আমরা কি পরিস্থিতির কাছে হারি, নাকি নিজের বিশ্বাসের কাছে
আমাদের প্রায় সবার মনের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। যে প্রশ্নগুলো হয়তো আমরা মাঝেমধ্যে ভাবি। নিজেকে দোষ দিয়ে অপবাদ দিই।
যখন মানুষের দিকে তাকাই, প্রথমেই মনে হয়, আমরা সবাই কতটা এক! এই পৃথিবীতে আমাদের জন্ম হয়েছে মানুষ হিসেবে। একটি হৃদয় নিয়ে, অনুভব করার ক্ষমতা নিয়ে। সবাই হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে, রাগ হয়, হিংসা হয়, আবার স্বপ্নও দেখে। তারপরও সবার মধ্যে কিছু স্বাভাবিক পার্থক্য আছে। আমি হয়তো শ্যামবর্ণ, কেউ ফরসা। আমি হয়তো খাটো, কেউ লম্বা। কারও চুল কোঁকড়ানো, কারও সোজা। কিন্তু বিশ্বাস করি, এসব পার্থক্য শুধু আমাদের বাহ্যিক পরিচয়।
যতই জীবনকে দেখি, ততই উপলব্ধি করি, ভিন্নতাই আমাদের সৌন্দর্য। তারপরও কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর মনের ভেতর খেলা করে। যেমন—
কেন একজন মানুষ দুঃখী, আর অন্যজন সুখী?
কেন একজন মানুষ আনন্দময় ও সমৃদ্ধিশালী, আর অন্যজন দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত?
কেন একজন ভয় ও উদ্বেগে ভোগে, আর অন্যজন বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ?
কেন একজনের সুন্দর, বিলাসবহুল বাড়ি থাকে, অন্যজন বস্তিতে অতি কষ্টে জীবনযাপন করে?
কেন একজন জীবনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে, অন্যজন চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়?
কেন একজন বক্তা অসাধারণ দক্ষ ও অত্যন্ত জনপ্রিয়, আরেকজন সাধারণ মানের এবং অজনপ্রিয়?
কেন একজন নিজের কাজ বা পেশায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে, অন্যজন সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করেও উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন করতে পারে না?
কেন একজন তথাকথিত দুরারোগ্য রোগ থেকেও সুস্থ হয়ে ওঠে, অথচ অন্যজন পারে না?
কেন এত ভালো, দয়ালু ও ধর্মপ্রাণ মানুষ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণায় কষ্ট পায়?
কেন অনেক অনৈতিক ও অধার্মিক মানুষ সফল হয়, সমৃদ্ধি লাভ করে এবং জীবনকে উপভোগ করে, অথচ সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে?
কেন একজন মানুষ সুখী দাম্পত্য জীবন যাপন করে, অন্যজন খুবই অসুখী ও হতাশাগ্রস্ত?
আমরা কি আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর জানি! নাকি কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছি? কখনো কি আমাদের ভেতরে যে আমিটা আছি, সেই আমিটাকে সঠিকভাবে দেখার চেষ্টা করেছি? নাকি একটু চেষ্টা করেছি অনুভব করার?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের কাছে রয়েছে; আমরা ছাড়া উত্তর আসলে কেউই জানে না। আমার ভেতরে কী ঘটছে, বাইরে থেকে এটা দেখার ক্ষমতা কারও নেই। আমি কী ভাবছি, কী অনুভব করছি। আমরা দেখতে একরকম হতে পারি অবয়ব বা কাঠামোতে; কিন্তু আমরা প্রত্যেকে আলাদা। আপ্রাণ চেষ্টা করলেও আমরা অন্য কারও মতো করে অনুভব করতে পারব না। অনুভব করতে পারব না সেই মানুষটা কতটা কষ্ট পাচ্ছে। আমরা হয়তোবা দেখি–বুঝি এবং সেই বোঝা থেকে সিদ্ধান্ত নিই, হয়তো সে এমনভাবে কষ্ট পাচ্ছে।
তাহলে কি আমাদের জীবনের সব উত্তর বাইরে কোথাও লুকিয়ে আছে? নাকি সেই উত্তরগুলো নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে নিজের ভেতরেই? যা আমরা দেখতে চাই না বা দেখতে পারি না, দেখতে ভয় পাই। সবাই নিশ্চয়ই হাতি দেখেছি। খেয়াল করেন তো, হাতি আসলে দেখতে কেমন...
