ওভারথিঙ্কিং কীভাবে আমাদের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, অনিশ্চয়তা আর প্রতিযোগিতার ভিড়ে একটি প্রবণতা নিঃশব্দে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। সেটি হলো অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা বা ওভারথিঙ্কিং। সামান্য ঘটনা থেকে শুরু করে জীবনের বড় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বিষয়ে অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চিন্তা করতে থাকেন। এই অদৃশ্য মানসিক অভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষের শান্তি কেড়ে নেয়। কিন্তু কেন মানুষ এমন করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের মনস্তত্ত্বের গভীরে যেতে হয়।
মানুষের মস্তিষ্ক স্বভাবতই বিশ্লেষণধর্মী। কোনো কিছু ঘটলেই আমরা তার কারণ, সম্ভাবনা ও পরিণতি নিয়ে ভাবতে শুরু করি। এই প্রবণতা আমাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে। কারণ, এটি বিপদ এড়াতে ও সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক। কিন্তু যখন এই চিন্তা সীমা অতিক্রম করে, তখন তা আর সহায়ক থাকে না, বরং মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনিশ্চয়তা এখানে বড় ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত না হতে পারলে মানুষ নিজের মনে অসংখ্য সম্ভাবনা তৈরি করে, যার বেশির ভাগই আশঙ্কা আর নেতিবাচকতার রঙে রঞ্জিত।
আত্মবিশ্বাসের অভাবও অতিরিক্ত চিন্তা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্ত বা যোগ্যতার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন না, তাঁরা একই বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করেন। একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, ঠিক হলো কি না? আরও ভালো কিছু করা যেত কি না? এই দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা একসময় মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। এ ছাড়া অতীতের অভিজ্ঞতা মানুষের ভাবনার ধরনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আগের কোনো ভুল বা ব্যর্থতা অনেক সময় ভবিষ্যতের প্রতিটি পদক্ষেপে ছায়া ফেলে। ফলে মানুষ অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে পড়ে এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বারবার চিন্তা করতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক চাপ। অন্যরা কী ভাববে, কে কী বলবে—এই চিন্তাগুলো মানুষকে সহজ সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ–বিশেষজ্ঞ মো. কবির হাসান পারভেজের মতে, ‘অতিরিক্ত চিন্তা দীর্ঘ মেয়াদে উদ্বেগ, অনিদ্রা ও মানসিক অবসাদের কারণ হতে পারে। একজন মানুষ যখন একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে থাকে, তখন তা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক স্থিতি নষ্ট করে দেয়। ধীরে ধীরে কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায়, ঘুম ব্যাহত হয় এবং দৈনন্দিন জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ ধরনের সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সেটিকে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।’
ডিজিটাল যুগ এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাজানো জীবন দেখে অনেকেই নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করেন। এই তুলনা থেকে জন্ম নেয় অপূর্ণতার অনুভূতি, যা ধীরে ধীরে মানুষকে আরও গভীর চিন্তার ভেতরে টেনে নেয়। একটি ছোট ঘটনা বা কথাও তখন অপ্রয়োজনীয় বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
তবে অতিরিক্ত ভাবনা সব সময় নেতিবাচক নয়। কখনো কখনো এটি মানুষকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়, যা সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন এই চিন্তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা উদ্বেগ, অস্থিরতা ও মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। তাই এর সীমা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।
সাইকোলজিস্ট শারমিন আক্তার মনে করেন, ‘অতিরিক্ত চিন্তার পেছনে অনেক সময় মানুষের না বলা ভয় ও অপ্রকাশিত আবেগ কাজ করে। মানুষ যখন নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারে না, তখন ভেতরে ভেতরে একধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। সেই চাপ থেকেই জন্ম নেয় অযথা দুশ্চিন্তা ও নেতিবাচক ভাবনা। সহানুভূতিশীল পরিবেশ, নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং কাছের মানুষের সমর্থন একজন মানুষকে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে।’
অতিরিক্ত চিন্তা আসলে মানুষের নিজের তৈরি এক অদৃশ্য ফাঁদ। এ ফাঁদে আটকে থেকে নিজেই নিজের শান্তি নষ্ট করে। মুক্তির পথও তাই নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। চিন্তাকে শত্রু নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত এক সহচর হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই জীবন হয়ে উঠতে পারে আরও স্বস্তির ও আনন্দময়।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা