মানুষ কেন বিশ্বাস করতে চায়
জীবনে এমন কিছু প্রশ্ন আছে, যার সামনে এসে যুক্তি একসময় থেমে যায়। আমি কোথা থেকে এলাম? মৃত্যুর পর কী আছে? কেন ভালো মানুষের জীবনে খারাপ ঘটনা ঘটে? এই বিশাল মহাবিশ্বের কি কোনো উদ্দেশ্য আছে?
হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে। কেউ পেয়েছে ঈশ্বরে, কেউ ধর্মে, কেউ দর্শনে, কেউ বিজ্ঞানে, আবার কেউ কোনো উত্তরেই বিশ্বাস করেনি। তবু একটি বিষয় আশ্চর্যজনকভাবে একই রয়ে গেছে; তা হলো—মানুষ বিশ্বাস করতে চায়। মনে প্রশ্ন জাগার কথা, মানুষ কেন বিশ্বাস করতে চায়?
মানুষ কি সত্যিই কোনো অদৃশ্য সত্যকে অনুভব করে? নাকি ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অর্থের প্রয়োজন থেকেই বিশ্বাসের জন্ম? উত্তরটি এর চেয়েও জটিল। মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো মানুষ সবকিছু জানে না। আমরা জানি না আগামীকাল কী হবে। জানি না কখন অসুস্থ হব। জানি না কখন প্রিয় মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। এমনকি নিজের জীবনের শেষ মুহূর্তটিও আমরা জানি না। আবার মানুষ এই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। মানুষ উত্তর খোঁজে।
হাজার বছর আগে কোনো মানুষ যখন আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখেছিল, হয়তো সে ভেবেছিল কোনো দেবতা ক্রুদ্ধ হয়েছেন। আজ আমরা জানি বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক কারণ। তবে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ব্যাখ্যার প্রয়োজনটি বদলায়নি। তখন মানুষ দেবতার কাছে উত্তর খুঁজেছে। আজ মানুষ বিজ্ঞান, দর্শন কিংবা অন্য কোনো বিশ্বাসের কাঠামোর মধ্যে উত্তর খোঁজে। অর্থাৎ সময় বদলেছে, জ্ঞান বদলেছে, কিন্তু অজানাকে বোঝার মানুষের আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি।
ধর্মের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সবচেয়ে পুরোনো ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো ভয়। মানুষের ভয়বোধ আদিমকাল থেকে। প্রাচীনকালে মানুষ যখন প্রকৃতির বিশাল শক্তির সামনে নিজেকে অসহায় দেখেছে, তখন মানুষ সেই শক্তিকে অলৌকিক রূপ দিয়েছে। সূর্য, চন্দ্র, তারকা, মেঘ, বৃষ্টি, বজ্রপাত, নদী, পাহাড় প্রভৃতি সবকিছুর মধ্যেই সে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির উপস্থিতি কল্পনা করেছে। কিন্তু ধর্মকে শুধু ভয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা কি যথেষ্ট? এর উত্তর হলো, না। কারণ, মানুষ শুধু ভয় পেলে বিশ্বাস করে না। মানুষ আশা থেকেও বিশ্বাস করে। যখন একজন মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভাবে, এর পরেও হয়তো কিছু আছে তখন সেটি শুধু ভয় নয়, সেটি অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষাও। যখন একজন শোকাহত মানুষ বিশ্বাস করে তার প্রিয় মানুষটি কোনো অন্য জগতে শান্তিতে আছে, তখন সেই বিশ্বাস হয়তো তার কাছে বাস্তবতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, মানুষ শুধু বাঁচতে চায় না। সে তার বেঁচে থাকার একটি অর্থও চায়।
আমরা জানি আমাদের জীবন সীমিত। কিন্তু আমাদের মন ও মস্তিষ্ক অসীমতার কথা ভাবতে পারে এবং প্রতিনিয়ত ভাবছে। এই চিন্তা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব থেকেই অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। স্বর্গ, নরক, পুনর্জন্ম, মোক্ষ, নির্বাণ প্রভৃতি বিভিন্ন সভ্যতা মৃত্যুর পরের অস্তিত্বকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কেউ বিশ্বাস করেছে আত্মা অন্য কোথাও যায়। কেউ বিশ্বাস করেছে মানুষ আবার জন্ম নেয়। কেউ বিশ্বাস করেছে মুক্তিই হলো চূড়ান্ত লক্ষ্য। আবার কেউ বিশ্বাস করেছে মৃত্যুর পর কিছুই নেই। বিশ্বাসগুলো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
আমরা প্রায়ই বিশ্বাস শব্দটিকে শুধু ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু একজন ধর্মবিশ্বাসী এবং একজন নাস্তিক— দুজনই বিশ্বাসের কাঠামোর মধ্যে জীবন যাপন করতে পারেন। একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারেন, অন্যজন মানবিক যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে বিশ্বাস করতে পারেন। কেউ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, অপরজন সাম্যবাদে, অন্যজন হয়তো মানবাধিকারে। এসব বিশ্বাস আমাদের সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা ও পৃথিবীকে দেখার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে।
আমরা কি সত্যিই নিজের বিশ্বাস নিজেরা বেছে নিই? এ প্রশ্নটি আরেকটু কঠিন মনে হচ্ছে ভাবতে।
একটি শিশু পৃথিবীতে জন্মানোর সময় কোনো ধর্মের অনুসারী হয়ে জন্মায় না। সে জানে না কোন ঈশ্বর সত্য, কোন ধর্ম সঠিক, কোন দর্শন ভুল। তারপর সে একটি পরিবারে বড় হয়। একটি সমাজে বড় হয়, একটি সংস্কৃতির ভাষা শেখে, রাষ্ট্রকাঠামো দেখে, পরিবার তাকে কিছু গল্প বলে।
সমাজ তাকে মূল্যবোধ, নৈতিকতার পাঠ শেখায়। ধীরে ধীরে সে পৃথিবীকে বুঝতে শুরু করে। একটা ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুর কাছে যেমন ধর্ম খুব গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আবার কোনো ধর্মহীন পরিবারে বড় হওয়া শিশুর কাছে ধর্মের প্রয়োজনীয়তাই তেমন স্বাভাবিক মনে হবে না।
আমাদের বিশ্বাসের কতটা সত্যিই আমাদের নিজের, আর কতটা আমরা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছি? এই প্রশ্নের উত্তরটা প্রশ্নের মতোই জটিল।
মন এমন তথ্যকে সহজে গ্রহণ করে, যা আমাদের পূর্ববর্তী ধারণাকে সমর্থন করে। আর যে তথ্য আমাদের বিশ্বাসের বিপরীতে কাজ করে, সেই তথ্য নিয়ে মনে সন্দেহের প্রবণতা তৈরি হয়। এ কারণেই একই ঘটনা দেখে দুজন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। একজন যেখানে ষড়যন্ত্র দেখতে পারে, অন্যজন সেখানে কাকতালীয় ঘটনা দেখতে পারে। ঘটনা একই। কিন্তু ঘটনাকে দেখার চোখ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
বিশ্বাসের সমালোচনা করা সহজ। আমরা খুব সহজেই মানুষের হাজার বছর ধরে পুষে রাখা বিশ্বাসের লাগামহীন সমালোচনা করতে পারি। কিন্তু বিশ্বাস মানুষের জীবনে যে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে, তা–ও অস্বীকার করা যায় না। বিশ্বাস মানুষকে আশা দিয়েছে। দুঃখের সময়ে সান্ত্বনা দিয়েছে। মানুষকে একত্র করেছে। সমাজে দান, সহমর্মিতা, আত্মসংযম কিংবা নৈতিকতার মতো মূল্যবোধকে অনেক শক্তিশালী করেছে।
একজন অসহায় মানুষ যখন বলে ‘সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি’, তখন সেই বাক্যটির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হয়তো নেই। কিন্তু তার জীবনে সেটিই হয়তো আগামীকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার কারণ। বিশ্বাসের এই মানবিক শক্তিকে উপেক্ষা করা যায় না; এমনকি কোনো সভ্যতাও সেটা করে না। ভালোর সঙ্গে বিশ্বাসের একটা অন্ধকার দিকও আছে। বিশ্বাস যখন প্রশ্নকে ভয় পেতে শুরু করে, তখন সেটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রশ্নহীন বিশ্বাস ধীরে ধীরে অন্ধবিশ্বাসে পরিণত হয়। আর অন্ধবিশ্বাস যখন ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়, মানুষ নিজের বিশ্বাসকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে।
আমরা যেকোনো কিছু বিশ্বাস করতে পারি। কিন্তু আমাদের বিশ্বাসের বাইরে থাকা মানুষটিরও নিজের বিশ্বাস থাকতে পারে। এখানেই সহনশীলতা, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার প্রয়োজন। বিশ্বাসের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, মানুষের অজানা অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। একসময় বজ্রপাত ছিল দেবতার ক্রোধ। আজ আমরা জানি এটি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা।
একসময় রোগকে অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হতো। আজ আমরা জীবাণু, ভাইরাস, জেনেটিকস ও রোগের জৈবিক কারণ সম্পর্কে জানি। তাহলে কি একদিন বিজ্ঞান সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে? না। বিজ্ঞান দেবে না। কারণ, বিজ্ঞান জিজ্ঞাসা করে, ‘কীভাবে?’ কিন্তু মানবজাতি জানতে চায়, ‘কেন?’
মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হলো, এটি একধরনের প্রশ্ন। কিন্তু এই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের কোনো অর্থ আছে কি না, এটি অন্য ধরনের প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান কোনোকালে খুঁজে পেতে পারে। দ্বিতীয়টি দর্শন, ধর্ম ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জগতে প্রবেশ করে।
বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা হলো নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে পারা। আর নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা মানে অনেক সময় নিজের পরিচয়ের একটি অংশকে প্রশ্ন করা।
এত কিছুর মধ্যেও মূল প্রশ্ন এখানেই, মানুষ কেন বিশ্বাস করতে চায় এবং এর প্রবণতা বেশি কেন? এর কারণ মানুষ অসম্পূর্ণ জ্ঞানের মধ্যে বসবাস করে।
আমরা সবকিছু জানি না। আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পারি না। আমরা মৃত্যুকে এড়িয়ে যেতে পারি না। আর এই অজানা পৃথিবীর মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষ একটি অর্থ খুঁজতে চায়। কেউ সেই অর্থ খুঁজে পায় ঈশ্বরে, বিজ্ঞানে, দর্শনে, শিল্পে আবার কেউ কেউ মানবতা কিংবা গানে। আবার কেউ কোনো অর্থই খুঁজে পায় না, এবং সেই অনিশ্চয়তাকেই মেনে নেয়।
মানুষ বিশ্বাস করতে চায়। কারণ, শুধু বেঁচে থাকা তার জন্য যথেষ্ট নয়। সে জানতে চায় তার বেঁচে থাকার অর্থ কী। কিন্তু বিশ্বাসের সবচেয়ে সুন্দর রূপ হয়তো সেই বিশ্বাস, যে বিশ্বাস প্রশ্নকে ভয় পায় না। প্রশ্ন করা বিশ্বাসের শত্রু নয়। প্রশ্নই আমাদের বিশ্বাসকে গভীর করে। আর কখনো কখনো প্রশ্নের শেষে কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। শুধু আরও একটি নতুন প্রশ্নের জন্ম নেয়। সেটিই মানুষের সবচেয়ে সুন্দর বৈশিষ্ট্য। আমরা জানি না, তবু জানতে চাই। আমরা মরণশীল, তবু অসীমের কথা ভাবি। আর সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়েই মানুষ হাজার বছর ধরে প্রশ্ন করে আসছে, ‘আমি কে?’ ‘আমি কোথা থেকে এলাম?’ ‘আর এই বিশাল, অজানা মহাবিশ্বে আমার অস্তিত্বের অর্থই–বা কী?’
মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রাটি কোনো ভূখণ্ড জয় করার নয়; বরং নিজের অজানাকে বোঝার যাত্রা...
সহসভাপতি, সিলেট বন্ধুসভা