‘আলো হাতে চলিয়াছে’ বইটির মোড়ক উন্মোচন হচ্ছে যখন, তখন এই বইয়ের অন্যতম চরিত্র কবি রশিদুল ইসলাম নড়াইলে ধান কাটছেন। গৃহকর্তা তাঁকে ছুটি দেননি। কাজ ছেড়ে চলে আসতে চাইলে টাকাও দেননি। তাই তিনি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।
গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রশিদুল ইসলামকে নিয়ে প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘রিকশা চালানোর অবসরে পড়েন লিও তলস্তয়, গোর্কি, চে গুয়েভারার বই’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি প্রথম আলো তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেছে। রশিদুল কখনো রিকশা চালান, কখনো কারখানায় কাজ করেন, খেতখামারে মজুরি খাটেন, ফেরি করে সবজি বেচেন আবার কখনো হয়ে যান নির্মাণ শ্রমিক। তবে রিকশা চালানোই তাঁর মূল পেশা। বাকি কাজ করেন শ্রমিকের জীবনটা কেমন, সে উপলব্ধি পেতে।
পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখে চলেছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারলেও ‘আলো হাতে চলিয়াছে’ বইখানি তিনি হাতে পেয়েছেন। সেই বইখানি নড়াইলের কোনো মাঠে একটি ধানের আঁটির ওপরে রেখে তিনি ধান কাটছেন—এ রকম একটি ছবি তুলে বইয়ের লেখক মঈন শেখের কাছে পাঠিয়েছেন। এ রকম নিভৃতচারী ও ব্যতিক্রমী জীবনের অধিকারী আলোকিত নয়জন মানুষের জীবন-দর্শন নিয়ে ‘আলো হাতে চলিয়াছে’ বইটি লিখেছেন দুই বাংলায় পরিচিত ঔপন্যাসিক মঈন শেখ।
৮ মে সন্ধ্যায় রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারে বইটির মোড়ক উন্মোচন ও বই আড্ডা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রাজশাহী বন্ধুসভা। অনুষ্ঠানে রাজশাহী শহরের কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক ও বিদগ্ধ পাঠকেরা উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বন্ধুসভার সহসভাপতি তাহমিনা আক্তার। বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা আমিরুল ইসলাম, কবি মোস্তাক রহমান, অধ্যাপক তানভীর হক। যাঁদের নিয়ে বই, তাঁদের মধ্যে এসেছিলেন যশোরের ফরিদ গাজী, নাটোরের প্রয়াত কবি অলোকা ভৌমিকের পক্ষে হামিদা বেগম, রাজশাহীর তানোরের সোহরাব আলী, সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিক, হাসিনা বানু হাসি ও রণজিত কুমার পাল। তাঁরা তাঁদের অনুভূতির কথা তুলে ধরেন।
ফরিদ গাজী বলেন, ‘আমরা আসলে বৃন্তচ্যুত না হয় এই দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে।’
সোহরাব আলী হাসিনা বানু স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন।
সিলেবাসের বাইরের পড়ালেখার জগৎ বেশি বিস্তৃত, স্কুলজীবনে এমন অনুধাবন হয়েছিল সোহরাব আলীর। তাই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়ে বাইরের বই পড়া শুরু করেছিলেন। এখন তাঁর বয়স ৭২ বছর। তাঁর পড়াশোনার উপজীব্য হয়ে উঠেছে বিশ্বসাহিত্য, দর্শন ও ইতিহাস। তিনি সারা জীবন একটি শোষণহীন সমাজের চিন্তায় জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। আর কৃষক-শ্রমিকদের জন্য লিখে চলেছেন গণসংগীত। ইতিহাস-দর্শনের মোটা মোটা সব বই কিনে শুধু তিনি নিজেই পড়েন না, অন্য কৃষকদেরও পড়তে দেন। এমনকি যে কৃষক কোনো দিন স্কুলে যাননি, তাঁকেও তিনি পাঠক বানিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য কৃষকদের সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক গণসংগীত লিখেছেন কৃষক সোহরাব আলী। ‘কাস্তে হাতুড়ি আর গাঁইতি হাতে, দলবেঁধে ছুটি একই সাথে/ সিফটিং ভেঙে মোরা গড়ি ইমারত, আমাদের নালিশের নেই আদালত’—সোহরাব আলীর লেখা এমন অসংখ্য গণসংগীত নানা অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন স্থানীয় শিল্পীরা।
সোহরাবের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়েছেন সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিক। তিনি পড়া শিখেছেন মায়ের কাছে। চিন্তা করতে শিখেছেন প্রকৃতির কাছে। তিনি লিখতে শেখেননি, শুধু পড়তেই পারেন। তিনি যেমন পড়ুয়া, তেমনি আঁকিয়ে। তবে তাঁর কথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা যেকোনো শ্রোতা শুনবেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। এখন তাঁর পড়ার বিষয় হয়েছে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব এবং দর্শন। সত্যেন্দ্রনাথ গুরু মানেন সোহরাব আলীকে। তবে সোহরাব আলী বলেন, সত্যেন দর্শন পড়ে ব্যাখ্যা করতে পারেন। প্রায়ই তিনি তাঁর কাছে দর্শন নিয়ে আড্ডা দিতে যান।
হাসিনা বানু হাসির বাড়িও তানোর উপজেলার এক নিভৃত গ্রামে। স্বামী পরিত্যক্ত ও শ্রবণ-প্রতিবন্ধী জীবন বহনকারী এই রমণী সাথি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বইকে। সমাজ, স্বামী ও সময় তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করলেও বই প্রতারণা করেনি। ক্লাস নাইনে উঠেই বিয়ে হয় হাসিনার। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠপর্ব চুকে যায় সেখানেই। প্রায় ৩০ বছর ভঙ্গুর জীবন বয়ে বেড়ানোর পর পড়ার পাশাপাশি তিনি কলম তুলে নেন হাতে। অন্ধকারের আলোকে গায়ে-মনে মেখে লেখেন প্রথম কবিতা ‘অন্ধকার’ শিরোনামে। সেই শুরু। এখন তাঁর কবিতার সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে। লিখেছেন গান, গল্প ও নাটক। লিখেছেন অনেক সনেটও। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন তাঁর একটি বইয়ের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছেন।
রণজিৎ কুমার পাল একসময়ের তুখোড় যাত্রাভিনেতা। বিশ-ত্রিশটি নাটকের বই তাঁর জংধরা টিনের বাক্সে এখনো রক্ষিত আছে। তাঁর চিন্তা, কথা বলার ধরন আর বই পড়ার পরিধি অনেক। তাঁর বাক্স জংধরা ভেতরে অনেক মণিমাণিক্য।
নাটোরের অলোকা ভৌমিক কখনো স্কুলে যাননি। তাঁর পড়া বলতে শিশুশিক্ষা। বাবার কাছেই পড়েছেন বাড়িতে। যৌবন পাওয়ার আগেই বাবা-মা বিয়ে দেন। কিন্তু স্বামী-সুখ ভালো জুটেনি। মদ্যপ স্বামীর নির্যাতন নানাভাবে তাঁকে হজম করতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। স্বামীও একসময় মারা যান। নিঃসঙ্গ আর নিঃসন্তান জীবন বয়ে বেড়াতে বেড়াতে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েন জীবন-চাতালে। অবশেষে সুখ খোঁজেন বইয়ের ভাঁজে। জীবনকে আড়াল করেন পড়াশোনার মাধ্যমে। একসময় কলমও তুলে নেন। এক এক করে লেখেন কবিতা, গল্প ও জীবনী। বই প্রকাশিত হয় প্রায় ১৪টি। বইগুলো করেছেন বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের খোরাকি বাবদ দেওয়া টাকা থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে। এখনো পাণ্ডুলিপি আছে আটটির মতো। তাঁকে নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। লেখক মঈন শেখ বলেছেন, ‘৮০ বছরের এই বিদূষী নারীর সঙ্গে কথা বলে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি।’ পাঁচ মাস আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন।
নওগাঁর রশিদুল ইসলাম একজন রিকশাচালক। পেটের জন্য রিকশা চালান, আর অধিক রিকশা চালান জ্ঞানান্বেষণের জন্য। পরিচিত হতে চান বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার সঙ্গে। বাক্যে ক্রিয়াপদের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেন। যদিও তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন নেই। অথচ পড়ছেন বিশ্বসাহিত্যের নানা বই। পড়ছেন প্রাচীন থেকে বর্তমানের বাংলা ভাষার নানা ব্যাকরণ। তাঁর পাঠ, গবেষণা পদ্ধতি ও বিষয় মুগ্ধ করে।
নওগাঁর শিহাব আলী শিহাব ১৯৮৫ সালে এসএসসি পাস করলেও পরে আর কলেজে ভর্তি হননি। তিনি যেন বুঝে গিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট গণ্ডির পড়াতে তাঁর পোষাবে না। তাই তো তা ছেড়ে ভর্তি হলেন বিশ্বজোড়া স্বাধীন পাঠশালায়। শিহাবের কাছে দেশভাগের ওপর যতগুলো বই আছে, তা বোধ হয় অনেক গবেষকের কাছেও নেই। মজার ব্যাপার, তিনি কখনো কখনো শুধু বই কিনতেই কলকাতা চলে যান। দেশ-বিদেশের নানা পত্রপত্রিকাও আছে ঘরভর্তি। তাঁর বাড়ি যেন বইয়ের বাগান।
ফরিদ গাজীর বাড়ি যশোর শহরে। জন্ম পাকিস্তানের কোয়েটাতে। বিভিন্ন ধাপে ধাপে তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। আর পড়া হয়নি। তবে তাঁর জ্ঞান-সাধনা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে মার্ক্স, এঙ্গেলস, হেগেল এবং অর্থনীতি, সমাজনীতির নানা মাধ্যমে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে প্রচারবিমুখ এই মনীষীদের জীবন ১৬৬ পৃষ্ঠার বইয়ে লেখক উপস্থাপন করেছেন। বইটি প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য। গায়ের দাম ৩৬০ টাকা।