কখনো কখনো ‘না জানা’ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো

ইচ্ছাকৃতভাবে ‘না জানা’ মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পক্ষপাত কমাতে সহায়তা করেছবি: এআই/বন্ধুসভা

আজকের বিশ্ব তথ্যনির্ভর। পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে, সব মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে সবাই জেনে যাচ্ছে। শহর থেকে গ্রামের মানুষ—কেউই পিছিয়ে নেই। আর কেউ যদি কোনো কারণে সাম্প্রতিক বিশ্বের খবরাখবর জানতে না পারে, তা অনেক সময় ব্যক্তিগত ব্যর্থতা মনে হতে পারে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্টোটা সত্য হতে পারে। অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃতভাবে ‘না জানা’ মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পক্ষপাত কমাতে সহায়তা করে। চিন্তার স্বচ্ছতা বজায় রাখা, মানসিক চাপ কমানো ও বস্তুনিষ্ঠতা উন্নত করার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।

কেন কেউ ‘ইগনোর’ বেছে নেয়?
ইচ্ছাকৃত ‘ইগনোর’ বলতে বোঝায়, সচেতনভাবে কিছু তথ্য এড়িয়ে চলা; যদিও সেগুলো সহজেই জানা সম্ভব। মানুষ প্রায়ই আবেগগত, সামাজিক বা মানসিক কারণে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য থেকে নিজেদের দূরে রাখে।

১. স্বার্থপর সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণের জন্য: যেমন—
- ছাঁটাই করার পর কোনো করপোরেট কর্মীর কী ক্ষতি হবে, তা উচ্চ বেতনের নির্বাহী কর্মকর্তারা এড়িয়ে যান।
- ধনী ব্যবসায়ী জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ নিয়ে প্রতিবেদন পড়েন না, কারণ তাঁর কারখানা থেকে প্রচুর দূষণ হয়।
- রাজনীতিবিদ জানতেই চান না তাঁর নীতির কারণে দরিদ্র মানুষের কতটা ক্ষতি হচ্ছে, যাতে অপরাধবোধে ভুগতে না হয়।
- ফাস্ট ফুডপ্রেমী খাবারের পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা এড়িয়ে যান, যেন খাওয়ার আনন্দে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

কারণ, জানলে অপরাধবোধ তৈরি হবে এবং সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। অনেক সময় মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে ইগনোর করে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে বা স্বার্থপর কিংবা অনৈতিক আচরণকে সঠিক প্রমাণ করতে। তাই ‘না জানা’ হয়ে ওঠে একধরনের সুবিধাজনক আত্মরক্ষার কৌশল।

২. অতিরিক্ত মানসিক চাপ এড়ানোর জন্য: ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু এড়িয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ, মানসিক আলস্য বা ক্লান্তি। অতিরিক্ত বিকল্পের চাপে মানুষ বিভ্রান্ত বোধ করতে পারে বা বুঝতে পারে না কোন তথ্যগুলো আসলেই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অনেক সময় আমরা বিভিন্ন তথ্য এড়িয়ে যাই, বা তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিই। যেমন মনের মতো না হলেও তাড়াতাড়ি খোঁজ শেষ করতে একটি বাসা ঠিক করে ফেলা। আমরা দ্রুত সমাধানের শর্টকাট খুঁজি, যদিও এতে শেষ পর্যন্ত খারাপ ফল আসতে পারে।

ইগনোর করা কি আপনার জন্য ভালো?
সাধারণত মানুষ মনে করে বেশি জ্ঞান মানেই ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে কম জানা আসলে মানসিক সুস্থতা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে উপকারী।

১. আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য: অনেক সময় অতিরিক্ত জানা স্পষ্টতার বদলে চাপ বাড়ায়। যখন বাস্তবতা আবেগগতভাবে অসহনীয় বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তখন কষ্টদায়ক সত্য এড়িয়ে যাওয়া সাময়িকভাবে একধরনের মানসিক শান্তি এনে দেয়। যেমন—
- কেউ যদি জানতে পারেন তাঁর প্রিয়জনের মরণব্যাধি রোগ আছে, তিনি হয়তো পূর্ণ চিকিৎসা-প্রতিবেদন পড়তে চাইবেন না।
- আর্থিক সংকটে পড়ে বিপজ্জনক কাজ নিতে রাজি হওয়া একজন ব্যক্তি হয়তো সেই পেশার দুর্ঘটনা-পরিসংখ্যান খুঁজবেন না।
- অনেকেই যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সহিংসতার ভয়াবহ খবর দেখতে চান না।

তবে, সব সময় এমনটা করলে হবে না। দীর্ঘমেয়াদে মানিয়ে নেওয়া ও দৃঢ়তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজা গুরুত্বপূর্ণ।

২. পক্ষপাত কমাতে ‘সেলফ-ব্লাইন্ডিং’: সেলফ-ব্লাইন্ডিং হলো বুদ্ধিদীপ্ত ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক এক শক্তিশালী পদ্ধতি। এতে সচেতনভাবে সেসব তথ্য বাদ দেওয়া হয়, যা আমাদের বিচার-বিবেচনাকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন নিয়োগ, আইন বা একাডেমিক ক্ষেত্রে মূল্যায়ন থেকে প্রার্থীর নাম, ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে ফেলা। একজন নিয়োগকর্তা যদি প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত দেখেন, কিন্তু কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় না জানেন; তাহলে তিনি শুধু অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

কেন ইচ্ছাকৃত ‘ইগনোর’ করা কঠিন
কখনো কখনো ইচ্ছাকৃত ‘ইগনোর’ করা বা না জানাটা ভালো হলেও, অনেকেই এটা মেনে চলতে পারেন না। দুটি মূল মনস্তাত্ত্বিক শক্তি এতে বাধা সৃষ্টি করে—

১. কৌতূহল: মানুষ স্বভাবতই জ্ঞানের শূন্যতা পূরণ করতে চায়। সেই শূন্যতা সম্পর্কে সচেতন হয়েও কিছু না করা অনেক সময় অস্বস্তিকর লাগে।
২. অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস: অনেকেই মনে করে, যত বেশি জানবে, তত ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। কিন্তু অতিরিক্ত জানা অনেক ক্ষেত্রে আরও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

কিছু না জানা কখন সবচেয়ে ভালো?
যদি কোনো কিছু নিয়ে কৌতূহল জাগে, তখন—
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: আমার কি এই তথ্যটি লাগবে, এটার কি কোনো প্রয়োজন আছে?
ভালো সিদ্ধান্তের জন্য যেটা প্রয়োজন কেবল সেটাতেই মনোযোগ দিন।
মনে রাখবেন, অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও কৌতূহল জাগতে পারে।

যদি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস জাগে, তখন—
বুঝতে শিখুন কীভাবে অপ্রয়োজনীয় তথ্য আপনাকে প্রভাবিত করছে।
নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিকে যাছাই করুন। আত্মবিশ্বাস কোন পর্যায়ে আছে, তা যাছাই করুন। তাহলে হয়তো নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তটি আরও ভালো হবে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ‘ইগনোর’ বা কোনো বিষয়ে না জানাটা খারাপ অভ্যাস হতে পারে। কিন্তু সঠিক পরিস্থিতিতে এটি স্মার্ট সাইকোলজিক্যাল কৌশল। এই কৌশল মানসিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষা দেবে, আবেগীয় সুস্থতাকে সমর্থন দেয়, পক্ষপাতিত্ব কমায়, মনোযোগ বাড়ায়, এবং দূরদর্শীসম্পন্ন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে