বৃক্ষের প্রতি প্রেম আর বন্ধুসভার বন্ধু
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে বৃক্ষ হাতে ছুটতে ছুটতে অনেকের কাছে আজ আমি ‘বৃক্ষবন্ধু শাকির'। ছোটবেলা থেকেই চারপাশের মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার টান অনুভব করতাম। স্বপ্ন দেখতাম এমন এক সমাজের, দেশের—যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। হয়তো এ কারণেই ছেলেবেলা থেকেই বৃক্ষের প্রতি আলাদা মনোযোগ ছিল। তখন থেকে গাছ লাগানো ও গাছের পরিচর্যার চেষ্টা করা শুরু। যদিও বৃক্ষ হাতে স্বতন্ত্র পথচলা আমার; তবে এই পথচলার অনুপ্রেরণায় অনেক বেশি শক্তি দিয়েছে প্রথম আলো বন্ধুসভা।
বন্ধুসভায় যোগ দেওয়ার উৎসাহ পাই প্রথম আলো ছাপা কাগজে প্রকাশিত বন্ধুসভার বিভিন্ন কাজের খবর দেখে। বলা চলে, বন্ধুসভার সৃজনশীল কাজগুলোয় ভালো কাজের প্রতি আমার আগ্রহকে ভালোবাসায় পরিণত করে।
২০০৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। বন্ধুসভায় যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে ঢাকা অফিসে ফোন করি। কথোপকথন শেষে ঢাকা অফিস থেকে প্রথম আলো সিলেট অফিসের উজ্জ্বল মেহেদী ভাইয়ের মোবাইল নম্বর দেওয়া হয় এবং যোগাযোগ করতে বলা হয়। কিন্তু তখন আর যোগাযোগ করা হয় না। এরপর একদিন সুযোগ আসে। বন্ধুসভা আয়োজিত ‘বদলে দাও বদলে যাও’ শপথ গ্রহণে অংশ নিতে উজ্জ্বল মেহেদী ভাইকে কল করি। উজ্জ্বল ভাই জানান, অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হলে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। ফরম নিতে হবে কলেজ থেকে। তখন আমি এমসি কলেজের শিক্ষার্থী। এই সূত্র ধরে এমসি কলেজ বন্ধুসভার তৎকালীন সভাপতি রাশেদ আহমেদ ভাইয়ের খোঁজ পাই। ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের পর এমসি কলেজ বন্ধুসভার আরও অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারপর ধাপে ধাপে যুক্ত হই বন্ধুসভার সঙ্গে।
২০১৩ সালে বন্ধুসভার কেন্দ্রীয় সমাবেশে ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। পরের বছর ২০১৪ সালে সিলেটে আয়োজন হয় বন্ধুমেলার। এটিই বন্ধুসভার বড় কোনো আয়োজনে বন্ধুসভার বন্ধু হিসেবে প্রথম সরাসরি অংশগ্রহণ আমার। কথা প্রসঙ্গে সিলেট বন্ধুসভার তৎকালীন সভাপতি মোমেন মিয়া ভাই সেদিন বলেন, ‘আজ থেকে তুমিও সিলেট বন্ধুসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।’ তা ছাড়া ১৪ ডিসেম্বর সিলেট বুদ্ধিজীবী কবরস্থান পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ছিল। ভাই একটি ভালো কাজের অংশ হওয়ার জন্য বলেন। আমি বেছে নিই বৃক্ষরোপণ। ৭টি ফুলের চারা এবং সোলা দিয়ে স্মৃতিসৌধ তৈরি করে স্মৃতিসৌধে হাজির হই। সেদিন রোপণ করা ৭টি চারার ২টি জবা ও ১টি রঙ্গন ফুলগাছ আজও টিকে আছে।
সিলেট এমসি কলেজ বন্ধুসভা থেকে সিলেট বন্ধুসভা। তারপর আমার দায়িত্বের ক্ষেত্র বিস্তৃত হয় ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক হিসেবে। ঢাকা ছেড়ে আসার পর বন্ধুসভার কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও হৃদয় দিয়ে সব সময় ভালোর সঙ্গে, আলোর পথে আছি।
২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর। আমার জীবনে বৃক্ষরোপণের একটি বিশেষ দিন। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিই বৃক্ষরোপণ এবং বৃক্ষের যত্ন ও পরিচর্যায় অবিরাম ছুটে চলার। শুরু হয় বৃক্ষরোপণে আমার আনুষ্ঠানিক যাত্রা। সেদিন পছন্দের মানুষের জন্মদিনকে উপলক্ষ করে একটি কদমগাছ রোপণ করি। মানুষটা হয়তো আমাকে পছন্দ করতে পারেনি। কারণ, বৃক্ষরোপণ নিয়ে বা ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার বিষয়টা তাঁর বন্ধুবান্ধবের অপছন্দ ছিল। এটা ঠিক যে মানুষটার ভালোবাসা হয়তো পাইনি, পাইনি মানুষটাকেও; কিন্তু বৃক্ষ আমাকে ভালোবেসে সঙ্গী হয়ে আছে আজও। পাশাপাশি পেয়েছি অগণিত মানুষের ভালোবাসা।
২০২০ সালে চাঁদপুর বন্ধুসভার বন্ধু জান্নাতুল সুপ্ত বৃক্ষবন্ধু নাম দেয় আমাকে। তার পর থেকে বন্ধুসভার সাবেক সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের কবির তুষার ভাই ‘বৃক্ষবন্ধু শাকির, আমাদের শাকির’ বলে সবখানে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করেন। সেই থেকে অনেকের কাছে আমি বৃক্ষবন্ধু শাকির। পরিচয়টা বেশি প্রতিষ্ঠা পায় বন্ধুসভায় যুক্ত থাকার সুবাদে। বৃক্ষের প্রতি প্রেম আর বন্ধুসভার বন্ধু, মিলেই যেন হয়েছে বৃক্ষবন্ধু।
আজ পর্যন্ত অনেক সংগঠনের সঙ্গেই কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমি বন্ধুসভার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। আনুষ্ঠানিকভাবে সাংগঠনিক যাত্রায় বন্ধুসভাই ছিল আমার শুরু, আর এটাই থাকবে শেষ। এটাই আমার ভালোবাসা, আমার সবুজ পৃথিবী রক্ষার শপথের ঠিকানা।
সিলেট সদর, সিলেট