যাঁর নিয়োগে হয়েছিল সমালোচনা, তিনিই লিখলেন আর্জেন্টাইন রূপকথা
টাকার অভাবে যখন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) হাহাকার করছিল, দেউলিয়া হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্বের কোনো নামীদামি বা হাই প্রোফাইল কোচকে দলে ভেড়ানোর সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছিল; ঠিক তখনই কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে তারা দলের তৎকালীন সহকারী কোচ, অনভিজ্ঞ লিওনেল স্কালোনির কাঁধে দায়িত্ব তুলে দেয়।
২০১৮ সালের ৩ আগস্ট, অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে তাঁর এই যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে ২৯ নভেম্বর ২০১৮ তে স্থায়ী রূপ নেয়।
তখন চারদিকে শুধু উপহাস, শ্লেষ আর সমালোচনা। দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিও ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছিলেন, স্কালোনি তো রাস্তার ট্রাফিকও পরিচালনা করতে পারবেন না, দল চালাবেন কী করে! কিন্তু নিয়তির লিখন হয়তো অন্য কোথাও লেখা ছিল।
একসময় আর্জেন্টিনার আকাশজুড়ে কেবলই ছিল মেঘের ঘনঘটা। সেই বিষাদের সুর যেন মিশে গিয়েছিল বুয়েনস এইরেসের আনাচকানাচে। ২৬টি বসন্ত কেটে গিয়েছিল মরু-তৃষ্ণার মতো অবস্থায় এক ফোঁটা শিরোপার তৃপ্তিতে।
২০১৪ সালের ১৩ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের ১-০ গোলের হার, কিংবা ২০১৫ সালের ৪ জুলাই এবং ২০১৬ সালের ২৬ জুন কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরপর দুইবার টাইব্রেকারের সেই বুকভাঙা পরাজয়—প্রতিবার ট্রফিটা হাতছাড়া হতো, আর মনে হতো, এ যেন এক অনন্ত অভিশাপ।
২০১৮ সালের ৩০ জুন, রাশিয়া বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলের পরাজয়ে যখন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ–যাত্রা শেষ হলো, নীল-সাদা জার্সি পরা লিওনেল মেসির অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে সারা বিশ্ব ভেবেছিল—এই দুঃখ বুঝি চিরন্তন, এই কান্না বুঝি নিয়তির নির্মম লিখন। আর্জেন্টিনা তখন হয়ে উঠেছিল এক মূর্তিমন্ত দুঃখের মহাকাব্য।
ঠিক তখনই ফুটবলের বিধাতা ডাগআউটের অন্তরালে থাকা এই সহকারী কারিগরকে মূল আলোয় নিয়ে এলেন। টাকার অভাব যাঁকে প্রধান কোচের চেয়ারে বসিয়েছিল, তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবলের জন্য আবির্ভূত হলেন সেই আরব্য রজনীর ‘আলাদিনের দৈত্য’ হয়ে! আলাদিনের প্রদীপ থেকে যেমন দৈত্য বেরিয়ে এসে সব অসম্ভবকে এক তুড়িতে সম্ভব করে তোলে, স্কালোনিও তেমনি তাঁর জাদুর ছোঁয়ায় আর্জেন্টিনার ভাগ্যাকাশ বদলে দিলেন।
প্রদীপের দৈত্যের মতোই স্কালোনি যেন এসে জিজ্ঞাসা করলেন—‘হুকুম করুন মালিক, কী চাই আপনার?’
আর কোটি ভক্তের হাহাকারমিশ্রিত উত্তর ছিল, ‘আমাদের একটা ট্রফি এনে দাও, আমাদের মেসির মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে দাও!’
দৈত্য যেমন অসাধ্য সাধন করে, স্কালোনিও ট্রফির ক্ষুধা মেটাতে নিঃশব্দে কাজ শুরু করলেন। ২০১৯ সালের ২ জুলাই, কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর সবাই যখন আবার সমালোচনায় মুখর, স্কালোনি তখন দলকে দিলেন এক অদম্য রূপ। তিনি তরুণদের মনে বুনে দিলেন বিশ্বাসের বীজ। অহংকার আর ইগো ধুয়ে-মুছে তৈরি করলেন ‘লা স্কালোনেতা’।
তারপর শুরু হলো সেই জাদুকরি যাত্রা। ২০১৯ সালের ৩ জুলাই চিলির বিপক্ষে ২-১ গোলের জয় দিয়ে শুরু করে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৫-০ গোলে হারানো পর্যন্ত টানা ৩৬টি ম্যাচ অপরাজিত থাকার এক অবিশ্বাস্য, মহাকাব্যিক রেকর্ড গড়ে তাঁর দল!
