ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে ঐতিহ্যের সাক্ষী কেরামতিয়া বড় মসজিদ
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দোলাপাড়া গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক কেরামতিয়া বড় মসজিদ। স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি ‘ভাঙ্গা মসজিদ’ নামেও পরিচিত। বড়খাতা ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট এলাকায় অবস্থিত এই প্রাচীন স্থাপনা শুধু ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, বরং সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলের ইতিহাস ও জনবিশ্বাসের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, মসজিদটির বয়স ৮০০ বছরের কাছাকাছি। বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রাথমিক বিস্তারের সময়কাল, অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুসলিম শাসক ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বঙ্গজয়ের পর এ অঞ্চলে ইসলামের প্রসারের ধারায় মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে বলে মত পাওয়া যায়। তবে এর সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল নিয়ে নির্ভরযোগ্য লিখিত ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনো স্পষ্ট নয়।
স্থানীয় লোকজনের বর্ণনা ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, মোগল আমলে কেরামতিয়া নামে এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব বা দরবেশ মসজিদটি সংস্কার করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর মসজিদের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর নাম অনুসারেই মসজিদটি পরবর্তীকালে ‘কেরামতিয়া মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এসব তথ্য মূলত লোকমুখে প্রচলিত বিশ্বাস, যার ঐতিহাসিক দলিলভিত্তিক নিশ্চয়তা সীমিত।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর মসজিদটি ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তরেখার একেবারে জিরো পয়েন্টে পড়ে যায়। ফলে এর ভৌগোলিক অবস্থান ঘিরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন সময় আলোচনা ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
স্থানীয় লোকজনের মতে, একসময় দুই দেশের সীমান্তবর্তী মুসল্লিরা একই সঙ্গে এ মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সীমান্ত নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে সে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে প্রতি শুক্রবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এখানে জুমার নামাজ আদায় করতে আসেন। নারীদের জন্যও পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে।
২০১১ সালে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে সীমান্ত আইনসংক্রান্ত কিছু জটিলতা থাকলেও পরবর্তীকালে দুই দেশের প্রশাসনিক অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদটিকে আধুনিক নকশায় দোতলা ভবন হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
মসজিদে আগত মুসল্লি আনিছুর রহমান বলেন, এখানে প্রতি শুক্রবার মানুষের ঢল নামে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে, অনেকেই মানত করে দান-সদকা করেন।
মসজিদের ইমাম আবু সাইদ জানান, বর্তমানে একসঙ্গে দুই থেকে তিন হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। তিনি বলেন, মসজিদটিকে আরও উন্নতভাবে সংরক্ষণ ও আধুনিকায়ন করা গেলে এটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সীমান্তের এই প্রাচীন মসজিদ আজও ধর্মীয় আবেগ, ইতিহাস ও জনবিশ্বাসের এক অনন্য মিলনস্থল হিসেবে টিকে আছে, যা স্থানীয় লোকজনের কাছে শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান এক জীবন্ত ঐতিহ্য।
বন্ধু, লালমনিরহাট বন্ধুসভা