যাঁদের ভালোবাসি, তাঁদের কেন বারবার পরীক্ষা করি
অফিসে বেশ চাপের মধ্যে দিন কাটছিল মিতার (ছদ্মনাম)। সেগুলো সামলাতে গিয়ে ঘরের কাজগুলোও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠছিল। কিন্তু তাঁর সঙ্গী রাকিব (ছদ্মনাম) নিজ থেকে ঘরের কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছিলেন না। মিতা তাঁকে সরাসরি কিছু বলেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, রাকিবেরই বিষয়টি বুঝে নেওয়া উচিত। কয়েক দিন পর অভিমান ও ক্ষোভ জমতে থাকলে মিতা রাকিবকে জানালেন, কিছুদিন নিজের মতো থাকতে চান।
মিতার এই আচরণের পেছনে ছিল একটি প্রশ্ন—প্রয়োজনে রাকিবের ওপর নির্ভর করা যাবে তো? মিতা সরাসরি প্রশ্নটি না করে সঙ্গীর আচরণ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সম্পর্কের মনস্তত্ত্বে এ ধরনের আচরণকে সঙ্গীকে পরীক্ষা করার প্রবণতা হিসেবে দেখা হয়।
কেন কাছের মানুষকে আমরা পরীক্ষা করি
সম্পর্কে একজন মানুষ অন্যজনকে নানা উপায়ে পরীক্ষা করতে পারেন। কখনো ইঙ্গিতে নিজের প্রয়োজন বোঝানোর চেষ্টা করেন, কখনো অভিমান করে কথা বলা বন্ধ রাখেন, আবার কখনো ছোটখাটো বিষয়ে বিরোধ তৈরি করে দেখতে চান, অন্যজন সম্পর্কটি ধরে রাখতে কতটা আগ্রহী।
এ ধরনের ব্যবহারের পেছনে সাধারণত দুটি প্রশ্ন কাজ করে—এই সম্পর্কে আমি কি নিরাপদ? আমার কি সঙ্গীর কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব আছে?
সম্পর্কে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাওয়া স্বাভাবিক। সঙ্গীর যত্ন, মনোযোগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে অনেকে সেই নিশ্চয়তা খুঁজে পান। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন নিজের প্রয়োজন সরাসরি না জানিয়ে অন্যজনের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ব্যবহার প্রত্যাশা করা হয়।
যেমন মিতা আশা করেছিলেন রাকিব নিজ থেকেই ঘরের কাজে সাহায্য করবেন। কিন্তু রাকিব করেননি। মিতা এটিকে তাঁর প্রতি উদাসীনতা হিসেবে ধরে নিতে পারেন। কিন্তু রাকিব হয়তো বুঝতেই পারেননি যে স্ত্রীর সাহায্য প্রয়োজন। আবার রাকিব এটাও ভেবে থাকতে পারেন, মিতা নিজের মতো কাজ সামলে নেবেন।
অর্থাৎ প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার অর্থ সব সময় ভালোবাসা বা যত্নের অভাব নয়। কখনো কখনো দুজনের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতিও এর কারণ হতে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা কীভাবে প্রভাব ফেলে
মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সম্পর্কের ধরন গড়ে ওঠার পেছনে অতীতের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শৈশবে পরিবারে নিজের প্রয়োজনের কথা বলেও কেউ যদি বারবার অবহেলিত হন, তাহলে বড় হয়ে সরাসরি সাহায্য চাইতে তাঁর অস্বস্তি হতে পারে। একইভাবে আগের কোনো সম্পর্কে নিজের চাওয়া প্রকাশ করে প্রত্যাখ্যাত হওয়া বা বিরোধের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাও নতুন সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা থেকে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, নিজের প্রয়োজন সরাসরি বলার চেয়ে ইঙ্গিতে বোঝানো ভালো। কেউ আবার অভিমান করে দূরে সরে যান, এই আশায় যে অপর পক্ষ নিজ থেকেই তাঁর কষ্ট বুঝতে পারবে।
মনোবিজ্ঞানে ব্যক্তিত্বের পাঁচটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি পরিচিত তত্ত্ব রয়েছে, যা ‘বিগ ফাইভ’ নামে পরিচিত। এর একটি বৈশিষ্ট্য হলো ‘অ্যাগ্রিয়াবিলিটি’। এর সঙ্গে সহযোগিতা, অন্যের প্রতি আন্তরিকতা ও বিশ্বাসের মতো বিষয় যুক্ত। অন্যের প্রতি বিশ্বাসের মাত্রা কম হলে সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ বা পরীক্ষা করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তবে এ ধরনের আচরণকে শুধু ব্যক্তিত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া অভ্যাস নতুন সম্পর্কেও থেকে যেতে পারে। অথচ বর্তমান সঙ্গী হয়তো আগের মানুষটির মতো নন। তিনি সরাসরি অনুরোধ পেলে আন্তরিকভাবে সাহায্য করতেও পারেন। কিন্তু অনুরোধটি স্পষ্ট না হলে তাঁর পক্ষে সঠিকভাবে সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পরীক্ষা নিতে গিয়ে কেন দূরত্ব বাড়ে
