আমার বই পড়া
‘আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ’ কে লিখেছেন সেটা মনে নেই। খুব ছোটবেলায় যখন পড়তে জানি না তখন আব্বু রূপকথার এই গল্পের বইটি কিনে এনেছিলেন। বেশ কয়েকটা গল্প ছিল বইটিতে। হারিকেনের আলোয় প্রায়শই পড়ে শোনাতেন। আমি যখন পড়তে শিখেছি ততদিনে আমাদের বাড়ি থেকে বইটি হারিয়ে গেছে। সম্ভবত কেউ নিয়ে গিয়েছিল। তারপর আরও কিছু ছোট ছোট বাঘ-সিংহের গল্পের বই এনে দিয়েছিলেন। গত বছর আব্বু গত হয়েছেন। তার পর থেকে এই স্মৃতিগুলো ভীষণভাবে নাড়া দেয়। আমার ভীষণ বইপ্রেমী এবং সংবেদনশীল মানুষ হওয়ার পেছনে সম্ভবত তাঁর এই ছোট ছোট পদক্ষেপ বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু হয়। কয়েকটা রূপকথার গল্পের বই ছিল তখন। টিফিনের ওই ৩০-৪৫ মিনিটের জন্য হলেও একই বই প্রায়শই নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতাম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ব্র্যাকের ভীষণ সমৃদ্ধ একটা গণগ্রন্থাগার ছিল। সেখানে আনাগোনা বাড়তেই থাকে। সে-বছরই মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শ্রেণিভিত্তিক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি চালু হয়। এই দুই মিলে মণিমুক্তার মতো কিছু অনবদ্য বইয়ের সন্ধান পাই। আমার স্কুলশিক্ষক পিতা ও পাঠানুরাগী মায়ের সুবাদে পারিবারিক সূত্রে আমাদের বাড়ি থেকেও বেশ কিছু বই হস্তগত হয়। অতঃপর সময়ের সঙ্গে নেশাগ্রস্ত হওয়ার অধ্যায়।
দেখতে দেখতেই কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। গত বছর একাডেমিক জীবনের পাট চুকিয়েছি। জীবনসংগ্রামে নাজেহাল সময় যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে। বনফুল তাঁর ‘পাঠকের মৃত্যু’ ছোটগল্পে পাঠকের পট পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে। সে উপলব্ধি নিজেই নিজের মধ্যে অনুভব যে করি না, তা নয়।
রূপকথার গল্প দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই ছোটবেলায়, তারপর হিমু-মিসির আলি সিরিজ, গোয়েন্দা কাহিনি, অ্যাডভেঞ্চার, থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন, সামাজিক কিংবা রোমান্টিকধর্মী উপন্যাস, কাল্পনিক গল্প পেরিয়ে তথ্যমূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তবে ইদানীং সব থেকে বেশি টানে মানুষের জীবনের সত্যিকারের গল্প। যাকে বলে জীবন থেকে নেওয়া। হোক সে গল্প, প্রবন্ধ কিংবা ইতিহাস আশ্রিত।
আগের মতো নেশাতুর বইয়ের পাতায় ডুব দেওয়া হয় না ঠিকই। জীবনকে উপলব্ধি করার নিদারুণ প্রয়াসে বাস্তবতার ভেলকিবাজিতে মানবজীবনের বাস্তবতার প্রতি আগ্রহের সবটুকু বোধ হয় ফুরিয়ে যায়নি এখনো। অবশিষ্ট ওইটুকুর বদান্যতায় এখনো মাঝেমধ্যে দু-চার পৃষ্ঠা ওলটানো হয়। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে থাকা প্রবহমান জীবনের হরেক রকম জটিলতার মধ্যে বইয়ের পাতায় মুখ-চোখ গুঁজে রাখার ওই একটুখানি সময়ই বোধ হয় শুধু নিজেতে যাপিত হয়।
রাজারহাট, কুড়িগ্রাম