‘এই রুপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে সেদিন অশ্রু তুমি রেখো গোপন করে’
—গানটির তালে তালে আইয়ুব বাচ্চুর জীবনসঙ্গী ফেরদৌস আইয়ুব চন্দনা এবং আইয়ুব বাচ্চুর বন্ধুবান্ধব স্বজন ও ভক্তরা মিলে যখন কেক কাটছিলেন, তখন আমার খুব মনে পড়ছিল রুপালি গিটার গানটির কথায়। গানের কথা মানুষের জীবনের সঙ্গে মাঝেমধ্যে চোখের সামনে খেলা করে। বাচ্চুর জন্মদিনে কেক কাটার সময় চন্দনা ভাবি অশ্রু গোপন রাখার চেষ্টা করেও পারেননি। অশ্রুঝরা নয়নে কেক কাটলেন। অনুষ্ঠান শেষে চন্দনা ভাবির হাতে আইয়ুব বাচ্চুকে উৎসর্গ করা ‘কালের সাক্ষী পটিয়া’ বইটি উপহার দিলাম। তিনি বললেন, বাচ্চু তো পটিয়ার বইটা পেলে খুব খুশি হতো।
গত বছর আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনের আয়োজনে দেশের কিংবদন্তি এই শিল্পীর জন্মদিনে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে গিয়ে অভিভূত হয়েছিলাম আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি তাঁর স্বজনদের ভালোবাসা দেখে।
‘আইয়ুব বাচ্চু সেলিব্রিটিং লাইফ, লিগ্যাসি অ্যান্ড চলো বদলে যাই’ শিরোনামের এ আয়োজনে গিটার জাদুকরের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অনেকে চোখের অশ্রু মুছেছেন। গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, গীতিকার আসিফ ইকবাল, সংগীতশিল্পী নকীব খান, পার্থ বড়ুয়া, বাপ্পা মজুমদার, পিলু খান, শাফিন আহমেদ, সুরকার ফোয়াদ নাসের বাবু, আইয়ুব বাচ্চুর জীবনসঙ্গী ফেরদৌস আইয়ুব চন্দনাসহ অনেকে।
আইয়ুব বাচ্চুর অন্তিমযাত্রা ছিল ২০১৮ সালে ১৮ অক্টোবর। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে গিয়েছিলাম শুক্রবার বাদ জুমার পর, জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। ওনার জানাজায় দেখেছি অশ্রুসিক্ত ভক্তদের ঢল। মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। চিরবিদায়ের দিন মানুষের উপস্থিতিতে বোঝা যায় মানুষটি কেমন ছিলেন। এক মুঠো মাটির অন্তিম যাত্রায় তাঁর কফিনবাহী গাড়ি যখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আমার খুব মনে হচ্ছিল, বাচ্চু ভাই যেন বেঁচে আছেন। কাঁধে হাত দিয়ে বলছেন, ‘রশীদ এনাম, বাড়ি হন্ডে পইট্টে নে? আঁইও পটিয়ার। আঁরা চাটগাঁইয়া ফোয়া মেডিত ফইরলে লোহা হা হা হা।’
তাঁর সমাধিতে কখনো যাওয়া হয়নি। কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু ঘুমিয়ে আছেন চট্টগ্রাম নগরীর স্টেশন রোডসংলগ্ন চৈতন্য গলি (বাইশ মহল্লা) গোরস্তানে তাঁর মায়ের কবরের পাশে।
এই তো সেদিন ওনার স্কুলবেলার বন্ধু মহসিন ভাইকে ফোনে বললাম, ‘ভাইয়া, বাচ্চু ভাইয়ের কবর জিয়ারত করতে যাব।’
সেদিন ছিল শুক্রবার গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্দুর সূর্য ঠিক মাথার ওপর। চট্টগ্রাম স্টেশন রোডে মানুষের ভিড়। কুলি ঠেলাগাড়ি করে মালামাল নিয়ে যাচ্ছেন। ক্লান্ত শরীর থেকে বৃষ্টির মতো টুপটাপ ঝরে পড়ছে গাম। উপায় নেই ওঁদের বিশ্রাম নেওয়ার। গাড়ির পেছনে যাঁরা ঠেলছিলেন, তাঁরা দুজনে হাঁপাচ্ছেন।
জুমার নামাজ শুরু হওয়ার আগে চৈতন্য গলি মসজিদের কাছে পৌঁছালাম। নামাজ শেষে কবরস্থানে প্রবেশ করলাম আইয়ুব বাচ্চুর সমাধির খোঁজে। বিশাল কবরস্থান মাঠির যাত্রার শেষের ঠিকানা। মহসিন ভাইয়ের ফোন বন্ধ। কবরস্থানে ঘুরতে লাগলাম। কার কবর কোনটা, কোনো এপিটাফ নেই। অনেকে তাঁদের প্রিয়জনের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে গোপন অশ্রু বিসর্জন দিয়ে প্রার্থনা করছেন। সারি সারি মাটির কুঁড়েঘরগুলো মাছের পিঠের মতো দরজাবিহীন অনন্ত স্মৃতির ঠিকানা। ঘরগুলোর আয়তন সাড়ে তিন হাত। বাচ্চু ভাইয়ের গানের কথা মনে পড়ল—‘টাকা-করি ধন-সম্পত্তি অনেক অনেক বাড়ি-গাড়ি ঠিকানার ছড়াছড়ি আমি তুমি বাড়াবড়ি—ঠিকানা শুধু এক সমাধি সাড়ে তিন হাত মাটি’।
সমাধির মাঝে নানা রকমের ফুলের গাছ। অনেকে কবর জিয়ারত করে কবরে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। একসময় মহসিন ভাইকে খুঁজে পেলাম। তিনিও তাঁর ছোট ছেলে আবদুল্লাহকে নিয়ে কবর জিয়ারত করতে এসেছেন। কবরস্থানে শেষ মাথায় সুফিসাধক জঙ্গি শাহর মাজারের পেছনে জবা ফুলগাছের নিচে আইয়ুব বাচ্চুর কবর। মহসিন ভাই বললেন, ‘স্কুলবেলার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন বাচ্চু। তার সঙ্গে যত কথা হয়েছে, ভেতরের ভালোবাসাটুকু কেড়ে নিয়েছে সে। তাকে ভালো না বেসে পারা যায় না। সে শিখিয়েছে মানুষকে কীভাবে আপন করে নিতে হয়। মানুষকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, ভালোবাসতে হয়। বিনয়ী সদালাপি অমায়িক বন্ধুকে আল্লাহ ওপারে ভালো রাখুক।’
ফৌজিয়া জামান মুন্নী সম্পর্কে বাচ্চুর কাজিন। তিনি বলেন, ‘বাচ্চু ভাই আমাদের নিজের আপন বোনের মতো জানতেন। আমার গায়েহলুদে বাচ্চু ভাই বন্ধুবান্ধব নিয়ে সারা রাত গান করেছেন। খুব আমুদে প্রকৃতির ছিলেন। বাচ্চু ভাই খুব অভিমানী ছিলেন। রাগ করে যেদিন বাসা থেকে চলে যান, বাসার সবাই ভাইয়ার জন্য কান্নাকাটি করেছি।’ শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘এত তাড়াতাড়ি ভাইয়া চলে যাবে কখনো ভাবতে পারিনি।’
চৈতন্য গলি কবরস্থান থেকে যখন ফিরছিলাম খুব অভিমান হলো, একুশে পদকপ্রাপ্ত কিংবদন্তি শিল্পীর সমাধিটি অরক্ষিত। মনে পড়ছিল প্রথম আলোর মাদকবিরোধী কনসার্ট, জিপিএ–৫ সংবর্ধনা, চট্টগ্রাম সমিতির মেজবান ও মিলনমেলার কথা। রাজধানীর বুকে চট্টগ্রামের মানুষ পেলে খুব আপন করে নিতেন। আইয়ুব বাচ্চু মা–ভক্ত ছিলেন। প্রতিটি কনসার্ট শেষ করতেন রুপালি গিটারে হৃদয় স্পর্শ করা সুর দিয়ে—‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি, সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’
একজন ভালো মানুষের আদর্শ হিসেবে তাঁকে হারিয়ে সেদিন পুরো দেশের মানুষ কেঁদেছিল। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন একজন ভালো শিল্পী, গিটার জাদুকর। যাঁর গিটারের তারের পরতে পরতে এঁকেছিলেন ‘হারানো বিকেলের গল্প’।
তাঁর সমাধি জিয়ারত করে যখন চৈতন্য গলি কবরস্থান থেকে ফিরছিলাম, খুব মনে পড়ছিল বাচ্চুর যে গান গাওয়ার কথা ছিল, যে গান গাওয়া হয়নি। জন্মদিনে গীতিকার আসিফ ইকবাল আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন—
‘অহংকারে পতন জপো অবিরত
বিনয়ে করিতে পারো পৃথিবীকে নত
জীবন ধ্বংস হয় চকিত ক্রোধে।
ধৈর্যকে দিয়ো ঠাঁই মননে ও বোধে
আকাঙ্ক্ষা জীবনে থাকিতেই পারে
সদাই হয়ো না লোভের বাজারে
পেয়েছ যা কিছু সে তোমার নয়
গর্ব ভুলে ও কভু না যেন হয়।
কখনো নিজেকে ভাবিও না বড়
বড় যদি হও তবে মাথা নথ করো
ত্যাগের অপর নাম বন্ধু জীবন।
ভালোবাসো মানুষে রাখিবে স্মরণ
ভালোবাসার চেয়ে পৃথিবীতে বড় কিছু নাই
মরিতে চাহি না আমি ভালোবাসিয়াই।’
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, চৈতন্য গলি কবরস্থানে তাঁর সমাধিটি সংরক্ষণ করা হয়নি। নেই কোনো এপিটাফ। সাবেক সিটি মেয়র বলেছিলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চুর নামে চট্টগ্রামে সড়কের নামকরণ করবেন। তা–ও হয়নি। তাঁর দাদার বাড়ি পটিয়া খরনা গ্রামেও কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। চট্টগ্রাম নগরীতে তাঁর মৃত্যুর পর প্রবর্তক মোড়ে রুপালি গিটারের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল।
সমাধি সংরক্ষণসহ চট্টগ্রামে একটি রুপালি গিটার একাডেমি ও সড়কের নামকরণ করার জন্য চট্টগ্রামের বর্তমান সিটি মেয়রসহ জনপ্রতিনিধিদের সবিনয় নিবেদন করছি। ৬৪তম জন্মদিনে শিল্পী ও গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা