বাংলা ভাষার ডিজিটাল বিপ্লবের নীরব কারিগর
বাংলা ভাষার ডিজিটাল–যাত্রায় এক বিপ্লবের নাম অভ্র কি–বোর্ড। ২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করা এই সফটওয়্যারটি তৈরি করেন বাংলাদেশি সফটওয়্যার ডেভেলপার মেহদী হাসান খান। সেই সময় কম্পিউটারে বাংলা লেখা ছিল জটিল ও সীমাবদ্ধ। বিভিন্ন ফন্ট ও এনকোডিং সমস্যার কারণে এক ডিভাইসের লেখা অন্য ডিভাইসে ঠিকমতো দেখা যেত না। অভ্র কি–বোর্ড এই বাধা ভেঙে বাংলা ভাষাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহজ, সর্বজনীন ও আধুনিক পরিচয় দেয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়, সেই ভাষাকে প্রযুক্তির জগতে প্রতিষ্ঠা করা ছিল নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ। ইউনিকোডভিত্তিক টাইপিং–সুবিধা এনে অভ্র কি–বোর্ড বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কোডিং কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে বাংলা লেখা ই-মেইল, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সফটওয়্যারে সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।
অভ্র কি–বোর্ডের সবচেয়ে বড় অবদান হলো বাংলা লেখাকে বৈশ্বিক ডিজিটাল মানে রূপান্তর করেছে। ইংরেজি অক্ষর দিয়ে বাংলা লেখা সম্ভব হওয়ায় নতুন ব্যবহারকারীর জন্য সহজ হয়েছে টাইপিং। ওপেন ও ফ্রি সফটওয়্যার হিসেবে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রচলিত বিজয় লেআউটসহ বিভিন্ন কি–বোর্ড বিন্যাস এতে অতি সহজেই ব্যবহার করা যায়।
২০০৭ সালে ইউনিকোডভিত্তিক বাংলা টাইপিং জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য অভ্র কি–বোর্ড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়। এটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি ও ভাষা একসঙ্গে এগোলে সাংস্কৃতিক পরিচয় আরও দৃঢ় হয়।
অভ্র কি–বোর্ড বাংলা ভাষাকে শুধু প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করেনি; এটি ভাষার একটি আধুনিক, বিশ্বমুখী পরিচয় গড়ে তুলেছে। প্রবাসী বাঙালিরাও সহজে মাতৃভাষায় যোগাযোগ করতে পারছেন। শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন, ব্যক্তিগত যোগাযোগসহ সব ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষার ডিজিটাল ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ।
বাংলা ভাষার ইতিহাস যেমন সংগ্রামের, তেমনি অভিযোজন ও অগ্রগতির। সেই ধারাবাহিকতায় অভ্র কি–বোর্ড এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রযুক্তির সহায়তায় মাতৃভাষাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার যে প্রয়াস, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে অভ্র কি–বোর্ড। ঠিক এভাবেই ভাষা আন্দোলন শেষ হলেও নিজের মাতৃভাষার জন্যে লড়ে যাচ্ছে প্রত্যেকটি মানুষ; সেটা হতে পারে রাজপথে, হতে পারে পুথিগত জ্ঞান দিয়ে অথবা মেহেদী হাসানের মতো আধুনিকায়নের ছোঁয়া দিয়ে। বন্ধুসভার শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে আমাদের এই বাংলা ভাষার চর্চা প্রতিনিয়ত অন্য রূপ পাচ্ছে। বন্ধুরা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনবরত ব্যবহার করে যাচ্ছেন এই অভ্র কি–বোর্ড।
সভাপতি, ড্যাফোডিল বন্ধুসভা