সম্পর্কে একজন মানুষ যখন অভিমান করে নিজেকে গুটিয়ে নেন, তখন অন্যজনও পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে দূরে সরে যেতে পারেন। এতে যে আশ্বাস পাওয়ার জন্য এমন আচরণ করা হয়েছিল, তা আর পাওয়া হয় না।
উদাহরণ হিসেবে, মিতা যদি রাকিবের সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দেন, তাহলে তাঁর প্রত্যাশা হতে পারে, রাকিব নিজ থেকেই কাছে এসে কারণ জানতে চাইবেন। কিন্তু রাকিব যদি মনে করেন, মিতার কিছুটা একা সময় প্রয়োজন, তাহলে রাকিবও তাঁকে বিরক্ত না করে দূরে থাকতে পারেন। তখন মিতার মনে হতে পারে, রাকিব তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অন্যদিকে রাকিবও বুঝতে পারবেন না, কীভাবে পরিস্থিতি সামলানো উচিত।
এভাবে ভুল–বোঝাবুঝি ও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। একজনের মনে সন্দেহ তৈরি হলে তিনি আরও বেশি করে সঙ্গীর আচরণ যাচাই করতে পারেন। সেই আচরণ আবার অপর পক্ষকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। ধীরে ধীরে সম্পর্কে তৈরি হয় মানসিক দূরত্ব।
আশ্বাস পাওয়ার জন্য সরাসরি কথা না বলে ইঙ্গিত দেওয়া বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মতো ব্যবহার দীর্ঘ মেয়াদে সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। কারণ, এভাবে পাওয়া প্রতিক্রিয়া থেকে সঙ্গীর প্রকৃত অনুভূতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
কী করা যেতে পারে
এ ধরনের অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য সব অনুভূতি একবারে প্রকাশ করতে হবে, এমন নয়। ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে শুরু করা যায়।
প্রথমে খেয়াল করা প্রয়োজন, কোন বিষয়গুলো সরাসরি না বলে ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। এরপর সেগুলো স্পষ্টভাবে জানানো যেতে পারে।
যেমন, ‘তুমি নিজে থেকে কিছু বোঝো না কেন?’ বলার পরিবর্তে মিতা বলতে পারেন, ‘অফিসের কাজের চাপে আমি খুব ক্লান্ত। আজ তুমি কি ঘরের কাজগুলোয় আমাকে একটু সাহায্য করবে?’
দুটি কথার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রথম কথাটিতে অভিযোগ আছে, কিন্তু কী প্রয়োজন, তা স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয় কথাটিতে নিজের পরিস্থিতি জানিয়ে নির্দিষ্টভাবে সাহায্য চাওয়া হয়েছে।
সরাসরি অনুরোধ করার পর সঙ্গীর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করাও জরুরি। তিনি সাহায্য করতে আগ্রহী কি না, প্রয়োজনটি বুঝতে পারছেন কি না কিংবা দুজনের মধ্যে অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে কি না—এসব বিষয় তখন পরিষ্কার হতে পারে।
ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষ বুঝতে পারেন, নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করলেই প্রত্যাখ্যাত হতে হবে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে কাছের মানুষকে স্পষ্ট করে জানালে তাঁর পক্ষে সহযোগিতা করা সহজ হয়।
তবে সরাসরি কথা বললেই সব সমস্যার সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সঙ্গী বারবার প্রয়োজন উপেক্ষা করলে বা সম্পর্কের মধ্যে অসম্মান ও অবহেলা থাকলে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। সুস্থ সম্পর্কের জন্য নিজের অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি অপর পক্ষের কথা শোনা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখাও জরুরি।
সম্পর্কে ভালোবাসা ও নির্ভরযোগ্যতা বোঝার জন্য সব সময় সঙ্গীকে পরীক্ষায় ফেলার প্রয়োজন নেই। অনেক সময় নিজের প্রয়োজন স্পষ্টভাবে জানানো, অপর পক্ষের কথা মন দিয়ে শোনা এবং আচরণের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করাই সম্পর্ককে বোঝার কার্যকর উপায় হতে পারে।