মায়ের রান্নাঘর

শৈশব আমাদের সবার জীবনের সবচেয়ে রঙিন সময়। তখনকার ঈদ ছিল আরও রঙিন ও আনন্দময়। বড় হওয়ার পর শৈশবের ঈদকে আমরা খুঁজে ফিরি। বন্ধুসভার বন্ধুরা লিখেছেন শৈশবের সেই ঈদ নিয়ে।

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

আগের রাতেই অ্যালুমিনিয়ামের বড় হাঁড়িগুলো ধোয়ামোছা শুরু হতো। বছরে এই এক-দুবারই হাঁড়ি-পাতিলগুলো কিছু খাদ্য পেত। দা-বঁটিগুলোও অন্তত দুদিন আগে কামারের দোকান থেকে ধার করে আনা হতো।

ঈদের দিন সকালে উঠে আমরা যখন গোসল করে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিতাম, তখন মা-বোনেরা মিলে মসলা আর পেঁয়াজ- মরিচ রেডি করতে শুরু করত। চুলায় থাকত পাঁচ পদের ডালের পাতলা খিচুড়ি আর পোলাও। টেবিলে সাজানো থাকত ঘন করে জাল দেওয়া দুধে রান্না করা দুধসেমাই।

আব্বা আর অংশীদারেরা মিলে এরই মধ্যে গরুকে গোসল করিয়ে শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত করে ফেলতেন। আমরাও নতুন পাঞ্জাবি পরে সদ্য গোসল করানো গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতাম। গরুটা হাম্বা ডাকে আমাদের আদরে সাড়া দিত। কখনো কখনো গরুর চোখের পানি গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়তে দেখতাম। মনে মনে ভাবতাম, গরুটা বোধ হয় ওর মৃত্যুর খবর জেনে গেছে। তারপর মন খারাপ করে ঈদগাহে গিয়ে নামাজটা পড়েই বাসার দিকে ভোঁ-দৌড়! পাছে আমাকে ছাড়াই আবার গরু জবাই হয়ে যায়!

মূল আগ্রহের জায়গা থাকত কার কার নামে কোরবানি হচ্ছে। এবার কি গরুটা জবাই করার সময় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াবে? ভয়ে ভয়ে দূর থেকে দেখতাম। একসময় গরুর চামড়া ছিলে মাংস রান্নার জন্য ছোট ছোট টুকরা হয়ে যেত। সবার আগে কলিজার অংশটা ভাগ করে কিছু অংশ রেখে বাসার ভেতরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সকালের কাটা পেঁয়াজে বাকি মাংস আসার আগেই সেই কলিজা পরম মমতায় বেশি করে পেঁয়াজ দিয়ে ভুনা করে ফেলতেন মা।

জোহরের আগেই সব কাটাকুটি শেষ হয়ে যেত। এবার আগের রাতে ধুয়েমুছে রাখা হাঁড়ি-পাতিলগুলো ব্যবহারের পালা। সবটুকু মাংস বোঝাই করে ঘরে নিয়ে শুরু হতো বণ্টনপ্রক্রিয়া। সবার ভাগ শেষ হয়ে নিজেদের অংশ নির্ধারণ হওয়ামাত্র মা-বোনেরা সেগুলো হালকা লবণ আর হলুদ মিশিয়ে প্রতিটি হাড়িতে আলাদা করে কিছু চর্বি দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিতেন। রাত অবধি এ কাজ চলত। মাংসগুলো সেদ্ধ হয়ে গেলে সেগুলো বড় বড় প্লাস্টিকের জালি ঢাকনা দিয়ে ফ্যানের নিচে ঠান্ডা করতে দেওয়া হতো। চর্বি আর মাংস ঠান্ডা হয়ে জমে গেলে মায়ের বুকটাও যেন ঠান্ডা হতো। তাঁর আপাতত কাজ শেষ।

এবার জলকান্দার (পাত্র রাখার জন্য মাটির তৈরি একধরনের স্ট্যান্ড, যেখানে দুটো খোপ থাকত। এক খোপ একটু উঁচু—যেখানে মূল পাত্রটা রাখা হতো। আরেকটা বড় খোপ যেটাকে ঘিরে রাখত, যাতে পানি দিয়ে রাখা হতো। যেন পিঁপড়া মূল পাত্রে উঠতে না পারে। অনেকটা দুর্গের চারপাশে পরিখা খননের মতো) ওপর সে পাত্র রেখে দেওয়া হতো। প্রতিদিন সেখান থেকে প্রয়োজনীয় মাংস আলাদা করে উঠিয়ে নিয়ে রান্না করতেন মা। মূল যে মাংস, সেগুলোও প্রতিদিন একবার গরম করা হতো। একসময় সেগুলোর কয়েকটা এমন সেদ্ধ হতো যে মন চাইলেই দুই-তিন টুকরা তুলে নিয়ে আলাদা করে হলুদ-মরিচ মেখে তেলে ভেজে ভাতের সঙ্গে খেতাম। ভাজা মাংসের সঙ্গে ভাত খেতে খেতে মনে হতো, যেন আমি কোনো ওয়েস্টার্ন গল্পের নায়ক! মাত্র র‍্যাঙ্ক থেকে আনা গরুর মাংস ভেজে খাচ্ছি!

এই যে মায়েদের এত মহাযজ্ঞ চলত, এর কারণ, তখনো দেশে ঘরে ঘরে ফ্রিজের আগমন ঘটেনি। এখন তো ঘরে ঘরে ফ্রিজ! তা-ও একাধিক। মাংস খাওয়ারও নানা কায়দাকানুন ইউটিউবে দেখা যায়। কিন্তু ছোটবেলার সেই কোরবানির আনন্দ কিংবা দীর্ঘদিন জ্বাল দেওয়া গরুর মাংস তেলে ভেজে খাওয়ার স্বাদ তো আর নেই! আমাদের কোরবানি এখনো আছে, কিন্তু সেই আনন্দ আর নেই। কারণ মা-ই তো নেই!