ঈদের দিন বাবার সঙ্গে কতজনের বাড়িতে যে যেতাম

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

চট্টগ্রাম শহরে বসে মহালয়ার ভোরে আমরা যেমন রেডিওতে আকাশবাণী প্রচারতরঙ্গ ধরতাম, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র শারদ প্রাতে মনের মধ্যে পুজোর মাতন লাগিয়ে দিয়ে যেতেন; বাংলাদেশ টেলিভিশনে বারবার প্রচারিত নজরুলের ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ...’ গানটির সুর মনের মধ্যে ঈদের আনন্দ জাগিয়ে তুলত।

রমজান এবং ঈদ গোটা একটা মাস স্কুল ছুটি। আমাদের চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নিজের ঘরে বসে মাইক্রোফোনে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা পাঠ করে রমজান মাসের দীর্ঘ ছুটি ঘোষণা করতেন। স্কুল বিল্ডিংয়ের প্রতিটি তলার প্রতিটি ঘরে সাউন্ড বক্স লাগানো ছিল। সেই নব্বইয়ের দশকেও যে যার ক্লাসে বসে আমরা প্রধান শিক্ষকের সব ঘোষণা শুনতে পেতাম। যেদিন রমজান মাসের ছুটি ঘোষণা হবে, দুপুরে ভালো টিফিন দেওয়া হতো। এই স্কুলে প্রতিটি দিনই দুপুরের টিফিন দেওয়া হয়।

স্কুলে টানা এক মাস ছুটি পাওয়ার আনন্দ যেমন আছে, দূরে থাকা প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে না, দুঃখবোধও জেগে উঠত। কাছের বন্ধুদের সঙ্গে তো খেলার মাঠে রোজই দেখা হয়।

চেনা পরিচিত হোটেল বা খাবারের দোকানগুলো ছাড়াও রমজান মাসে অনেকেই এখানে–ওখানে দুপুর থেকে খাবার সাজিয়ে বসতেন। চানা বিরিয়ানি, পেঁয়াজু, বেগুনি এসব ছিল একেবারে প্রধান খাবার। বাসাতে আমরাও কিনে আনতাম। খবরের কাগজে মুড়ি নিয়ে চানা বিরিয়ানি, পেঁয়াজু-বেগুনি ছিঁড়ে ছিঁড়ে মেখে রাখতাম। ইফতার করার সময় হওয়া মাত্রই ভাই–বোনে খেতে শুরু করতাম। রোজা না রেখেও ইফতারের আনন্দে ভরে উঠত রমজান মাস। দুই ধরনের সেমাই কিনতে পাওয়া যেত তখন। যেদিন ঘরে অনেক লোক থাকত, মা নারিকেল কুরিয়ে, বাদাম, কিশমিশ দিয়ে সেদ্ধ করা সেমাই বানাতেন। আর ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই আমরা বলতাম বুম্বাইয়া সেমাই, বানাতে সময় লাগে না; দুধ গরম করে তাতে ছড়িয়ে দিলেই হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে বিকেলে আমাদের টিফিনে উঠে আসত। একবার কোনো একটা কোম্পানি লাচ্ছা সেমাইয়ের মতো খইয়ের একটা প্যাকেট বার করল। নতুন প্রোডাক্ট, দামও ভালোই। আমরা কিনে এনে দুধে দিলাম, দেখলাম গরম দুধের মধ্যে খইয়ের মতো মিলিয়ে গেল। খই তো টিন ভর্তি হয়ে দেশের বাড়ি থেকে আসে। তাই এই লোকঠকানো পণ্য আমরা আর কিনলাম না। দুধের মধ্যে বড় বড় টিনভর্তি ডানো আর রেড কাউ আমাদের মাসিক মুদিবাজারে ঘরে চলে আসত। পাথরঘাটা জাইল্যা পাড়াতে আমাদের বাসার কাছে একজনের বাড়িতে এক খালাম্মা শহরের বুকে গরু পালন করতেন। চেনা–পরিচিতদের দুধ বিক্রি করতেন। আমিও কিনে আনতাম।

বাবার সঙ্গে যেদিন মুসলিম বন্ধুরা এসে হাজির হতেন, সেদিনের ইফতার পার্টি হতো আরও বড়। নানা রকম ফল কেটে, সেমাই বানিয়ে, চানা বিরিয়ানি-পেঁয়াজু কিনে এনে আমরা ইফতার সাজাতাম। বাবার এই বন্ধুরা লক্ষ্মীপূজার দিনেও আমাদের বাসায় মুড়ি চিড়ার মলা, মোয়া ইত্যাদি  প্রসাদ নিতে আসতেন।

ঈদের দিনে দাওয়াত আসত। বাবার সঙ্গে কতজনের বাড়িতে যে যেতাম। কেউ বাবার মতো বিয়ারিং, নানাবিধ যন্ত্রাংশ দোকানের মালিক, কেউ ব্যাংকের ম্যানেজার, কেউবা বাবার কলেজজীবনের বন্ধু। মাংস–পরোটা, হালুয়া, সেমাই কত ধরনের খাবার বানাতেন প্রত্যেকে। আর ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনে সপ্তাহব্যাপী ঈদের নানা রকম অনুষ্ঠান। তখন দেশজুড়ে একটাই টিভি চ্যানেল। টিভিতে সিনেমা দেখার পাশাপাশি গুরুসদয় কাকা ও অনিল মামাদের সঙ্গে হলে গিয়েও সিনেমা দেখতাম। চট্টগ্রাম শহরে একটা হলে তখন ভারতীয় হিন্দি সিনেমাও দেখানো হতো।

দেশ ছেড়ে আসার দুঃখ স্মৃতির ভেতর এখন শুধুই বেদনা জাগিয়ে তোলে। উদ্বাস্তু জীবনে ধুঁকে ধুঁকে মরার সময় প্রায় দুই দশক কোনো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি। কোনো কারণে কাউকে ফোন করতে গেলেও আইএসডি কল ২০০-৩০০ টাকা লেগে যেত। আমাদের সেই টাকা থাকত না। কারও ফোন নম্বরও জানতাম না। আমার জ্যাঠা ভারতে চিকিৎসা করতে এসে মারা গেলেন। আইএসডি কলে সেই খবর দেশে জানিয়েছি।

এখন তো যোগাযোগ কত সহজ। স্মার্টফোনে হোয়াটসঅ্যাপে কলে বিনা পয়সাই কথা বলতে পারি। তা–ও তেমন কারও সঙ্গে কথা বলা হয়ে ওঠে না। অনেক আত্মীয়–প্রিয়জন রাগ করে। তাদেরকে বুঝিয়ে উঠতে পারি না, এখানে প্রতিটি দিন হাতে–পায়ে যুদ্ধ করে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। বুঝিয়ে উঠতে পারি না, কর্মময় দিনের শেষে আমি একজন কবি। কবিতার বিষণ্ণ দিন, বিষণ্ণ মুহূর্তগুলো এভাবেই নৈঃশব্দ্য নীরবতায় বেঁচে থাকে।

দুই.
বাংলাদেশ টেলিভিশনে সন্ধ্যাবেলার আজান শুনতাম। ঠিক তখন আমার মা প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্ধ্যা আরতি করত। পাথরঘাটা গির্জার ঘণ্টা বেজে গেছে গোধূলি লগনে। উল্টো দিকে শহরের এই সেন্ট স্কলাস্টিক গির্জা স্কুলে নার্সারি-কেজিতে আমি পড়তাম। সন্ধ্যাবেলার মায়ের আরতি, টিভিতে আজান আর বেজে যাওয়া গির্জার ঘণ্টা—সবকিছু মিলে মনের মধ্যে শান্ত মায়াবী অন্য রকম একটা অনুভূতির জন্ম হতো।

