এক মানুষ, দুই ডিএনএ: এক শরীরে কি দুই জিনগত পরিচয় সম্ভব

কোলাজ: এআই

ডিএনএ মানব শরীরের ব্লুপ্রিন্ট। ডিএনএর ভেতরে থাকা কোড ঠিক করে দেয় একজন মানুষের গায়ের রং, উচ্চতা, চোখের মণির রংসহ আরও অনেক কিছু। বলা চলে, মানব শরীরের সব কাজ ও গঠনের মূল নির্দেশিকাই এই ডিএনএ। মানব শরীরে থাকা কোটি কোটি কোষের ডিএনএর গঠন একই রকম। কিন্তু প্রশ্ন জাগতেই পারে, একজন মানুষের শরীরে কি দুটি ভিন্ন ডিএনএ থাকতে পারে? শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে—হ্যাঁ, থাকতে পারে। এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল হলেও এর নজির রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কাইমেরিজম।

কাইমেরিজমের সবচেয়ে পরিচিত ধরনটি হচ্ছে টেট্রাগ্যামেটিক কাইমেরিজম। মূলত দুটি ডিম্বাণু একই সময়ে দুটি পৃথক শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয়ে যমজ ভ্রূণ তৈরি করে। কিন্তু খুব বিরল ক্ষেত্রে একেবারে শুরুর দিকে দুটি নিষিক্ত ডিম্বাণু একত্রে মিলে একটি ভ্রূণে পরিণত হয়। এর ফলে জন্ম নেওয়া শিশু সাধারণ মানুষের মতো দেখতে হলেও তার শরীরে থেকে যায় দুটি ভিন্ন জিনগত পরিচয়।

এর একটি বাস্তব ও আলোচিত ঘটনা লিডিয়া ফেয়ারচাইল্ডের। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, তিনি তাঁর সন্তানদের জৈবিক মা নন। এ ঘটনার পর তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ ও বিস্তৃত পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা আবিষ্কার করেন, তাঁর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ভিন্ন ডিএনএ রয়েছে।

আরেকটি আলোচিত ঘটনা কারেন কিগানের। কিডনি প্রতিস্থাপনের আগে পারিবারিক ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর দুটি সন্তান জিনগতভাবে তাঁর সন্তান হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জানা যায়, তাঁর শরীরেও উপস্থিত রয়েছে দুটি ভিন্ন ধরনের ডিএনএ।

তা ছাড়া গর্ভাবস্থায় মা ও ভ্রূণের মধ্যেও অল্পসংখ্যক কোষের আদান-প্রদান হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় মাইক্রোকাইমেরিজম। এই কোষগুলো অনেক সময় বহু বছর পর্যন্ত শরীরে থাকতে পারে। আবার বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বা স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পরও একজন মানুষের শরীরে দাতার ডিএনএ থাকতে পারে।

আরও পড়ুন

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর কোনো ক্ষতি নেই। অনেকে সারা জীবন জানতেই পারেন না যে তাঁর শরীরে দুটি ভিন্ন ডিএনএর উপস্থিতি রয়েছে। তবে ভিন্ন ডিএনএ থাকার কারণে কিছু মানুষের ত্বকের রঙে ভিন্নতা, দুই চোখের রং আলাদা হওয়া কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ডিএনএ থাকার মতো বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে।

পিএনএএস, ট্রেন্ড ইন ইমোনোলজি এবং জার্নাল অব সেল সায়েন্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কাইমেরিজম সাধারণত কোনো ক্ষতির কারণ নয়। তবে এটি ডিএনএ পরীক্ষা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। গবেষকেরা মনে করেন, মাইক্রোকাইমেরিজম শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামতে সহায়তা করতে পারে এবং মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে।