স্মৃতি কি আশীর্বাদ, নাকি বোঝা
বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ একবার আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘মানুষের জীবন সে জীবন নয় যা সে বেঁচেছিল, বরং জীবন হলো সেটাই যা সে মনে রেখেছে এবং যেভাবে সে তা মনে রেখেছে।’
কথাটি শোনার পর যদি একটু চোখ বুজে ভাবেন, তাহলে দেখবেন, আমাদের বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ওলটপালট করা হাওয়া বয়ে গেছে। এ অনুভূতির গভীরে একটু তাকালেই আমরা বুঝতে পারি যে স্মৃতি শুধু অতীতের কোনো নিষ্ক্রিয় সংরক্ষণাগার নয়, বরং তা আমাদের অস্তিত্বের এক জীবন্ত নির্মাণপ্রক্রিয়া। আমরা যখন কোনো পুরোনো অ্যালবামের পাতা ওলটাই, কিংবা কোনো চেনা সুবাসে থমকে দাঁড়াই, তখন আসলে আমরা আমাদের অস্তিত্বেরই পুনর্নির্মাণ করি। প্রশ্ন জাগে, স্মৃতির এই যে বিপুল ভার, যা আমাদের প্রতিনিয়ত বিদীর্ণ করে, তা ছাড়া কি মানুষ আসলেই ‘মানুষ’ হিসেবে টিকে থাকতে পারত?
প্রগতিবাদী বা যান্ত্রিক বুর্জোয়া চিন্তায় মনে হতে পারে, এই ভারী পাথরকে মন থেকে নামিয়ে দিলে বুঝি এক চরম মুক্তি মিলত। কিন্তু দর্শন আমাদের বলে, সেই মুক্তির শেষ পরিণতি হতো এক আদিম ও চরম শূন্যতা। নদীকে যেমন তার গতিপথ চেনার জন্য দুই পাড়ের বাঁধনে বাঁধা পড়তে হয়, মানুষের চেতনা ও মনের মানচিত্রকেও তেমনি স্মৃতিরূপী তটের ওপর ভর করে এগোতে হয়। অতীত যদি উবে যায়, তাহলে বর্তমান হয়ে ওঠে এক চিরন্তন, অর্থহীন ও পঙ্গু মুহূর্ত।
দিন শেষে যদি হিসাব মেলাতে বসি, দেখতে পাব, স্মৃতির এই বোঝা আসলে কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটিই হলো স্রষ্টার দেওয়া সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। এই বোঝা আছে বলেই আমরা কাঁদতে পারি, এই বোঝা আছে বলেই আমরা হাসতে পারি।
এই শূন্যতার বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই কিছু মানুষের জীবনে। যদি কখনো কোনো স্মৃতি লোপ পাওয়া বা আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত মানুষকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন, তবে একটা জিনিস খেয়াল করে থাকবেন। মানুষটি দিব্যি খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন, বেঁচে আছেন। তাঁর হৃৎস্পন্দন চলছে, অথচ তাঁর চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন ভেতরে কেউ কোথাও নেই। তিনি এক অনন্ত শূন্যতায় তাকিয়ে আছেন। কেন এমন মনে হয়, বলুন তো? কারণ, তাঁর ভেতরের ‘মানুষটি’ আর নেই।
এখানেই এসে মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীর মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিটশে মেষশাবকের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তারা অতীতকে মনে রাখতে পারে না বলেই এত সুখে ঘাস ছিঁড়ে খায়।’ আপনি যদি কোনো পশুপাখির দিকে তাকান, দেখবেন তারা কিন্তু দিব্যি আছে। গতকাল তাদের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা চিরকাল একটা ‘বর্তমান’ সময়ের মধ্যে বেঁচে থাকে।
কিন্তু মানুষ তো পশু নয়। মানুষের নিয়তিই হলো, তাকে স্মৃতির কাঠগড়ায় প্রতিনিয়ত দাঁড়াতে হবে এবং অতীতকে সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে হবে। তবু, মানুষের ভেতর একধরনের দ্বন্দ্ব কাজ করে। স্মৃতি কি আশীর্বাদ, না বোঝা?
অনেকে মনে করেন, স্মৃতি কেবলই বোঝা, যা আমাদের কেবল পেছনের দিকে টেনে ধরে। আবার অনেকে ভাবেন, পুরোনো কষ্টের স্মৃতিগুলো ভুলে গেলেই বুঝি আমরা ভালো থাকব। কিন্তু আপনি যদি সাহিত্যের ধ্রুপদি পাতাগুলোয় চোখ রাখেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে মানুষের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলো; তার সব শিল্প, কাব্য ও দর্শন আসলে এই স্মৃতির ক্ষত থেকেই নিঃসৃত হয়েছে। এই দুঃখের বোঝাই আসলে আমাদের প্রকৃত ‘মানুষ’ বানিয়ে রেখেছে।
কারণ, অভিজ্ঞতাই অনুভূতির গভীরতা তৈরি করে। যে মানুষ কখনো হারায়নি, সে পাওয়ার আনন্দ বোঝে না; আর যে মানুষ কখনো কাঁদেনি, সে অন্যের কান্নার ভাষা পড়তে পারে না। যে মানুষ জীবনে সবচেয়ে বেশি ঠকেছে বা কষ্ট পেয়েছে, তার ভেতরই অন্যকে ভালোবাসার, অন্যকে বোঝার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে।
এই অনুভবেরই আরেকটি সূক্ষ্ম প্রকাশ হলো মানবিকতা। এই যে অপরের ব্যথায় নিজের হৃদয় কেঁদে ওঠা, যাকে আমরা ‘মানবিকতা’ বলি; এটা আসলে আমাদের নিজেদের ভেতর জমে থাকা স্মৃতিরই একটা প্রতিধ্বনি, নিজের আয়নায় অন্যের প্রতিচ্ছবি দেখা।
এ কারণেই স্মৃতি কেবল অনুভূতির উৎস নয়, বরং আমাদের বোধ ও আচরণের দিশারিও। যদি স্মৃতি না থাকত, তাহলে আমরা প্রতিদিন একই ভুল বারবার করতাম, কোনো দিন ক্ষমার মহত্ব বুঝতাম না, কোনো দিন কাউকে ভালোবেসে আগলে রাখার ব্যাকুলতা অনুভব করতাম না।
একটি গাছ যখন বড় হয়, তার শিকড়টা মাটির অনেক গভীরে চলে যায়। স্মৃতি হলো সেই শিকড়ের মতো। যতই ঝড়ঝাপটা আসুক, ওই শিকড়ই আমাদের মাটির সঙ্গে শক্ত করে ধরে রাখে।
স্মৃতির এই বোঝা যদি আলগা করে দিতাম বা ছুঁড়ে ফেলে দিতাম, তাহলে আমরা হয়তো পাখির মতো হালকা হয়ে আকাশে উড়ে যেতে পারতাম। কিন্তু সেই হালকা অস্তিত্বের কোনো সার্থকতা থাকত না।
দিন শেষে যদি হিসাব মেলাতে বসি, দেখতে পাব, স্মৃতির এই বোঝা আসলে কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটিই হলো স্রষ্টার দেওয়া সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। এই বোঝা আছে বলেই আমরা কাঁদতে পারি, এই বোঝা আছে বলেই আমরা হাসতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা, এই বোঝা আছে বলেই আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারি, ‘আমি তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি।’
কাজেই কোনো মানুষকে যদি কখনো তার স্মৃতির ভারে ক্লান্ত ও নুয়ে পড়তে দেখেন, তাহলে বুর্জোয়া সান্ত্বনা না দিয়ে তাকে জোরগলায় বলুন, এই ভারটুকুই প্রমাণ করে যে আপনি কোনো অ্যালগরিদম–চালিত রোবট নন, আপনি একজন জীবন্ত, ঐতিহাসিক ও লড়াকু মানুষ।
শিক্ষার্থী, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