আজানের ভাষা আমি কি বুঝতাম? প্রতিদিন ভোরে পাথরঘাটা মসজিদের ভেসে আসা আজান শুনে ঘুম ভাঙত। ভোরের বাতাসে অন্য রকম একটা অনুভূতির আবহ। ঠিক যেভাবে মহালয়ার ভোরে রেডিও অ্যানটেনা উঁচু করে দিয়ে আকাশবাণী কলকাতা শুনছি। এপার–ওপার দুই বাংলা মিলে গিয়ে বিরল একটা মুহূর্ত।

আজানের ভাষা আমি বুঝতাম না। আমাদের বাড়িতে ঠাকুমা, বাবা, মামার কণ্ঠে এত যে বেদ চণ্ডী গীতা পাঠ শুনতাম, সেসবের মানেও কি বুঝতাম? উত্তর হলো, না, বুঝতাম না। কিন্তু উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘দ্য সলিটারি রিপার’ কবিতার ভিনদেশি মেয়েটির গানের কথা বুঝতে না পারলেও সুর যেভাবে কবিকে বিভোর করে অনুভূতির ভেতরে গানের কথাচিত্র মেলে ধরত, আমিও সেভাবেই প্রতিদিন শুনে শুনে এই না বোঝা ভাষার অনুভূতিগুলোকে ধারণ করতাম।

আজানের ভাষা না বুঝলেও বাংলাদেশ টেলিভিশনে আজানের শেষে বাংলায় সুন্দর একটি দোয়া পাঠ করা হতো। এখনো ভুলে যাইনি সেই সুন্দর দোয়া পাঠ, ‘হে আল্লাহ, এই পরিপূর্ণ আহ্বান ও শাশ্বত নামাজের তুমিই প্রভু। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লামকে দান কর বেহেশতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান, সুমহান মর্যাদা আর তাঁকে অধিষ্ঠিত করো শ্রেষ্ঠতম প্রশংসিত স্থানে, যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাঁকে দিয়েছ, নিশ্চয় তুমি ভঙ্গ করো না অঙ্গীকার।’

নিজের মাতৃভাষায় প্রতিদিন শোনা এই সুন্দর কথাগুলো, শৈশবে পড়া কবিতা, ছড়ার মতোই চির অমলিন। ঠিক যেভাবে পুজো করার সময় মন্ত্রতন্ত্র না জানলেও মনের ভক্তিই আসল প্রাধান্য পায়, অথবা বাংলা ভাষায় ঈশ্বরের কাছে নিজের প্রার্থনা, নত মস্তকে নিজের ভক্তি নিবেদন করা যায়।

কলকাতায় একটি গুজরাটি মুসলিমদের বিয়ারিং সংস্থায় আমি চাকরি করি। এখানে আমার দায়িত্ব অর্থমন্ত্রীর। মালিকদের সব ভাইয়েরা এবং কর্মচারীরা অনেকেই রোজা রাখেন। স্ট্র্যান্ড রোডের পাশে বড় পাইকারি সংস্থা। ক্রেতার যখন ভিড় লেগে থাকে ঘাড় ঘোরানোর সময় পাই না। কিন্তু তার মধ্যে আমার তৃষ্ণা পেলে কোনো রোজাদার সহকর্মীকে বলি না, এক গ্লাস জল এনে দাও। ওদের ক্ষুধার্থ শরীর, শুকনা বুক আমার তৃষ্ণা মেটানোর কথা বলতেই কেমন কষ্ট হয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইফতারির জন্য ফল কিনে আনাই। সারাটা মাস অন্য খাবার আয়োজনের ব্যবস্থা হয়েই থাকে। ইফতারির সময়ে কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমারও ইফতারি জুটে যায়। আমার যেমন রক্তে সুগারের উৎপাত, আমার বড় দুই মালিকেরও সুগার আছে। আমার মতোই ইনসুলিন নেন। ওনারা স্বাভাবিক কারণেই রোজা পালন করতে পারেন না।

এই গুজরাটি বোরো সম্প্রদায়ের মুসলিমদের চাঁদ দেখে নয়, নিজস্ব ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রমজান মাস শুরু হয় এবং ৩০ দিন পর নির্ধারিত ঈদ আসে। ওদের যেদিন ঈদ হয়, সেদিন আমাদের সংস্থা খোলা থাকে। নিজেদের ধর্মীয় সব আচার–আচরণ পালন করে এসে ওরা অফিস করে। আর যেদিন সবার ঈদ, রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা হয়, সেদিন আমাদেরও ছুটি থাকে। মালিকের নির্দেশমতো মুসলিম কর্মীদের জন্য বোনাসের ব্যবস্থা করি।

বড় পাইকারি দোকান, আমার প্রতিদিন ক্যাশ সামলানোর জন্য খুচরা পয়সা, খুচরা টাকার প্রয়োজন হয়। একজন বৃদ্ধ কাকা রোজ আসেন, যাঁর পেশা হলো কিছু বাট্টার বিনিময়ে সব জায়গায় খুচরার জোগান দেওয়া। ঈদের আগে এই কাকার কাছ থেকে আমি নতুন নতুন নোট সংগ্রহ করে রাখি। সেই নতুন নোট খামে ভরে ভরে মালিকদের সবার জন্য এবং বাড়ির জন্য সালামি পাঠাই। ঈদের দিন নামাজ শেষে এই নতুন নোট গরিব–দুঃখীদের ওরা বিতরণ করেন, আমি জানি। বাড়িতে ছোটদের হাতে হাতে সালামি দিতেও কাজে লাগে। দেশে থাকতে এবং ভিন্ন দেশের নাগরিক হয়ে যাওয়ার পরেও মুসলিমদের অনুষ্ঠানাদি, ধর্মীয় সংস্কৃতি আমাকে একপ্রকার ঘিরেই রেখেছে।

আমার মালিকদের পরিবারের বড় আম্মা মারা গেলেন। কলকাতায় গুজরাটি বোরো সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট মসজিদ এবং কবরস্থান আছে। মসজিদে গেলাম, জানাজা শেষ হওয়ার পর কবরস্থানে গেলাম। কবরে মাটি দিলাম। এরপর ধর্মীয় প্রার্থনার জায়গায় সবার সঙ্গে গিয়ে বসলাম। শোককাতর শান্ত সেই পরিবেশে প্রার্থনার ভাষা কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু প্রার্থনার সুর শরীরের প্রতিটি রোমকূপে কাঁটা দিয়ে ওঠার মতো। বুকের ভেতর হু হু বাড়িয়ে তুলল শূন্যতা, জেগে উঠল আত্মশুদ্ধির পবিত্রতা এবং সবার সঙ্গে আমার মনও মৃত ব্যক্তির প্রতি নিবিড় শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে মিলে মিশে গেল।

করোনায় কঠোর লকডাউনের সময়ে মালিকদের মধ্যে সব থেকে বড় ভাই ইদ্রিস প্যাটেল মারা গেলেন। এবারে বালি থেকে আমি আর কলকাতায় গিয়ে উঠতে পারলাম না। অফিসে আমার পাশেই বসতেন তিনিl কাজের ফাঁকে ফাঁকে কত গল্প হতোl সেই শোক থেকে বর্ষণমুখর একটা দিনে লিখলাম একটা কবিতা—

ছাতা

বৃষ্টি পড়লে আপনি বলতেন
‘রাজীবদা, আপনার ছাতাটা দিন তো...’
শীতের কটা দিন বাদ দিয়ে
গ্রীষ্ম বর্ষা, প্রায় সারা বছরই ঝোলাতে ছাতা থাকে
জানতেন  
আপনি আমার বাবার থেকেও বয়সে বড়
সম্বোধন করতেন, ‘দাদা’
আমি বলতাম, ‘ভাই’
এগিয়ে দিতাম
আপনি এখন মাটির নিচে শুয়ে আছেন
বৃষ্টি পড়ছে
ইদ্রিস ভাই, আপনার আর কোনো ছাতা লাগে না

হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত