স্মৃতির বৈশাখ, হারানো মেলা
পয়লা বৈশাখ এলেই যেন শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের মনে আনন্দের হাওয়া বয়ে যায়। চৈত্রসংক্রান্তির রাত শেষে সকালবেলার সূর্যের প্রথম কিরণ বাড়ির উঠানে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেলা থেকে সানাইয়ের সুরে পাখিরা উড়ে যেত শূন্য আকাশে আর আমরা ছুটতাম মেলার দিকে, যা এখনো স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে আছে।
নতুন পোশাকের লাল-সাদা রঙে ভরা সেই আনন্দ। সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে নতুন পোশাক পরে বন্ধুদের নিয়ে হইহুল্লোড় করে বের হতাম বৈশাখী মেলার উদ্দেশে। শৈশবে বৈশাখে আমরা বন্ধুদের চিঠি লিখতাম, খাম ছাড়া সাদা কাগজে। চিঠি দেওয়া বা তার জবাব পাওয়াটা ছিল অসীম আনন্দের। লিখতাম, সবাই যেন ঈদের দিনের মতো একে অপরের বাড়িতে আসে এবং রঙিন পোশাকে একসঙ্গে ঘোরাঘুরি ও আনন্দ উদ্যাপন করে। সবাই আসত, আনন্দ করতাম।
এখন আর বন্ধুদের কাছে চিঠি পাঠানো হয় না। তারা এখন দূরে। স্মৃতিতে জমা হয়ে আছে। মেলার সেই ধুলামাখা পথ, চারদিকে মানুষের উৎসবমুখর কোলাহল আর মাটির সোঁদা গন্ধ—সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি হতো। মেলার প্রবেশপথেই চোখে পড়ত সারি সারি বিভিন্ন ধরনের দোকান। যেখানে মাটির তৈরি পুতুল, ঘোড়া, বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন ধরনের প্রাণী, পশুপাখি আর শখের হাঁড়িসহ নানা ধরনের দৃষ্টিনন্দন জিনিস। দোকানদারদের বাঁশির শব্দে অতিষ্ঠ হলেও সেই সময় শব্দটা শোনার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে থাকত। পকেটে থাকা জমানো কিছু টাকা দিয়ে মাটির ব্যাংক, রঙিন কলম, সুরলিত কণ্ঠের পাখি কিংবা প্লাস্টিকের চশমা কেনার সেই তৃপ্তি, এখনকার সময়ে দামি শপিং মলে গিয়ে কেনাকেটা করলেও আনন্দ লাগে না।
এ ছাড়া মেলার বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে। মাটির পেয়ালায় পান্তা-ইলিশ খাওয়ার তৃপ্তি স্মৃতির চেয়েও মধুর। মেলাতেও হরেক রকমের স্বাদের খাবার ছিল, তার মধ্যে কদমা, বাতাসা, মুরলিসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার। বেশি আকৃষ্ট হতাম গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাইয়ের প্রতি, যা মুখে দিলেই হাওয়া হয়ে যেত।
গ্রামের বাজারের ব্যবসায়ীরা পাওনাদারদের কাছে বাংলা নববর্ষের শেষ দিকে এবং পয়লা বৈশাখের আগে চিঠি পাঠাতেন পাওনা টাকা আদায়ের জন্য। এটি আমাদের বাঙালি সমাজে পুরোনো সংস্কৃতি, যা এখনো হারিয়ে যায়নি। সবকিছু শেষে দুপুরের কড়া রোদে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরলে খাবারদাবার শেষে আবার বিকেলের দিকে যখন কালবৈশাখীর গোধূলী মেঘ জমত আকাশে, তখন বাতাসের তীব্রতায় আম কুড়ানোর ধুম পড়ত বন্ধুদের নিয়ে।
বর্তমান আধুনিকতার যুগে, উৎসবের ধরন বদলে গেছে। পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। আমাদের গ্রামে পয়লা বৈশাখে এখন আর মেলা বসে না। সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে অজানা কোনো গন্তব্যে, সেই সঙ্গে আমাদের আনন্দও। কিন্তু স্মৃতিতে গেঁথে থাকা, রঙিন বৈশাখ আজও মনের কোণে অম্লান হয়ে আছে। সেই মেলা, সেই বাঁশির সুর আর শৈশবের দিনে মেঠো পথের গন্ধটাই যেন এখন প্রকৃত পয়লা বৈশাখ হয়ে আছে জীবনে।
বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা