পার্টনার থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন অন্যের প্রতি আসক্ত হয়

চিটিং সাধারণত পার্টনারের সৌন্দর্য বা গুণের অভাবের কারণে হয় নাছবি: ফ্রিপিক
শেষ প্রশ্নটা তাই থেকে যায়—
সমস্যা কি সম্পর্কের সৌন্দর্যে,
নাকি মানুষের ভেতরের অসম্পূর্ণতায়?

কয়েক দিন ধরে আমার ক্লায়েন্ট, বন্ধু মহল এবং আশপাশের অনেক মানুষ একটি প্রশ্ন বারবার করছে—সুন্দর, স্মার্ট ও আকর্ষণীয় পার্টনার থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন অন্যের প্রতি আসক্ত হয়? কেন নিজের সঙ্গীর সঙ্গে থেকেও কেউ চিট করে?

এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র সৌন্দর্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সম্পর্কের ভাঙন বা বিশ্বাসঘাতকতার কারণ সাধারণত পার্টনারের ঘাটতি নয়, বরং সেই ব্যক্তির ভেতরের মানসিক অস্থিরতা, অপূর্ণ চাহিদা ও ব্যক্তিত্বের কিছু প্যাটার্নের সঙ্গে যুক্ত।

অনেক সময় মানুষ নতুনত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়, বাইরে থেকে পাওয়া প্রশংসা বা ভ্যালিডেশনে আবেগীয় তৃপ্তি খোঁজে। কেউ যদি নিজের ভেতরে আত্মমূল্যবোধের ঘাটতি অনুভব করে, সে বারবার বাইরে থেকে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। এই প্রমাণের খোঁজ কখনো কখনো গোপন সম্পর্ক বা আসক্তিতে রূপ নেয়।

হ্যাঁ, আমরা প্রায়ই শুনি—‘এত সুন্দর পার্টনার থাকা সত্ত্বেও সে কেন চিট করল? সে তো তার প্রতি সৎ ছিল। কেয়ার করত। দায়িত্ব পালন করত। তাকে দেখে বোঝা যেত না সে যে তার পছন্দ নয়!’

এই প্রশ্নের ভেতরে একটা লুকানো ধারণা থাকে; যদি মানুষটির পাশে আকর্ষণীয়, ভালো, যত্নশীল একজন সঙ্গী থাকে, তাহলে সম্পর্ক ভাঙার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।

চিটিং সাধারণত পার্টনারের সৌন্দর্য বা গুণের অভাবের কারণে হয় না। বেশির ভাগ সময় এটি সেই ব্যক্তির ভেতরের অপূর্ণতা, অস্থিরতা বা পুরোনো মানসিক আঘাতের ফল।
আমরা একটু ধীরে ধীরে তার মানসিক ব্যাখ্যায় যাই—

আরও পড়ুন

১. ভেতরের অস্থিরতা:
কিছু মানুষ গভীরভাবে কাছে আসতে ভয় পায়। বাইরে থেকে তারা সম্পর্ক চায়, বিয়ে করে, সংসার করে। কিন্তু যখন সম্পর্ক খুব কাছের, খুব আন্তরিক হয়ে যায়, তখন তাদের ভেতরে একধরনের অস্বস্তি কাজ করে। তারা মনে মনে ভাবতে পারে,
‘আমি যদি পুরোপুরি নিজেকে খুলে দিই, তবে আমি দুর্বল হয়ে যাব।’
এই ভয় থেকে তারা দূরে সরে যাওয়ার রাস্তা খোঁজে। অনেক সময় সেই রাস্তা হয় গোপন সম্পর্ক।

২. নতুনের প্রতি টান:
কিছু মানুষ নতুনত্বের উত্তেজনায় খুব সহজে আকৃষ্ট হয়। নতুন কারও চোখে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়া, প্রশংসা পাওয়া। এসব তাদের সাময়িক শক্তি দেয়।
এখানে বিষয়টি পার্টনার কত সুন্দর তা নয়। বিষয়টি হলো, ‘আমি এখনো কারও কাছে আকর্ষণীয়’ এই অনুভূতি পাওয়া।
যার ভেতরে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি আছে, সে বাইরে থেকে বারবার এই প্রমাণ খুঁজতে পারে।

৩. অমীমাংসিত পুরোনো কষ্ট:
শৈশবের অবহেলা, প্রত্যাখ্যান, বা ভালোবাসার অনিশ্চয়তা অনেক সময় বড় হয়ে সম্পর্কের ভেতরে প্রভাব ফেলে। কেউ যদি ছোটবেলা থেকে নিরাপদ ভালোবাসা না পায়, তাহলে বড় হয়ে স্থির ও গভীর সম্পর্ক তার কাছে অচেনা বা ভারী মনে হতে পারে।
সে হয়তো অজান্তেই এমন আচরণ করবে, যা সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। কারণ, তার ভেতরের অভ্যাসটাই অনিরাপদ।

৪. দ্বৈত জীবন:
অনেকেই বাইরে থেকে দায়িত্বশীল, ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ভেতরে তারা অন্য রকম টানাপোড়েনে ভোগে। একদিকে পরিবার, সামাজিক পরিচয়; অন্যদিকে নিজের লুকানো ইচ্ছা ও অস্থিরতা।
এই দ্বৈত অবস্থায় মানুষ কখনো এমন কাজ করে, যা তার নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে না। পরে অপরাধবোধ হয়, কিন্তু আবার একই চক্রে ঢুকে যায়।

৫. ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি:
কিছু মানুষের জন্য গোপন সম্পর্ক একধরনের ক্ষমতার অনুভূতি দেয়। ‘আমি চাইলে পারি’ এই অনুভূতি তাকে নিজের ভেতরের অসহায়তার ওপর সাময়িক প্রলেপ দেয়।
এটি পার্টনারকে ছোট করার জন্য নয়; বরং নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে ঢাকার চেষ্টা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, চিটিং কখনোই প্রমাণ করে না যে সুন্দর পার্টনার যথেষ্ট ছিল না। এটি প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি চিট করেছে, তার ভেতরে কিছু অপূর্ণতা, অস্থিরতা বা অমীমাংসিত কষ্ট ছিল।

সুন্দর পার্টনার থাকা সম্পর্ককে সহজ করতে পারে, কিন্তু কারও ভেতরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। যে মানুষ নিজের ভেতরের ক্ষত সারাতে পারেনি, সে বাইরে যত সুন্দর সম্পর্কই পাক, সেই ক্ষত তাকে বারবার একই ভুলের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

শেষ প্রশ্নটা তাই থেকে যায়—
সমস্যা কি সম্পর্কের সৌন্দর্যে,
নাকি মানুষের ভেতরের অসম্পূর্ণতায়?

সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