ব্রহ্মপুত্রের শান্ত তীরে সৃজনশীলতার নতুন বার্তা নিয়ে প্রকাশিত হলো জামালপুর বন্ধুসভার ভাঁজপত্র কিংশুক-এর তৃতীয় সংখ্যা। ৮ মে বিকেলে শহরের দেওয়ানপাড়ায় ভাষা ও স্বাধীনতাসংগ্রামী মতি মিয়া ফাউন্ডেশন পাঠাগার ভবনের ছাদচত্বরে এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
প্রকাশনা উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য ছিল, ‘অক্ষরের এই বন্ধন, নিয়ে যাক দূর বহুদূর’। বীরত্বগাথা ইতিহাস আর সমকালীন অনুভবের এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটেছে এবারের সংখ্যাটিতে। ‘বন্ধুর কলমে স্বাধীনতার কাব্য’ শিরোনামে প্রকাশিত এবারের কিংশুক সাজানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে।
সম্পাদকীয়তে জামালপুর বন্ধুসভার উপদেষ্টা নাজমুল হাসান লিখেছেন, ‘আমাদের এই প্রিয় জামালপুরের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে প্রতিরোধের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের দায়বদ্ধতা আর সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে এই আয়োজন।’
ভাঁজপত্রটিতে স্থান পেয়েছে মোট ১৭টি সাহিত্যকর্ম, যার মধ্যে ১০টি প্রবন্ধ ও গল্প এবং ৭টি কবিতা।
মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় লড়াইয়ের স্মৃতি নিয়ে সিফাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, ‘কামালপুর রণাঙ্গন ও আমাদের স্বাধীনতা’। সেখানে উঠে এসেছে জেড ফোর্সের বীরত্ব আর শহীদ ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দীন মমতাজের অসামান্য আত্মত্যাগের কথা। পাশাপাশি কামরুল ইসলাম খানের ‘সীমানা পেরিয়ে একাত্তর’ প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে বিশ্বজনমতের ভূমিকার কথা। বাকি বিল্লাহ্ লেখায় ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সংগ্রামের স্মৃতি। শুধু ইতিহাস নয়, ভাঁজপত্রটিতে ঠাঁই পেয়েছে মানবিক বোধ ও জীবনদর্শনের নানা রং—যেমনটি দেখা গেছে রোদ্দুর নিপার ‘ব্যস্ত দিনের কাহন’ বা তানভীর মাহাতাবের ‘অসমাপ্ত চিঠির শব্দরাশি’র মতো হৃদয়স্পর্শী লেখায়।
মোড়ক উন্মোচনের পর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা তাঁদের বক্তব্যে সৃজনশীল এই কাজের প্রশংসা করেন। কবি আলী জহির বলেন, ‘মানুষের সৃজনশীলতা যখন সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে, তখনই জন্ম নেয় নতুন কোনো শিল্প। তোমাদের কলম যেন কোনো অবস্থাতেই থেমে না যায়। শব্দের এই বন্ধনই আমাদের মুক্তির পথ দেখাবে।’
কবি শেখ ফজল প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘ভাষা ও সাহিত্যের এই চর্চা যেন নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকে। বন্ধুসভার সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের সৃজনশীলতাকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছে।’
উপদেষ্টা মোজাহিদুর রহমান বলেন, ‘একটি সংগঠনের প্রাণশক্তি হচ্ছে তার সৃজনশীল কাজ। আমি বিশ্বাস করি, এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াসই একদিন বড় কোনো পরিবর্তনের পথ দেখাবে।’
ভাষা ও স্বাধীনতাসংগ্রামী মতি মিয়া ফাউন্ডেশন পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক
এ কে এম আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের পাঠাগার প্রাঙ্গণে এমন একটি আয়োজন দেখে আনন্দিত। এই সৃজনশীল যাত্রায় আমাদের পাঠাগার সব সময় তোমাদের পাশে থাকবে।’
সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম খান তাঁর বক্তব্যে সংখ্যাটি প্রকাশের নেপথ্যের কারিগর, উপদেষ্টা সিফাত আবদুল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, তাঁর এবং ম্যাগাজিন সম্পাদক সিয়াম আহম্মেদের জন্য এটি ছিল একদম নতুন এক অভিজ্ঞতা। প্রথমবারের মতো এমন একটি দায়িত্বশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে এবং লেখা সংগ্রহ ও সমন্বয়ের প্রক্রিয়ায় অনেক নতুন বিষয় শিখতে পেরেছেন। যা তাঁদের জন্য এক অনন্য প্রাপ্তি।
উপদেষ্টা সিফাত আবদুল্লাহ্ অনুষ্ঠানে সশরীর উপস্থিত থাকতে না পারলেও তিনি অনলাইন ভিডিও কলের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কিংশুক আমাদের একটি মৌলিক কাজ। দীর্ঘ বিরতির পর তৃতীয় সংখ্যাটি প্রকাশিত হওয়া গর্বের বিষয়। এটি যেন নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে দেশপ্রেমের মশাল জ্বালিয়ে রাখে।’
উল্লেখ্য, ভাঁজপত্রের এই নান্দনিক নামটির রূপকার ছিলেন উপদেষ্টা হিশাম আল মহান্নাভ।
সহসাংগঠনিক সম্পাদক বাকি বিল্লাহ্ বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের চরে উদিত লাল সূর্য আমাদের ত্যাগের দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দেয়। এই ভাঁজপত্র সেই মশালকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।’
কিংশুকের এই সংখ্যার প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন সিফাত আবদুল্লাহ্ ও কামরুল ইসলাম খান। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন প্রথম আলোর জামালপুর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ।
অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা মোহাম্মদ মনোয়ার হুসেন ও হিশাম আল মহান্নাভ, সভাপতি অন্তরা চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল মিয়া, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক নুসরাত শৈলী, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক হৃদয়, বইমেলা সম্পাদক নাইমুল শাকিল, ম্যাগাজিন সম্পাদক সিয়াম আহম্মেদ, কার্যনির্বাহী সদস্য শামীম মিয়া, বন্ধু পলি নাছির, রওশন আরা বিপ্লবী, মাসুদ, আবিরা চৌধুরী, ইখতিয়ার হাসান খানসহ আরও অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মুক্তিকামী বীরদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে এই অঙ্গীকারে, ‘রক্তে লেখা সেই ইতিহাস বয়ে চলে সময়জুড়ে, শহীদের ত্যাগের প্রতিধ্বনি আজও বাজে হৃদয়তীরে।’
সহসাংগঠনিক সম্পাদক, জামালপুর বন্ধুসভা