স্মৃতিগদ্য
সেই সব সন্ধ্যা
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
সেই সব সন্ধ্যার কথা মনে পড়লে ধূলির গন্ধ পাই, রিকশার পেছনে বাঁধা লন্ঠনগুলো জ্বলে উঠছে, বাতাসে কেরোসিনের গন্ধ, কোথাও একটা পথহারা বাছুর আর্তস্বরে হাম্বা হাম্বা বলে মাকে ডাকছে, আকাশ লাল, আকাশ বেগুনি, আকাশ গোলাপি, হাফপ্যান্টের পায়ে চোরকাঁটা (আমরা বলতাম ওকড়া); আজান হয়ে গেছে একটু আগে; বেলের গাছে আঁধার জমাট বাঁধছে, ওই গাছে ভূত থাকে, তার নিচ দিয়েই তো ঘরে ফিরতে হবে আমাকে, আজ আর আমি ঘরে যেতে পারব না, তবে আমি কোথায় যাব; আব্বা আব্বা বলে কেঁদে উঠছে কার খোকা; রেডিওতে আবদুল আলীম, হলদিয়া পাখি...; ফেরদৌসী রহমান, আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল...। আমি বাড়ি যাব না, বাবলাগাছে হরিয়াল ডাকে, বাদুড়েরা পাখা বিস্তার করে আকাশ ঢেকে ফেলে, ও আকাশ তোমার কাছে নীল আছে, আমাকে বাড়ি ফিরিয়ে নাও...আকাশে তোমার হাতে একরাশ নীল ছিল, এখন লাল, গোলাপি, হলুদ সব ঢেকে দিচ্ছে কালো, শটিবনে জোনাকি জ্বলছে, শিয়াল ডাকছে, কুকুর ডাকছে পাল্লা দিয়ে, আব্বা এই বিশাল কালো আকাশের নিচে আমি হারিয়ে গেছি, আমাকে নিয়ে যান...
আমাদের সন্ধ্যাগুলো হারিয়ে গেল। আমাদের বিকেলগুলো হারিয়ে গেল। আমাদের দুপুরগুলো হারিয়ে গেল।
আহা কী সব সন্ধ্যা ছিল! বিকেল হওয়ার আগেই গ্রামের বাড়ির উঠানময় কেরোসিনের গন্ধ। সব কটি হারিকেনের চিমনি পরিষ্কার করা হচ্ছে। ফিতা ঠিক করা হচ্ছে। কেরোসিন ভরা হচ্ছে প্রদীপে প্রদীপে। আলো হেলে পড়ছে। ছায়াগুলো লম্বা হচ্ছে। মাঠের মধ্যে শুয়ে আছে হলুদ আলো, অলস গরু, তার কানের কাছে দুটো গোশালিক। বরইয়ের গাছে স্বর্ণলতা। তাতে এসে পড়ছে হলুদ আলো। বরইগুলো ঝকমক করছে, একটা-দুটো একটু লাল হয়েছে কি!
রান্নাঘরে ধোঁয়া উঠছে, বাঁশঝাড়ের মাথায় লটকে আছে ধোঁয়া। গরুর পাল ধূলি উড়িয়ে ঘরে ফিরছে, একেই বলে গোধূলি। এর মধ্যে একজন নিথুয়া পাথারে হাঁক দিচ্ছে, এ-এ-এ-এ ধলু... কোটে গেলু...
নদীর পাড়ে বটগাছ। বটগাছের নিচে হাট। একটা উঁচু রাস্তা সেই হাটে মিলছে। ওইখানে অবশ্যই মাটির রাস্তার ওপরে একটা উঁচু সেতু। পিলপিল করে লোকে হাটে যাচ্ছে, তাদের কাঁধে বাঁক। কেরোসিনের ল্যাম্পো বড় বড় শিখায় আলো জ্বালাচ্ছে। মাছের পিঠের আঁশে সেই আলো ঠিকরে উঠছে। ক্রেতা মাছের কানকো খুলে দেখছে, লাল কি না। লাউয়ের গায়ে নখের চিমটি। বড় কড়াইয়ে জিলাপি ভাজা হচ্ছে। গুড়ের জিলাপি, আহ্ অমৃত। তার পাশে একটা ময়লা কাঠের বেঞ্চে বসে একটা খোকা এক হাতে জিলাপি ধরে আছে, আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, বাবা তাকে বলে গেছে, বসো একনা, আসতিছি, তিনি আর আসছেন না, ছেলের কাজল পরা বড় বড় চোখ জলে ভরে উঠছে। হাতের জিলাপি থেকে রস পড়ছে গায়ে, তার খেয়াল নাই...
রংপুর শহরের সন্ধ্যা আসত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রূপটুকুন নিয়ে। এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে সবচেয়ে করুণ সুন্দর, তার নাম রংপুর। টিনের বাংলোঘর। ইটের দেয়াল। সামনে বারান্দা। প্রতিটা বাসা কারুকার্যময়, টিনের কাঠের জাফরিকাটা নকশা, আর লাল-নীল-হলুদ রঙে একেকটা ছবির মতো ঘর। বাড়ির সামনে বাগান, ঝাউগাছ দিয়ে লেখা বাড়ির নাম, শান্তিবাগ, কাঞ্চনভিলা, মায়ের দোয়া। শজনেডালে হলুদ পাতায় হলুদ রোদ। টিনের চালার ওপরে আমগাছে আমের মুকুল। কী শোভা কী ছায়া গো...। বাতাসে মাদকতাময় গন্ধ। ভ্রমরের গুঞ্জন। কোকিল ডাকছে তো পাড়ার লম্বা খোকা হাফপ্যান্টের নিচে বেঢপ বড় পা ফেলে ফেলে কোকিলটাকে ভেঙাচ্ছে, তার ডাক নকল করছে। ঝুমঝুমি বাজিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে তিলের খাজা। আর ১০ পয়সা, ৫ পয়সার আইসক্রিমওয়ালা তার কাঠের বাক্সের পাল্লা খুলে জোরে জোরে বন্ধ করছে, ধপধপ আওয়াজ মানেই আইসক্রিম।
উঠানে রোদ মরে এসেছে। সেখানে পিঁড়ি পেতে বাড়ির মহিলারা চুল পরিচর্যা করছেন। প্রথমে চুলে তেল দিতে হবে। একজনেরটা দেবেন আরেকজন, ঠিক জয়নুল আবেদিনের ছবির মতো। তারপর চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে ফিতা দিয়ে বিনুনি করতে হবে।
টিনের চালের ওপরে লম্বা লম্বা বাঁশের খুঁটিতে অ্যানটেনা। সেই অ্যানটেনায় একটা ভোকাট্টা ঘুড়ি আটকে আছে। পায়রারা তার উড়ন্ত লেজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দোল খাচ্ছে। নিচে বাচ্চারা, ঘরের মধ্যে টারজান দেখতে ভিড় করছে।
মাঠে মাঠে তখন ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন। কোনো কোনো বাড়িতে হারমোনিয়ামে চলছে গলা সাধা। কয়ে কলা খয়ে খাই। এত বেশি খেতে নাই। ফেরদৌসী রহমানের এসো গান শিখি। রাস্তায় ছুটে চলেছে সাইকেল, মাঝেমধ্যে রিকশা। মোটরসাইকেল কদাচিৎ। একটাও গাড়ি নেই।
সন্ধ্যার আজানের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফেরা। টিউবওয়েলের হাতল ঠেলে পানি তুলে হাত-মুখ ধোও। পড়তে বসো। পড়তেই পড়তেই ডাক। ভাত রেডি। পড়িমরি করে ছুটে যাওয়া খাবার ঘরে। টুলে বসে, পিঁড়িতে বসে, মাদুর পেতে বসে, বেঞ্চে, ডাইনিং টেবিলে বসে, সাধ্যমতো বসা। গরম ভাত, ডালভর্তা; সঙ্গে মরিচ-পেঁয়াজভর্তা। আম্মা, কাতরচোখে তাকালে আম্মা একটা ডিম ভাজতে গেলেন।
উঠোনে হাঁস-মুরগির খোঁয়াড়। মাঝেমধ্যে হাঁসগুলো আর ফিরতে চাইত না জলা থেকে। যাও। হাঁসগুলোকে তাড়া করে আনতে যাও। পুকুরের পাড়ে চার ভাইবোন ঢিল ছুড়ছে। তই তই করে ডাকছে। হাঁসগুলো তবু পুকুর ছেড়ে ওঠে না। শিয়ালে খাবে তো। ওঠ।
‘সন্ধ্যা ঘনায়ে এলো বেলা গেল ঐ
কোথা গেল হাঁসগুলো তই তই তই
সকালে ভাসিয়াছিল, হাঁস ঝাঁকে ঝাঁকে
ডেকেছিল দূর বাঁকে, পাঁক পাঁক পাঁক।
সারা দিন বয়ে গেল,
এখনো না ফিরে এলো
কোথা ডাকি কই গেল, কার
কাছে কই,
কই গেলে আয় আয় তই তই তই।’
সন্ধ্যা ঘন হচ্ছে। ভাত খাওয়া, চোখ ঘুমে বুজে আসছে। টেলিভিশনে হচ্ছে হিজল-তমাল। রেডিওতে দুর্বার। সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান। হাবিবুর রহমান জালাল ও তাহমিনা। এই গানটা শুনতে চেয়েছেন যশোর থেকে ল্যান্স নায়েক...