বিশাল আকৃতির, শক্তিশালী একটি প্রাণী। তার বিশাল দেহ, লম্বা শুঁড়, বড় বড় দুটি কান রয়েছে। সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণীদের মধ্যে একটি। তার বিশাল শরীর, অসাধারণ শক্তি আর দৃঢ় উপস্থিতি সবাইকে মুগ্ধ করে। অথচ ছোটবেলা থেকে তাকে যদি একটি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, বড় হওয়ার পরও সে অনেক সময় সেই দড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে না। কারণ, তার শরীর নয়, বিশ্বাসটাই বাঁধা পড়ে গেছে।
অনেক সময় মানুষও ঠিক এমনই। আমাদের ভেতরে কত শক্তি, কত সম্ভাবনা, কত সাহস লুকিয়ে আছে, তার খবরই আমরা রাখি না। নিজেদের শক্তিকে ছোট করে দেখি, নিজের সামর্থ্যকে চিনতে পারি না। যেন নিজের ভেতরের বিশালত্ব আমাদের কাছেই অদৃশ্য থেকে যায়। আমরা ভাবি, সুখ, শান্তি, আত্মবিশ্বাস, ভালোবাসা কিংবা সফলতা এসব হয়তো বাইরের পৃথিবী আমাকে দেবে। মানুষ আমাকে মূল্যায়ন করলে আমি মূল্যবান হব, সবাই আমাকে ভালোবাসলে আমি পরিপূর্ণ হব, জীবনে সবকিছু ঠিকঠাক হলেই আমি সুখী হব। কিন্তু পৃথিবীর অনেক মানুষের কাছ থেকে আমি অনেক কিছুই পেতে পারি বা আমরা চাইলে ছিনিয়েও নিতে পারি; কিন্তু আমার ভেতরের যে শূন্যতা রয়েছে, তা পূরণ করার ক্ষমতা তার নেই।
আমরা যদি নিজেকে একটু সময় দিই, একটু নিজেকে বিচার না করে তার প্রতি সহমর্মিতা নিয়ে খেয়াল করি, আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই যেন একটি অদৃশ্য এক রাজত্ব রয়েছে। যে রাজত্বে লুকিয়ে আছে আমাদের সেই নানান অজানা প্রশ্নের উত্তর। সেখানে জমা আছে সাহস, ভালোবাসা, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য আর অসীম সম্ভাবনা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা অনেকেই সেই ভান্ডারের দরজাটাই কখনো খুলে দেখি না। সারা জীবন বাইরে খুঁজে বেড়াই। অথচ যার সন্ধানে ছুটি, তার অনেকটাই আমাদের নিজের ভেতরেই নীরবে অপেক্ষা করেছে...
আমরা আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখি। কিন্তু নিজের অন্তরের অন্তস্তলকে কয়জন দেখি? নিজের ভেতরে যে সাহস, ভালোবাসা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য আর সম্ভাবনার বিশাল এক জগৎ আছে, তার দরজায় কজন কড়া নাড়ি? আসলে মানুষকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে পরিস্থিতি নয়, নিজের সম্পর্কে তার বিশ্বাস।
এবার নিজেকেই প্রশ্নটা করি—আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বাইরে ছিল? ছিল আমার নিজের ভাবনার ভেতরে? এখান থেকেই শুরু করা যেতে পারে আমাদের না দেখা অধ্যায়ের গল্প।
সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