সমাবেশের তিনটি দিন সারা জীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে

জাতীয় বন্ধু সমাবেশে প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক ও গীতিকবি কবির বকুলের সঙ্গে ফেনী বন্ধুসভার বন্ধুরাছবি: লেখকের সৌজন্যে

২০২০ সালের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় বন্ধু সমাবেশ। এরপর ২০২২ সালে হওয়ার কথা ছিল এর ষষ্ঠ আসর। কোনো না কোনো প্রতিবন্ধকতা ও নানা কারণে সেটি আর হয়নি। ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও শুনেছিলাম হবে, কিন্তু হয়নি। অবশেষে যখন ঘোষণা হলো ২৫, ২৬ ও ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, গাজীপুরের মৌচাক জাতীয় স্কাউট প্রশিক্ষণকেন্দ্র মাঠে অনুষ্ঠিত হবে ষষ্ঠ জাতীয় বন্ধু সমাবেশ, মনে সে কী আনন্দ!

ফেনী বন্ধুসভার কতজন বন্ধু যাওয়ার সুযোগ পাবেন, এ নিয়ে শুরু হলো চিন্তা। সেই তালিকায় আমার জায়গা হবে তো! শেষ পর্যন্ত জায়গা হয়। ১৮ ডিসেম্বর রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে ফেলি। কিন্তু পরদিন ১৯ ডিসেম্বর সকাল ছয়টায় নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। জানতে পারি, দুর্বৃত্তরা প্রথম আলো বন্ধুসভার অফিসে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। মনে হলো এবারও হয়তো বন্ধু সমাবেশ আর হচ্ছে না!

রাতে প্রোগ্রাম শেষে তাঁবুর সামনে।

মন অনেক খারাপ হয়ে গেল। তবু মনের কোথায় যেন একটু আশা ছিল, এবার প্রোগ্রাম হবেই হবে। ২১ ডিসেম্বর সকালে তৌহিদ ইমাম ভাইকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করি, কোনো সিদ্ধান্ত হলো কি না। ভাইয়া বলেন, ‘আজ সিদ্ধান্ত হবে, অপেক্ষা করুন।’ ২২ ডিসেম্বর সকালেই ঘোষণাটা চোখে পড়ে, যথাসময়ে হচ্ছে ষষ্ঠ জাতীয় বন্ধু সমাবেশ ২০২৫।

সবকিছু পুড়ে যাওয়ার পরও ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ বন্ধু সমাবেশ করবে, বিস্মিত হলাম! সেই সঙ্গে আবার শুরু করলাম সমাবেশে যাওয়ার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি। সবাই যোগাযোগ করে কীভাবে যাবে ট্রেনে, নাকি বাসে। দিন যত যাচ্ছে, আনন্দ বাড়তে থাকে।

২৫ ডিসেম্বর মধ্যরাত ১টা ৪০ মিনিটে বাসে করে গাজীপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি, সকাল আটটায় মৌচাক স্কাউট মাঠে পৌঁছে যাই। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সামনে এগোতে এগোতে দেখি সবাই ব্যস্ত—কেউ রান্নার কাজে, কেউ মঞ্চ সাজানোতে, কেউ তাঁবুর কাজে। দূর থেকে দেখতে পাই, মাঠের একপাশে জাফর সাদিক ভাই, ফরহাদ মল্লিক ভাই, শাকিব ভাই। কাছে গিয়ে দেখা করি এবং আমাদের তাঁবু নম্বর কত জিজ্ঞেস করি। আমাদের তাঁবু নম্বর ৬৮।

আমাদের তাঁবু নম্বর ৬৮।

মাঠ থেকে এবার গন্তব্য তাঁবুর দিকে। বন্ধু তারেক তাঁবুর ভেতর খড় বিছানো শুরু করে, অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা। একটু বিশ্রাম নিয়ে অন্যান্য তাঁবুর কাঁছে যাওয়া শুরু করলাম। দীর্ঘ ৪ বছর ১০ মাস ১১ দিন পর আবারও সবার সঙ্গে দেখা। আনন্দের মাঝে ভুলে গেলাম শীতের তীব্রতার কথা।

বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অন্য তাঁবুগুলোতে বিভিন্ন বন্ধুসভার বন্ধুরা আসতে শুরু করেন। আমরাও খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলাম—কে, কীভাবে এলেন, কোনো সমস্যা হলো কি না ইত্যাদি।

সন্ধ্যায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রাতে প্রোগ্রাম শেষে তাঁবুর সামনে ফায়ার ক্যাম্প, গান, কবিতা, আড্ডা, আনন্দের শেষ নেই। ২৬ ডিসেম্বর মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ১০টায়। কুয়াশা–বৃষ্টির মধ্যে জাতীয় সংগীতের পরিবেশনের মাধ্যমে হয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। দিনভর ছিল নানা আয়োজন। সন্ধ্যায় আবার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রাতে আবার ফায়ার ক্যাম্প, গান, নাচ ও গল্প চলে, দলে দলে বিভিন্ন তাঁবুতে গিয়ে নম্বর নেওয়া, পরিচিতি হওয়া, এভাবে চলে রাত তিনটা পর্যন্ত।

২৭ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় মনে কষ্ট নিয়ে মৌচাক মাঠ ছেড়ে ফেনীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও জাতীয় পর্ষদ সুন্দর ও সফল একটি প্রোগ্রাম শেষ করতে পেরেছে। এই তিনটি দিন সারা জীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে। এখনো মন মৌচাক মাঠে পড়ে রয়েছে।

সহসভাপতি, ফেনী বন্ধুসভা