রাত আটটায় আটটার খবর। বিটিভিতে। সপ্তাহে একটা এ সপ্তাহের নাটক। প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর ধারাবাহিক নাটকের একটা পর্ব। এই সপ্তাহে ‘এইসব দিনরাত্রি’ তো ওই সপ্তাহে ‘শুকতারা’। ‘সকাল সন্ধ্যা’ ছিল হিট। তারপর ‘এইসব দিনরাত্রি’। তারপর ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’। ‘কোথাও কেউ নেই’।
সেই শান্ত নিরিবিলি গ্রামগুলো উঠে গেল। সেই ছবির মতো মফস্সল শহর হারিয়ে গেল। ভিসিআর এল। ভিসিপি এল। তারপর মোবাইল ফোন। এখন আর সন্ধ্যা আসে না পৃথিবীতে। পাড়া বেড়ান না গৃহিণীরা, তাঁদের মুখে পান আর হাসি। প্রতিটা লাইটপোস্টে চুনের দাগ। প্রতিটা কোনায় পিকের দাগ। তারও আগে তো মহিলারা বেরোতেন রিকশায় শাড়ি পেঁচিয়ে। বেড়াতে যাওয়া একটা বিশেষ কাজ ছিল। আমি তো রিকশায় পিঁড়ি নিয়ে আম্মাদের পায়ের কাছেও বসেছিলাম।
সন্ধ্যা মানে রুপালি হলে, ওরিয়েন্টাল প্রেক্ষাগৃহে ইভিনিং শো। টিকিট কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য। অবাক পৃথিবী নামের রাজ্জাক-কবরী অভিনীত একটা সিনেমা এসেছিল, কী যে ভিড় হলো হলে। হলের সামনে বাদামওয়ালার ল্যাম্পোর বড় বড় শিখা। এক পাশে সেদ্ধ ডিম লাল করে রেখে বিক্রি করছে আরেক দোকানি, ওই লাল ডিম কে খায়?
সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে রাত হয়। গ্রামের বাড়িতে হাট থেকে ফিরছি। পায়ে একহাঁটু ধুলা। কান্না পাচ্ছে। এই যে দাদা মাছ কিনেছেন, এগুলো নিয়ে বাড়ি যাব দেড় মাইল হেঁটে, তারপর রান্না হবে, তারপর খাওয়া।
বাড়ি গিয়েই ঘুম। একটু পরে আম্মা বালতিতে পানি এনে বিছানাতেই আমাদের পা ঝুলিয়ে ধুয়ে গামছা দিয়ে মুছে দিলেন। আরও খানিক পরে বিছানায় ঘুমের মধ্যে টেনে তুলে বালিশে বসিয়ে দিয়ে মুখের মধ্যে পুরতে লাগলেন ভাতের লোকমা।
আম্মা নেই। আব্বা নেই। শৈশব নেই। সন্ধ্যা নেই। বিকেল নেই। গনগনে দুপুর নেই। দুপুরে আমগাছের নিচে মাদুর বিছিয়ে রেডিওতে গানের ডালি নেই। গোলাপি এখন ট্রেনে নেই। নানি ওগো নানি বলি যে আমি নেই।
তবু সন্ধ্যা আসছে। আকাশে ঝাঁক বেঁধে উড়ছে টিয়াপাখি, নীড়ে ফিরছে। কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতে যানজট। বড় বড় দোতলা বাস, গাড়ি, সিএনজিচালিত সবুজ অটোরিকশা, মোটরবাইক থমকে আছে। রাস্তা খুঁড়ে চলছে মেট্রোরেলের কাজ। বাড়ি ফেরার আকুলতা আর অফিসের হিসাবের খাতা মেলানোর উদ্বেগ নিয়ে বাসের সিটে বসে আছেন করুণ যাত্রী।
আমার মনের মধ্যে গান:
হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো
পার করো আমারে
তুমি পারের কর্তা জেনে বার্তা
তাই ডাকি তোমারে
আমি আগে এসে
ঘাটে রইলাম বসে
যারা পাছে এলো আগে গেল
আমি রইলাম পড়ে
শুনি কড়ি নাই যার
তারে তুমি করো পার
আমি দীনভিখারি নাইকো কড়ি
দেখো ঝুলি ঝেড়ে
আমার পারের সম্বল
তোমার নামটি কেবল
কাঙাল ফিকিরচাঁদ কেঁদে
অকূল পাথারে সাঁতারে
কিছুই তো হলো না। কিছুই তো করলাম না। সব হারিয়ে নিজের জীবনের সন্ধ্যার অপেক্ষা। করোনাকালে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী শিক্ষকদের চলে যেতে দেখে দেখে বুকটা পাষাণ হয়ে গেছে। চোখের জল শুকিয়ে লবণ।
তবু তো প্যাঁচা জাগে। গলিতে স্থবির ব্যাঙ আরও দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে।
মন কেমন করে। যাকে কোনো দিন পাব না, সেই চির-অপ্রাপনীয়ার জন্য হাহাকার করে ওঠে মন। তখন নির্মলেন্দু গুণের কবিতা আবৃত্তি করি:
সারাদিন তবু কাটে সন্ধ্যা ঠেকে যায়।
ভালোবাসাহীন তবু বাঁচি, ভালোবাসা পেলে মরে যাই।
সন্ধ্যা ও ভোর দুটোই তো প্রদোষ। টোয়াইলাইট। ভোর আশা জাগায়। কারণ, ভোর ডেকে আনে দিন। সন্ধ্যা মানেই মন খারাপ করা একটা সময়। কারণ সন্ধ্যা আনে রাত, অন্ধকার, অনিশ্চয়তা। অজানাকেই যে আমাদের ভয়। যেমন ভয় মৃত্যুকে।
প্রতিটা সন্ধ্যা মানে মৃত্যু।
কিন্তু তবু সেই সব সন্ধ্যাকে হারিয়ে কাঁদি। যখন ভাইবোন হুটোপুটি, লুটোপুটি করে এক মাদুরে বসে গরম-গরম ভাত খেতাম, আম্মা কড়াই থেকে ভাজনিতে তুলে এনে পাতে ঢেলে দিতেন একটা ডিমের চার ভাগের এক ভাগ অমলেট।
জিরার গুঁড়া আর হলুদ দিয়ে ভাজা সেই হাঁসের গরম ডিমের একটিমাত্র টুকরার বিনিময়ে কি আমার পুরোটা জীবন তুলে দিতে রাজি নই?
সমস্ত দিনের শেষে যেখানে টিনের ছাদে আমগাছ থেকে ঝরে পড়ে সত্যি শিশির শব্দ করত। যেখানে লেজে রোদের চিহ্ন মুছে নিত ঘুড়ি। যেখানে শীতের সন্ধ্যায় গামলায় করে জ্বলন্ত কয়লা পায়ের কাছে নিয়ে বসতে হতো। যেখানে সন্ধ্যায় কোলাহল উঠত ঘরে ফেরার আর হঠাৎ করেই চরাচর স্তব্ধ করে দিয়ে নেমে আসত হিমরাত, যখন শিয়ালের ডাক আর কুকুরের ঘেউ ঘেউ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যেত না চরাচরজুড়ে।
তখনো পাড়ার রাস্তায় পাহারাদারেরা চিৎকার করে উঠত: হেই কে যায়?
সেকেন্ড শো দেখে ফেরা রিকশাযাত্রী চাদর টেনে নিয়ে নিজের কান ঢাকত।
আর পাড়ার একমাত্র মাতাল লোকটা প্রলাপ বকতে শুরু করলে ভয়ে লেপের নিচে পা বেঁকে আসতে চাইত।
ঘুম এসো ঘুম।