে সাহায্য করেছে। আর সেটিই তাদের আফ্রিকার অন্যতম নির্ভরযোগ্য দলে পরিণত করেছে।

বিশ্বকাপে মিসরের পারফরম্যান্স হয়তো শিরোপা এনে দেয়নি, কিন্তু তারা দেখিয়ে দিয়েছে—আফ্রিকার ফুটবল এখন কেবল আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৌশল, পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা।

আফ্রিকার ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী নাম সেনেগাল
রয়টার্স

সেনেগাল
আফ্রিকার ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী নাম সেনেগাল। ২০০২ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল তারা। এরপর ২০২২ বিশ্বকাপেও নকআউট পর্বে খেলে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়। সেই ধারাবাহিকতাই ধরে রাখার চেষ্টা করেছে ২০২৬ বিশ্বকাপে।

সাদিও মানের প্রজন্ম ধীরে অভিজ্ঞ হয়ে উঠলেও সেনেগালের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দলগত ভারসাম্য। রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণ—তিন বিভাগেই ছিল পরিকল্পিত ফুটবলের ছাপ। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও তারা নিজেদের স্বাভাবিক খেলা থেকে সরে আসেনি; বরং সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে উঠে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলেছে।

এই বিশ্বকাপে সেনেগালের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল তাদের মানসিক দৃঢ়তা। একসময় আফ্রিকার অনেক দল বড় দলের বিপক্ষে নামার আগেই রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে খেলত। কিন্তু সেনেগাল সেই ধারা বদলে দিয়েছে। ম্যাচ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই তারা মাঠে নেমেছে। প্রতিটি বলের জন্য লড়াই, উচ্চগতির প্রেসিং এবং শারীরিক সক্ষমতা তাদের অন্যতম শক্তি ছিল।

বিশ্বকাপ শেষে হয়তো তাদের হাতে ট্রফি ওঠেনি, কিন্তু তারা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, আফ্রিকার সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর তালিকায় সেনেগালের নাম অনেক দিনই থাকবে।

বিশ্বকাপে ঘানার যাত্রা খুব বেশি দীর্ঘ না হলেও তারা প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে
এএফপি

ঘানা
ঘানার নাম শুনলেই বিশ্বকাপপ্রেমীদের মনে পড়ে ২০১০ সালের সেই হৃদয়ভাঙা রাত। উরুগুয়ের বিপক্ষে লুইস সুয়ারেজের হ্যান্ডবল, আসামোয়া গিয়ানের মিস করা পেনাল্টি—সব মিলিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল।

কিন্তু ঘানা কখনোই থেমে থাকেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে তারা নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে এসেছে। অভিজ্ঞতার তুলনায় তরুণদের সংখ্যাই ছিল বেশি। ফলে শুরু থেকেই তাদের ফুটবলে ছিল গতি, সাহস এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা।

বিশ্বকাপে ঘানার যাত্রা খুব বেশি দীর্ঘ না হলেও তারা প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপের শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষেও তারা নিজেদের ফুটবল খেলেছে। বিশেষ করে মাঝমাঠে বলের দখল ধরে রাখা এবং দ্রুত আক্রমণে ওঠার ক্ষমতা অনেক ফুটবল–বিশ্লেষকের নজর কেড়েছে।

ঘানার এই দলের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, স্কোয়াডের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের বয়স তুলনামূলক কম। ফলে ২০৩০ বিশ্বকাপের সময় তারা আরও অভিজ্ঞ হয়ে উঠবেন। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আগামী কয়েক বছরে ঘানা আবারও আফ্রিকার অন্যতম সেরা দলে পরিণত হতে পারে।

২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও নিজেদের নতুন পরিচয়ে হাজির হয়েছে আইভরিকোস্ট।

আইভরিকোস্ট
একটা সময় দ্রগবা, ইয়ায়া তুরে, কলো তুরে কিংবা জারভিনহোর মতো তারকায় ভরা ছিল আইভরিকোস্ট। কিন্তু সেই সোনালি প্রজন্ম বিদায় নেওয়ার পর দলটি কিছুটা ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও নিজেদের নতুন পরিচয়ে হাজির হয় তারা। এই দলের বিশেষত্ব ছিল ভারসাম্য। আক্রমণে গতি, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণে দৃঢ়তা—সব মিলিয়ে তারা প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল উপহার দিয়েছে। অনেক ম্যাচে ফল তাদের পক্ষে না এলেও খেলায় কোনো সময় আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা যায়নি।

আইভরিকোস্টের ফুটবলারদের একটি বড় অংশ ইউরোপের শীর্ষ লিগে নিয়মিত খেলে। সেই অভিজ্ঞতাই বিশ্বকাপে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী শক্তিগুলো আবারও নিজেদের হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়ার পথে রয়েছে।

জর্ডানের বিপক্ষে গোলের পর আলজেরিয়ার খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস
রয়টার্স

একসময় বলা হতো, আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিভা। এখন সেই কথার সঙ্গে আরও কয়েকটি শব্দ যোগ হয়েছে— পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিকতা। গত কয়েক বছরে আফ্রিকার অনেক দেশ নিজেদের ফুটবলকাঠামো উন্নত করেছে। আধুনিক একাডেমি তৈরি হয়েছে, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতার মান বেড়েছে, বিদেশে বেড়ে ওঠা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে আনা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় কোচদেরও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাবই ধীরে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাচ্ছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকা থেকে রেকর্ডসংখ্যক দল অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। শুধু অংশ নেওয়াই নয়, তাদের অধিকাংশই গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং পুরো মহাদেশের ফুটবল উন্নয়নের প্রতিফলন।
আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, এখন আর ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো আফ্রিকান প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ পায় না। কারণ, আফ্রিকার দলগুলো শুধু শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; কৌশলগত দিক থেকেও তারা অনেক পরিণত হয়েছে।

যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্বকাপের শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে আফ্রিকার কোনো দলকে দেখাটা আর অবাক করার মতো কিছু হবে না। মরক্কো ইতিমধ্যেই পথ দেখিয়েছে। সেনেগাল নিজেদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। ঘানা নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলছে। আইভরিকোস্ট আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর পথে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ডিআর কঙ্গো নতুন উদ্যমে ফিরেছে। আর কেপ ভার্দে দেখিয়ে দিয়েছে, ছোট দেশও বড় স্বপ্ন দেখতে পারে।

ফুটবল–বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আফ্রিকার দলগুলোর এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে বয়সভিত্তিক ফুটবলে বিনিয়োগ, আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা, ইউরোপের শীর্ষ লিগে নিয়মিত খেলা আফ্রিকান ফুটবলারদের অভিজ্ঞতা এবং কৌশলগত উন্নয়নের ফল এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। একসময় যেসব দলকে শুধু শারীরিকভাবে শক্তিশালী বলা হতো, এখন তারা ট্যাকটিক্যালি পরিণত এবং মানসিকভাবেও অনেক বেশি দৃঢ়।

২০২২ সালে মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা ছিল আফ্রিকার জাগরণের সূচনা। আর ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই বার্তাকে আরও জোরালো করেছে। এবার একটি দলের সাফল্যের গল্প নয়; বরং পুরো মহাদেশের ফুটবলের অগ্রগতিই আলোচনায় এসেছে।

প্রতিটি বিশ্বকাপই কিছু নতুন নায়কের জন্ম দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই নায়ক শুধু কোনো একজন ফুটবলার নন, বরং পুরো আফ্রিকা। হয়তো এবারও বিশ্বকাপের ট্রফি আফ্রিকার কোনো দেশের হাতে ওঠেনি। কিন্তু ফুটবল যে শুধু শিরোপার হিসাব নয়, সেটাই আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে আফ্রিকার দলগুলো। সাহস, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা আর শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা—এসবই তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা