যমুনা নদীর জন্ম কীভাবে, নামটাই-বা কে দিল
একই নদীর কি দ্বিতীয় জন্ম হতে পারে? পারে, যদি তার বুকের ভেতর দিয়ে বদলে যায় স্রোতের দিক, পাল্টে যায় গতিপথ, আর পুরোনো পরিচয়ের জায়গায় জন্ম নেয় নতুন এক নাম। সিরাজগঞ্জের পাশ দিয়ে ছুটে চলা যমুনা তেমনই এক নদী। যার স্রোতে মিশে আছে ব্রহ্মপুত্রের দীর্ঘ ইতিহাস, প্রকৃতির প্রবল পরিবর্তন আর মানুষের বসতি হারানো-গড়ার গল্প।
কিন্তু যমুনার সবচেয়ে বড় রহস্য হয়তো তার জন্মে নয়, তার নামে। কীভাবে ব্রহ্মপুত্রের এক নতুন প্রবাহ হয়ে উঠল যমুনা? ১৭৮৭ সালের বন্যা ও ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনই–বা কতটা বদলে দিয়েছিল নদীর পথ? আর ‘যমুনা’ নামটি প্রথম কার মুখে এসেছিল? তার উত্তর কি ইতিহাসের পাতায় আছে, নাকি রয়ে গেছে লোককথা আর বিশ্বাসের আড়ালে?
ব্রহ্মপুত্র থেকে যমুনা
সিরাজগঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা কোনো স্বাধীন উৎস থেকে জন্ম নেওয়া আলাদা নদী নয়। এটি মূলত ব্রহ্মপুত্র নদের নিম্নপ্রবাহের নতুন গতিপথ। ব্রহ্মপুত্র তিব্বত থেকে প্রবাহিত হয়ে ভারত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে; বাংলাদেশের একটি পর্যায়ে এর প্রধান প্রবাহ যমুনা নামে পরিচিত।
অষ্টাদশ শতকের আগে ব্রহ্মপুত্রের প্রধান প্রবাহ বর্তমান যমুনার পথ ধরে প্রবাহিত হতো না। ঐতিহাসিক মানচিত্র ও পরবর্তী গবেষণা থেকে জানা যায়, তখন ব্রহ্মপুত্রের প্রধান ধারা পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বর্তমান পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের পথ ধরে মেঘনার দিকে যেত।
জেমস রেনেলের অষ্টাদশ শতকের মানচিত্র এই পুরোনো প্রবাহপথের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। ১৭৬৩ থেকে ১৭৭৩ সালের মধ্যে রেনেল বাংলার নদ-নদীর জরিপ করেন এবং ১৭৭৯ সালে তাঁর বাংলার অ্যাটলাস প্রকাশিত হয়। তাঁর মানচিত্রে ব্রহ্মপুত্রকে বর্তমান পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের গতিপথে প্রবাহিত হতে দেখা যায়।
১৭৮৭—নদীর ইতিহাসে এক বড় বাঁক
যমুনার ইতিহাসে ১৭৮৭ সাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছর প্রবল বন্যার প্রভাবে ব্রহ্মপুত্র তার পুরোনো গতিপথ থেকে সরে দক্ষিণমুখী নতুন পথে প্রবাহিত হতে শুরু করে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, নতুন প্রবাহটি ঝিনাই ও কোনাই নদের গতিপথ বরাবর এগিয়ে গিয়ে প্রশস্ত ও বিনুনি-আকৃতির যমুনা নদীখাত গড়ে তোলে।
১৭৮২ সালে ময়মনসিংহ অঞ্চলে একটি তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। কিছু গবেষণায় এই ভূমিকম্পসহ ভূপ্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পরিবর্তনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে যমুনার সৃষ্টি শুধু একটি ভূমিকম্পের ফল, এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যেও বন্যা, ভূপ্রাকৃতিক পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি নদী-সঞ্চালনের বিষয়টি একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
নদীর এই পরিবর্তন ছিল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ১৭৮৭ সালে বড় পরিবর্তন শুরু হলেও ব্রহ্মপুত্রের নতুন গতিপথের পূর্ণ বিকাশ এক দিনে হয়নি। বাংলাপিডিয়ার বিভিন্ন নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই গতিপথ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া প্রায় ১৮৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয়। তাই ১৭৮৭ সালকে যমুনার ‘জন্মসাল’ বলার চেয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় বলা বেশি যুক্তিযুক্ত।
ঝিনাই না জোনাই, আর কোনাই?
যমুনার জন্মকথা বলতে গিয়ে স্থানীয় ও বিভিন্ন লেখায় ‘জোনাই’ বা ‘জেনাই’ নামের একটি পুরোনো প্রবাহের কথা পাওয়া যায়। আবার গবেষণামূলক ও বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি বর্ণনায় জেনাই ও কোনাই নাম ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাপিডিয়ার বাংলা বর্ণনায় জেনাইর রূপ হিসেবে ‘ঝিনাই’ এবং পাশাপাশি ‘কোনাই’ উল্লেখ রয়েছে।
এখানে বিষয়টি বোঝার জন্য একটি কথা মনে রাখা জরুরি, এগুলোকে আজকের যমুনার মতো বিশাল নদী হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। ঐতিহাসিক নদীপথের পরিবর্তনের সময় ব্রহ্মপুত্রের বিপুল জলধারা দক্ষিণমুখী হয়ে এই পুরোনো প্রবাহপথগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ধীরে ধীরে নতুন, প্রশস্ত নদীখাত তৈরি করে। ফলে ‘জোনাই’ বা ‘জেনাই’ এবং ‘কোনাই’কে যমুনার একক জন্মদাতা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি তাদের প্রসঙ্গ পুরোপুরি বাদ দেওয়াও ইতিহাসের ধারাটিকে অসম্পূর্ণ করে।
পুরোনো ব্রহ্মপুত্র তাহলে কি যমুনার ‘যমজ’
বন্ধুর মতো করে বললে, একই নদীর যেন দুটি পুরোনো-নতুন রূপ। একদিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, অন্যদিকে নতুন প্রবাহ যমুনা। কিন্তু বৈজ্ঞানিক অর্থে তাদের ‘যমজ নদী’ বলা হয় না। এগুলো একই নদীব্যবস্থার পুরোনো ও নতুন প্রবাহপথ।
পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে, আর নতুন দক্ষিণমুখী প্রবাহ শক্তিশালী হয়ে বর্তমান যমুনার বিশাল নদীখাত তৈরি করে। পুরোনো ব্রহ্মপুত্র এখন জামালপুর ও ময়মনসিংহের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরববাজারের কাছে মেঘনায় গিয়ে মিশেছে।
‘যমুনা’ নামটি এল কোথা থেকে
বাংলাদেশের এই নদীকে ঠিক কে, কোন সালে এবং কী কারণে ‘যমুনা’ নাম দিয়েছিলেন, তার নির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা থাকলেও নামকরণের প্রথম ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট। তাই ‘অমুক ব্যক্তি অমুক সালে নামটি দিয়েছিলেন’—এমন দাবি প্রমাণ ছাড়া করা ঠিক হবে না।
তবে ‘যমুনা’ নামটি নিয়ে বিভিন্ন প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে।
পুরাণের যমুনা ও যমরাজ
হিন্দু পুরাণে যমুনা একটি পবিত্র নদীর নাম। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, যম ও যমুনা সূর্যদেবের সন্তান এবং যমজ ভাই-বোন। এই কাহিনির সঙ্গে ‘যম’ ও ‘যমুনা’ নামের সাংস্কৃতিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছে।
ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার সঙ্গে যম-যমুনার একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনি জড়িয়ে আছে। প্রচলিত বিশ্বাসে, যমুনা তাঁর ভাই যমকে ফোঁটা দিয়েছিলেন।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি পৌরাণিক কাহিনি ও ধর্মীয় বিশ্বাস। বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর নাম এই কারণেই রাখা হয়েছিল, এমন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
ভারতের যমুনার সঙ্গে কি নামের সম্পর্ক আছে
আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, বাংলাদেশের নতুন প্রবাহের নামকরণ ভারতের প্রাচীন যমুনা নদীর নাম অনুসরণে হতে পারে। ‘যমুনা’ নামটি ভারতীয় উপমহাদেশে বহু পুরোনো ও পরিচিত হওয়ায় এমন ধারণার জন্ম হওয়া স্বাভাবিক।
কেউ কেউ আবার ‘যমুনা’ শব্দের সঙ্গে ‘যম’ বা ‘যমজ’-এর ধারণার সম্পর্কের কথাও বলেন।
কিন্তু এখানেও একই কথা—এগুলো সম্ভাব্য বা প্রচলিত ব্যাখ্যা; বাংলাদেশের যমুনার নামকরণের নিশ্চিত ঐতিহাসিক কারণ হিসেবে এগুলো প্রতিষ্ঠিত নয়।
রেনেলের মানচিত্র যেন সময়ের সাক্ষী
যমুনার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা হলো ব্রিটিশ জরিপকারী জেমস রেনেলের মানচিত্র। অষ্টাদশ শতকের তাঁর জরিপে ব্রহ্মপুত্রের পুরোনো গতিপথের চিত্র পাওয়া যায়।
এই মানচিত্রগুলোর সঙ্গে পরবর্তী সময়ের মানচিত্র তুলনা করলে বোঝা যায়, বাংলার নদীগুলো কতটা পরিবর্তনশীল। একটি নদী যে চিরকাল একই পথে থাকে না, যমুনার ইতিহাস তারই বড় উদাহরণ।
সিরাজগঞ্জ ও যমুনা—এক নদীর সঙ্গে একটি জনপদের সম্পর্ক
যমুনার সঙ্গে সিরাজগঞ্জের সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক নয়; মানুষের জীবন ও জনপদের ইতিহাসও এই নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
নদীভাঙনে ঘর হারিয়েছে মানুষ, আবার নদীর বুকেই জেগেছে নতুন চর। কোথাও কৃষিজমি বিলীন হয়েছে, কোথাও নতুন জমি তৈরি হয়েছে। নদীর স্রোতের সঙ্গে বদলেছে মানুষের বসতি, জীবিকা ও জীবনযাত্রা।
তাই সিরাজগঞ্জের মানুষের কাছে যমুনা একই সঙ্গে ভাঙনের বেদনা, চর জাগার আনন্দ, জীবিকার উৎস এবং শৈশবের স্মৃতি।
কেন যমুনা এত চঞ্চল
যমুনা একটি বিনুনি-আকৃতির নদী (braided river)। এর একাধিক প্রবাহ পাশাপাশি চলে এবং মাঝখানে চর ও বালুচর তৈরি হয়। স্রোত ও পলি জমার কারণে কোনো প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, আবার অন্য কোথাও নতুন প্রবাহপথ তৈরি হয়।
ফলে যমুনার চেহারা স্থির নয়। আজ যে চর আছে, কাল সেখানে স্রোত বইতে পারে; আবার যেখানে নদী ছিল, সেখানে জেগে উঠতে পারে নতুন ভূমি।
শেষ পর্যন্ত রহস্যটা কোথায়
যমুনার পথবদলের ইতিহাস আমাদের অনেকটাই জানা। আমরা জানি, এটি ব্রহ্মপুত্র নদব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত; জানি অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে নদীর গতিপথে বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছিল; জানি পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে নতুন দক্ষিণমুখী প্রবাহ শক্তিশালী হয়েছিল।
কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত নয়—
‘যমুনা’ নামটি প্রথম কে উচ্চারণ করেছিলেন, আর ঠিক কেন এই নামটি বেছে নেওয়া হয়েছিল?
হয়তো কোনো পুরোনো নথির পাতায় একদিন সেই উত্তর মিলবে। তত দিন পর্যন্ত যমুনার নামের রহস্যটি থেকে যাবে ইতিহাস, ভূগোল, লোকবিশ্বাস ও মানুষের স্মৃতির মাঝখানে।
নদী যেমন নিজের পথ বদলায়, তেমনি তার গল্পও সময়ের সঙ্গে নতুন অর্থ পায়। আর সিরাজগঞ্জের যমুনা সেই গল্পেরই এক জীবন্ত অধ্যায়।
রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