যে দৈত্য একবার ডানা মেলেছে, তাকে থামায় সাধ্য কার?
মারাকানার সেই ঐতিহাসিক রাত (১০ই জুলাই, ২০২১), যে ব্রাজিলের মাঠে আর্জেন্টিনা যুগের পর যুগ ভুগেছে, সেই মারাকানা স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকার ফাইনালে আনহেল দি মারিয়ার জাদুকরি গোলে ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে স্কালোনি আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটান।
ফিনালিসিমা জয় (১ জুন, ২০২২), লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইউরোজয়ী শক্তিশালী ইতালিকে ৩-০ গোলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে স্কালোনি জানান দিলেন, তাঁর দল বিশ্বজয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
লুসাইল স্টেডিয়ামের জাদুকরি রাত (১৮ ডিসেম্বর, ২০২২), কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ২২ নভেম্বর ২০২২ তারিখে সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলের অবিশ্বাস্য ধাক্কা খেয়ে যখন পুরো বিশ্ব আর্জেন্টিনাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল, স্কালোনি তখন ভেঙে পড়েননি।
প্রদীপের দৈত্যের মতো তিনি মেক্সিকোকে (২-০), পোল্যান্ডকে (২-০), অস্ট্রেলিয়াকে (২-১), নেদারল্যান্ডসকে (টাইব্রেকারে জয়) এবং সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে (৩-০) হারিয়ে দলকে ফাইনালে তোলেন। অতঃপর ১৮ ডিসেম্বর ২০২২-এর সেই ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচে (৩-৩, টাইব্রেকারে ৪-২) এমবাপ্পেদের রুখে দিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে এনে দেন পরম আরাধ্য সেই বিশ্বজয়ের সোনালি ট্রফি!
সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে (১৪ জুলাই, ২০২৪), সাফল্যের ক্ষুধা যে ফুরিয়ে যায়নি, তা প্রমাণ করে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে অতিরিক্ত সময়ে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হয় স্কালোনির আর্জেন্টিনা, একমাত্র গোলটি করেন লাউতারো মার্টিনেজ।
দুঃখের নিশি অবসান হলো, ফুটিল আলোর ফুল,
ভুলিয়া গিয়াছি অতীতের যত ক্রন্দন আর ভুল।
যে হাত একদা শূন্য ছিল রে, কাঁদিয়াছে নিশিদিন,
সে হাতে আজিকে সোনার ট্রফি, আনন্দ সীমাহীন।
আজ আর্জেন্টিনার ঘরে ঘরে কেবলই উৎসবের আলো। যে মেসি একদা অভিমানে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ তাঁর মুখে বিশ্বজয়ের তৃপ্ত হাসির ঝিলিক। এই সবকিছুর পেছনে নেপথ্য নায়ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজনই—লিওনেল স্কালোনি।
টাকার অভাবে যাঁকে সহকারী থেকে প্রধান কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনিই আজ আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সেই আলাদিনের দৈত্য, যিনি আলতো ছোঁয়ায় সব দুঃখের দিনকে কর্পূরের মতো উড়িয়ে দিয়ে এনে দিয়েছেন এই চিরন্তন সোনালি প্রভাত।
২০২৬ বিশ্বকাপের চলমান মঞ্চেও সেই ‘লা স্কালোনেতা’ একই দৃঢ়তা, একই বিশ্বাস আর একই ক্ষুধা নিয়ে এগিয়ে চলছে। একের পর এক বাঁধা পেরিয়ে আবারও পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপের শেষ চারের মহারণে। কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের চোখে এখন আর শুধু স্বপ্ন নয়, জ্বলছে অটুট বিশ্বাস; যে মানুষটি একদিন ভাঙা দলকে বিশ্বসেরার আসনে বসিয়েছিলেন, তিনিই হয়তো আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন।
রূপকথার শেষ অধ্যায় এখনো লেখা হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজার আগপর্যন্ত আলাদিনের সেই দৈত্যের জাদু এখনো চলমান।
ধন্যবাদ স্কালোনি, আমাদের রূপকথার জাদুকর হওয়ার জন্য!
লেখক: কর্মকর্তা, ভূমি মন্ত্রণালয়