পাঠচক্র ও ভৈরব বন্ধুসভার জাগরণ
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
ভৈরব একসময় সংগঠনের শহর ছিল। পরবর্তী সময় সাহিত্যচর্চার প্রতি তরুণদের আগ্রহ সৃষ্টির পেছনে সংগঠনগুলো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন সংগঠন থেকে উঠে আসা অনেকে ভৈরবের নানা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। কিন্তু কষ্টের হলো, বর্তমানে দুটি ছাড়া অন্যগুলো অস্তিত্ব হারিয়েছে। নাট্য ও আবৃত্তি সংগঠনগুলো এখন আর নেই। সংগীত বিদ্যালয়গুলো ধুঁকছে। এ সময়ে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে পাঠাগারে। ভৈরবে এখন আর কোনো পাঠাগার সচল নেই। বাণিজ্যিক বইয়ের দোকানে গাইড ও পাঠ্যবই সাহিত্যের বইয়ের তাক দখল করে নিয়েছে। বলা যায়, পাঠাগার না থাকায় ভৈরবে দলগতভাবে বই পড়া কিংবা বই আদান-প্রদানের সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তপ্রায়।
ভৈরবে সাহিত্যের বই পাওয়া যখন কঠিন হয়ে পড়ছিল, এমন বাস্তবতায় বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্যদ থেকে সারা দেশে পাঠচক্রে মনোযোগ বাড়ানোর তাগিদ আসে। সময়টি ২০১৬ সাল হবে। কেন্দ্রীয় পর্ষদের তৎকালীন সভাপতি সাইদুজ্জামান রওশন ভাই বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতেন। পাঠচক্রের প্রয়োজন বোঝাতেন। ভৈরবসভার সেই সময়কার সভাপতি মফিজুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক জনি আলমও এই প্রয়োজনে সায় দিলেন। সিদ্ধান্ত হয় ভৈরবসভার সাংগঠনিক ভিত পাঠচক্রকে গুরুত্ব দিয়ে রচিত হবে। সেই থেকে ভৈরবসভার প্রাথমিক সদস্য পেতে টানা তিনটি পাঠচক্রে উপস্থিত থাকার নিয়ম করা হয়। বিরতি থাকলে নতুন করে তিনটি পাঠচক্রের উপস্থিতির হিসাব মেলাতে হবে। তবেই মিলবে চূড়ান্ত সদস্যপদ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এই পাঠচক্রকে ঘিরে কয়েক বছরের মধ্যে আশপাশে ভৈরব বন্ধুসভার সাংগঠনিক দ্যুতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বই পড়ার মতো কঠিন কাজটি আনন্দদায়ক করে তুলতে পারায় ভৈরবসভা হয়ে ওঠে মর্যাদাপূর্ণ একটি সংগঠন। দেশের বিভিন্ন বন্ধুসভাও পাঠচক্রের বিষয়ে ভৈরবসভার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়।
প্রতিবছর বইমেলায় সেরা স্টলের স্বীকৃতি, বিতর্ক, সাধারণ জ্ঞান, কবিতা পাঠের আসর, রবীন্দ্র, নজরুল, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণ আর দেয়ালিকা প্রকাশের মতো সাহিত্যনির্ভর অসংখ্য আয়োজন সফল করার পেছনের শক্তির উৎস কিন্তু পাঠচক্র। এককথায় ভৈরবসভার আজকের সাংগঠনিক শক্ত অবস্থান ও তারুণ্যের উচ্ছ্বাস পাঠচক্রকে ঘিরেই।
একটি সত্য সামনে আনা জরুরি। পাঠচক্রের গতি আসার পেছনে প্রথম আলোর ভৈরব অফিস বড় ভূমিকা রেখে আসছে। পাঠচক্রের আসর বসে অফিসে। স্থান নিয়ে ভাবতে হয়নি। অভিভাবকদেরও আস্থা বাড়ে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে আঙুল ধরে নিয়ে এসে বলেন, ‘আমার সন্তানকে পাঠচক্রে দিয়ে গেলাম।’ অফিসে সর্বোচ্চ ৪০ জনের বসার সুযোগ রয়েছে। তাই চেয়ার পাবে না জেনেও অনেকে মেঝেতে বসে কয়েক ঘণ্টার আলোচনা শোনে।
বর্তমানে শহরে ভৈরবসভার কর্মীদের আলাদা পরিচয় গড়ে উঠেছে। ভৈরবসভার প্রতি মানুষের অনেক প্রত্যাশাও বেড়েছে। একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। কলেজের ক্লাসে বেশ কয়েকজন শিক্ষক বন্ধুসভার কর্মীদের ‘এই বন্ধুসভা’ বলে ডাকেন। বন্ধুসভার কোনো কর্মী যদি প্রশ্নের প্রত্যাশিত উত্তর দিতে ব্যর্থ হন, তখন অনেক শিক্ষক বলেন, ‘তোমরা না বন্ধুসভা করো। বই পড়ো। প্রশ্নের উত্তরটি পারা উচিত ছিল।’ শহরে সাহিত্যনির্ভর কোনো আয়োজন হলে আয়োজকেরা বন্ধুসভার কর্মীদের উপস্থিতি প্রত্যাশা করেন। এ জন্য আমার কিংবা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করে নিজেদের চাহিদার কথা জানান।
কয়েক বছর ধরে পাঠচক্রের প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আগ্রহ বাড়ছে। আগ্রহের কারণে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে পাঠচক্রের আসর শুরু করতে হয়েছে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠের আসর হয়নি, সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পাঠচক্র আসরের অপেক্ষায় আছে।
বন্ধুসভার উদ্যোগে পাঠচক্র নিয়ে ছোট্ট শহরে এমন জাগরণ প্রথম আলো পরিবারের একজন হিসেবে আমার মধ্যে এক অন্য রকম ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায় খারাপ হয়ে যাওয়া মনটিও পাঠচক্রের এমন জাগরণ দেখে ভালো হয়ে যায়।
পাঠচক্রের শুরুটা কিন্তু সহজ ছিল না। শুরুর আসরগুলোয় ১০ থেকে ১২ জনের বেশি বন্ধু পেতাম না। বই সংগ্রহে কষ্ট হতো। বই কেনার অর্থ জোগান নিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে। একপর্যায়ে ঢাকা থেকে অনলাইনে অর্ডার করে প্রত্যাশিত বই সংগ্রহ করা শুরু করতে হয়। কাজটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে একপর্যায়ে পাঠচক্রের পথ মসৃণ করতে আমরা নিজেরা প্রথম আলোর অফিসে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার গড়ে তুলি। পাঠাগারে বর্তমানে ৬০০ বই রয়েছে। পাঠাগার পাঠচক্রে গতি আনে। বিশেষ করে ২০১৬ সাল থেকে আমরা পাঠচক্রের সংখ্যা কাউন্ট করতে শুরু করি। কিছু পাঠচক্রের ফেসবুক লাইভ করতে থাকি। লাইভ পাঠচক্রগুলো ভিউ বিবেচনায় দারুণ সাড়া পাওয়া যায়। সব কমেন্ট ইতিবাচক।
একটি তথ্য জানাতে চাই, বর্তমানে আমাদের পাঠচক্রের সংখ্যা ২০৪। পাঠচক্র নিয়ে আমার বিশেষ ভালো লাগা, সব কটি পাঠচক্রে উপস্থিত ছিলাম।