তারুণ্যই বাংলাদেশের শক্তি
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
প্রথম আলো ও বন্ধুসভা একে অপরের সাথি। বিগত ২৭ বছরের পথচলায় বন্ধুসভা আমাদের দেখিয়েছে— একটি সংগঠন কতটা শক্তিশালী হতে পারে, যখন সেটি তরুণদের হাতে গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪ ভাগের ১ ভাগই (২৭ দশমিক ৮২ শতাংশ) এখন তরুণ। তাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। সংখ্যার হিসাবে, তরুণ জনগোষ্ঠী এখন ৪ কোটি ৫৯ লাখ। বাংলাদেশের সামনে অগ্রসর হওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি যদি এক কথায় বলতে হয়, তাহলে বলব— তারুণ্য। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০১৬ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১০ শতাংশ। অন্যদিকে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তারপরও এ দেশের তরুণ প্রজন্মই সবচেয়ে বেশি স্বপ্ন দেখে, সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করে, আবার সবচেয়ে বেশি কাজও করে। তারা নতুন পথ খোঁজে, পুরোনো দ্বিধা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করতে জানে। এ কারণেই প্রথম আলো বন্ধুসভাকে আমরা সব সময় বিশেষভাবে দেখি— এরা সেই তরুণসমাজ, যারা বিনা স্বার্থে কাজ করে, যারা দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
প্রথম আলো আর বন্ধুসভার পথচলা শুরু একই সময়ে। প্রথম আলোর চলার পথে বড় শক্তি বন্ধুসভা। দেশব্যাপী প্রচার-প্রচারণাসহ প্রথম আলোর বড় যত কাজ, সেখানে বন্ধুসভা সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যুক্ততা থাকে। প্রথম আলো ও বন্ধুসভা একে অপরের সাথি। বিগত ২৭ বছরের পথচলায় বন্ধুসভা আমাদের দেখিয়েছে— একটি সংগঠন কতটা শক্তিশালী হতে পারে, যখন সেটি তরুণদের হাতে গড়ে ওঠে। আমরা দেখেছি, ছোট ছোট উদ্যোগ কীভাবে বড় সামাজিক পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন্ধুসভার তরুণেরা প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়। মানুষের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়াতে নিয়মিত পাঠচক্র করে; বইমেলার আয়োজন করে, সাহিত্যচর্চা করে। অর্থাৎ মেধা উন্নয়নের চেষ্টা করে সব সময়। কোনো মানুষ বিপদে পড়লে সহায়তা নিয়ে এগিয়ে যায়। ঈদে সহমর্মিতার কর্মসূচির আয়োজন করে। মানবিক এ প্রবণতাই বন্ধুসভার পরিচয়কে আলাদা করে তুলেছে।
বর্তমান যুগকে আমরা এআইয়ের যুগ বলি, প্রযুক্তির যুগ বলি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি প্রতিযোগিতার যুগও। তরুণদের ওপর এখন পড়াশোনা, ভর্তি, চাকরি, দক্ষতা ইত্যাদি মিলিয়ে নানা রকম চাপ বহুগুণ বেড়েছে। কঠিন এই সময়েও যারা এসব কাজের পাশাপাশি সামাজিক কাজে সময় দেয়, নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবায় যুক্ত থাকে, তারা সত্যিই বিশেষ। এতে প্রমাণিত হয়, উন্নতি শুধু নিজের নয়, সবার সঙ্গে মিলেও হতে পারে। সমাজের জন্য কিছু করার অভ্যাসই ভবিষ্যতের প্রকৃত নেতৃত্ব গড়ে তোলে।
আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনে বন্ধুসভা আরও সুসংগঠিত হবে, কাজের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হবে। দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বন্ধুসভার অবদান আরও দৃশ্যমান হবে।
ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানবিকতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধার মতো সঠিক মূল্যবোধ ধরে রাখা। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, এসব মূল্যবোধ ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না। আগামীর তরুণদের এসব মূল্যবোধ ধারণ করেই চলতে হবে।
বন্ধুসভার কর্মসূচিগুলোও সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে। নতুন উদ্যোগ আসছে, নতুন ভাবনা যোগ হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে অনলাইন নিরাপত্তা, সাইবার বুলিং, মানসিক স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা উন্নয়ন—এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা এখন খুব জরুরি। এসব নতুন ক্ষেত্রেও বন্ধুসভার তরুণেরা নিজেদের ভূমিকা আরও জোরালো করছে। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে তরুণদের চিন্তা, তাদের কল্পনা, তাদের সাহসী স্বপ্নই নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলছে।
আমাদের তরুণেরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাসী, বেশি সচেতন এবং বেশি দায়িত্ববান। তারা শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজ, পরিবেশ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা— সবকিছুর সঙ্গে নিজেদের সরাসরি যুক্ত করছে। একইভাবে বন্ধুসভার প্রতিটি কাজ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একেকটি প্রচেষ্টা।
ষষ্ঠ জাতীয় বন্ধু সমাবেশ সেই নেতৃত্ব, সেই শক্তি, সেই সম্ভাবনারই এক মিলনমেলা হতে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণেরা যখন একসঙ্গে বসে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করবে, নতুন পরিকল্পনা করবে, নিজেদের ভুল থেকে শিখবে, নিজেদের অর্জন নিয়ে আলোচনা করবে, তখনই বন্ধুসভার প্রকৃত শক্তি সামনে আসবে। এই সমাবেশ শুধু উৎসব নয়; এটি তরুণদের নাগরিক চেতনা গড়ে তোলার জায়গা, নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনার সুযোগ।
যারা আজ তরুণ, তারা আগামী দিনের সমাজ নির্মাতা। এই নির্মাণে প্রয়োজন চিন্তা, পড়াশোনা, প্রশ্ন করার সাহস, ভুল থেকে শেখার মানসিকতা এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতা। বন্ধুসভার তরুণদের কাজে দেখতে পাই, মানুষের জন্য কিছু করতে হলে বড় পরিসর লাগে না, লাগে সৎ ইচ্ছা আর দৃঢ়তা। বন্ধুসভার সদস্যরা একসময় নানা পেশায় যুক্ত হয়; ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। কিন্তু প্রথম আলোকে তারা ভোলে না। প্রথম আলোর আদর্শ, মূল্যবোধ তাদের মধ্যে অক্ষুণ্ণ থাকে সব সময়।
প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের সঙ্গে চলতে পারার যে চ্যালেঞ্জ, তা যেন মোকাবিলা করতে পারে প্রথম আলো আর বন্ধুসভা একসঙ্গে। নিজেদের জানা-বোঝা, প্রযুক্তিজ্ঞান ও দক্ষতা বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেন সমর্থ হয়। আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনে বন্ধুসভা আরও সুসংগঠিত হবে, কাজের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হবে। দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বন্ধুসভার অবদান আরও দৃশ্যমান হবে। স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রথম আলো সব সময় এই তরুণ শক্তির পাশে থাকবে।