স্বপ্নজয়ের জীবনযুদ্ধ

লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।

প্রতীকী ছবি

লড়াই ঠিক সাঁতারের মতো। সাঁতার মানুষকে ডুবে যাওয়া থেকে ভাসিয়ে রাখে আর লড়াই বাঁচিয়ে রাখে। কাউকে বেঁচে থাকার জন্য সারা জীবন লড়াই করতে হয়। আবার কেউ স্বপ্নকে সত্যি করার লড়াইয়ে জীবন কাটিয়ে দেন। এই স্বপ্নবানদের মানুষ পাগলও বলেন। আমাদের দেশে রাজনীতির একটা স্লোগান কমন হয়ে গেছে, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’। কিন্তু আমি বলছি কিছু ব্যক্তিমানুষের লড়াইয়ের কথা। তাদের কারও কারও লড়াই অবিশ্বাস্য, ঠিক যেন রূপকথার মতো।

এক
মেয়েটির বয়স ১৩ বছর। রাজশাহীর আলোর পাঠশালার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। রাতে তাকে বিয়ের ক্ষীর খাওয়ানো হয়েছে। সকালে বরপক্ষ আসে বিয়ের জন্য। মেয়েটি কৌশল করে মাকে বলে যে বিয়ে যখন হচ্ছে, স্কুলে গিয়ে স্যারদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি। এই বলে বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষকদের জানায় যে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মা জোর করে বিয়ে দিচ্ছে। আমি বিয়ে করতে চাই না, বিয়ে বন্ধ করতে হবে।

মেয়েটি বিদ্যালয়ের একজন ভালো ছাত্রী। পড়াশোনার প্রতি খুবই আগ্রহ তার। বাবা নেই। মা অন্যত্র আবার বিয়ে করেছেন। কয়েক দিন আগেই মেয়েটি জানিয়ে রেখেছিল যে তার মা ও সৎবাবা তাকে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁরা যেকোনো সময় তার বিয়ে দিয়ে দেবেন। কিন্তু পড়াশোনা শেষ না হওয়ার পর্যন্ত বিয়ে করতে চায় না সে। যেভাবেই হোক এ বিয়ে ঠেকাতে হবে।

শিক্ষকেরা মেয়েটির বাসায় গেলেন। মাকে বুঝিয়ে বলার পরে মেয়েকে বিয়ে দেবেন না বলে মা ওয়াদা করলেন এবং বললেন যে বরপক্ষের লোকজনকে বিদায় করে দিয়েছেন। এরই মধ্যে মেয়েটি এসে শিক্ষকদের কানে কানে বলল, বরপক্ষের লোকজনকে পাশের বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। শিক্ষকেরা চলে গেলেই তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হবে। শিক্ষকেরা পাশের বাড়িতে গিয়ে দেখেন যে বরপক্ষের লোকেরা সেখানে বসে রয়েছেন। বোঝানোর পর বরপক্ষ ফিরে যেতে চাইল; কিন্তু তাদের দাবি, গাড়িভাড়া দিতে হবে। এবার শিক্ষকেরা পুলিশ ডাকার প্রস্তুতি নিলেন। বুঝতে পেরে তারা গাড়িভাড়ার কথা ভুলে দৌড় দেন।
মেয়েটি এখন নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ক্লাসে প্রথম। ঘুম থেকে ওঠার আগেই মা কাজে চলে যান। মেয়েটি তাই এক কাপ চা খেয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসে। তার জীবনের লড়াই— তাকে পড়াশোনা শেষ করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। নিজের স্বপ্নকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করে যাচ্ছে সে।

দুই
বাবা ঢাকায় রিকশা চালিয়েছেন সাত-আট বছর। এখন গ্রামে চা-বিস্কুটের দোকান চালান। তাঁর মেয়ে মিতা খাতুন কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, আর স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার আগেই কীভাবে বিসিএস ক্যাডার হলেন, সে লড়াই সবার চেয়ে একটু আলাদা। তাঁর জীবনটা ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে তীরে ভেড়া নৌকার মতো। শুধু দারিদ্র্যের কারণে সময়মতো বই কিনতে গেলে তাঁকে শুনতে হয়েছে ‘না’। ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রী হওয়ার পরেও বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে চাইলে শুনতে হয়েছে ‘না’। দেশের যেকোনো কলেজে ভর্তির মতো নম্বর নিয়ে এসএসসি পাস করলেও তাঁকে শুনতে হয়েছে ‘না’। ভর্তি হতে হয়েছে মফস্সলের একটি বেসরকারি মহিলা কলেজে। এইচএসসিতে উপজেলা ফার্স্ট হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে তাঁকে প্রথমে শুনতে হয় ‘না’। এরপর তাঁর একজন শিক্ষক ক্ষোভে তাঁর বাবার সামনেই বলেছিলেন, পড়াশোনা বাদ দিয়ে তোমার এখন বিয়ে করা উচিত। এ কথা শুনে তাঁর বাবার মাথায় জেদ চেপে বসে। মা পোষা ছাগল বিক্রি করে ভর্তির টাকা জোগাড় করেন। মিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।

শিক্ষাজীবনে এতগুলো ‘না’ শোনার পরেও এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যাননি মিতা। ৪৯তম স্পেশাল বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন শিক্ষা ক্যাডারে। সারা দেশে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাত্র ১৫টি আসন ছিল এই বিসিএসে। অনেক ‘না’কে ডিঙিয়ে অনেক বড় ‘হ্যাঁ’ জয় করে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন মিতা। বিসিএসের রেজাল্ট পেয়ে মাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘মা, তোমার মেয়ে ক্যাডার হয়েছে।’ কথাটা শুনে মা কাঁদতে শুরু করেন। মিতার ভাষায়, ‘আমার স্বপ্নটা মায়ের হয়ে গিয়েছিল। তাই মা ফোন পেয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। বাবা পাশে থেকে “আর কোনো কান্না নয়” বললেন বটে। আসলে আমরা তিনজনই সেদিন শুধু কাঁদলাম।’

মিতা খাতুনের বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকনারায়ণপুর গ্রামে। বাবা মাহাবুল ইসলাম (৪৪)। মা সেলিনা বেগম। মিতারা দুই-ভাইবোন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে টিউশনি করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা-মেয়ে দুজনে মিলে সংসার চালান। মিতার লড়াই এখন অ্যাডমিন ক্যাডারের জন্য।

তিন
দীর্ঘদিন রোগে ভুগে যাঁরা মারা যান, তাঁরা মৃত্যুর আগে ধীরে ধীরে একা হয়ে যেতে থাকেন। একাকিত্বের যন্ত্রণা মানুষটিকে আরও বেশি অসুস্থ করে তোলে। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো হয় আরও বেশি যাতনাময়। আমাদের দেশে এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয়তো মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটির পাশে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেকেরই হাসপাতালে নিঃসঙ্গ মৃত্যু হয়। পরিসংখ্যান বলছে, উন্নত দেশ জার্মানিতে একাকী মারা যাওয়ার হার খুব বেশি। মানুষের গগনচুম্বী অর্থনৈতিক সচ্ছলতার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে নির্মম একাকিত্ব।

আর সে কারণেই মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সঙ্গ দেওয়ার জন্য এখানে তৈরি হয়েছে ‘হজপিস’ আন্দোলন। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের হজপিস কর্মী বলা হয়। ২০১০ সালের কথা; হজপিস কর্মী হিসেবে জার্মানিপ্রবাসী বাংলাদেশি আবদুল্লাহ আল হারুন ৬০ জন মৃত্যুপথযাত্রীকে সঙ্গ দিয়েছেন। শুনেছেন তাঁদের মনের গোপন কথা। জীবন- মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পাওয়া না-পাওয়ার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়ে মৃত্যুভয়কে জয় করার জন্য তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। শেষ সময়ে এক বুক মমতা নিয়ে মানুষের মৃত্যুভয়কে জয় করার লড়াইয়ে নেমেছেন তিনি।

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আবদুল্লাহ আল হারুন কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাজীবন শুরু করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে জার্মানিতে যান।

আবদুল্লাহ আল হারুন, যাঁদের মৃত্যুশয্যায় সঙ্গ দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মারিয়া নামের সাত বছর বয়সী এক শিশু তাঁকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে। মারিয়া তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে যেতে পেরেছিল। তার মধ্যে দুই বছরই হারুন এই শিশুটির হাত ধরে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছেন। মৃত্যুশয্যায় থাকা এই শিশুটি তাঁর জীবনে অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে রয়েছে। হারুন বলে যান—
‘সেদিন শুক্রবার সকাল থেকেই বৃষ্টি। হেমন্তের শেষ বর্ষণ। আমি ঢুকতেই মারিয়া বলল, “আঙ্কেল, আমি একটা ছড়া লিখেছি তোমার জন্য। এ ছড়াটি তোমার মেয়েরা এখানে এলে তাদের পড়ে শোনাবে। জার্মান ভাষায় অর্থ বলে দেবে।” আমি বললাম, “এখনই তো লিখে দেশে পাঠাতে পারি ওদের জন্য।” মারিয়া বলল, “না। ওরা যখন এখানে আসাবে, আমি জিজ্ঞেস করব, ওরা তোমার কাছে আমার লেখা কাগজ থেকে ছড়াটি শুনেছে কি না।” আমি অত্যন্ত লজ্জিত মারিয়ার কাছে, ওর সেই অমূল্য লেখাটি আমি বারবার বাসা বদলের জন্য কবে না জানি অজান্তেই হারিয়ে ফেলেছি। একদিন ও বলেছিল, “আঙ্কেল, একটি প্রতিজ্ঞা কি তুমি আমায় করবে?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই।”

‘আমি মাথাটা ওর মুখের কাছে নিয়ে আস্তে আস্তে বললাম, “আমাকে স্বাচ্ছন্দ্যে সব বলতে পারো।” “হ্যাঁ, তবে আগে শপথ করো, মাকে কখনোই বলবে না।” আমি রীতিমাফিক কড়ে আঙুলের শপথটি সমাধা করার পর ও বলল, মায়ের হীরার নেকলেসটি না বলে স্কুলে বান্ধবীদের দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। যাওয়ার পথে কীভাবে জানি ব্যাগ থেকে রাস্তার কোথাও পড়ে হারিয়ে যায়। বুঝতে পারেনি, স্কুলে এসে দেখে হারটি নেই। তখনই বেরিয়ে স্কুলে আসার রাস্তায় চার-পাঁচবার পাগলের মতো খুঁজেও পায়নি। মাকে বলার সাহস হয়নি। নেকলেসটি তার বাবা মাকে উপহার দিয়েছিলেন।

‘মারিয়ার প্রতি তার মা ডায়নার এতটা বিশ্বাস ছিল যে মাত্র একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, হারটি কোথাও দেখেছে কি না। এরপর আর কোনো দিন এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। কিন্তু মারিয়া বহুবার দেখেছে হারের শূন্য বাক্সটি নিয়ে মা মৃত বাবার ছবির সামনে বসে কাঁদছেন। কিন্তু নেকলেস হারিয়ে ফেলার কথাটা মাকে জানানোর সাহস করে উঠতে পারেনি সে। আমি বললাম, “তুমি আমায় বললে, তোমার এখন আর এ ব্যাপারে কোনো দোষ নেই। এখন সব ভুলে যাও।” আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ল।

‘দুই দিন পরই মারিয়া আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গেল। আমি আর ওদের বাসায় যাইনি। ওই দিনই মনে মনে ওর কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়ে এসেছিলাম। আমি মারিয়ার হারের ঘটনা ওর মাকে বলিনি।’

২০১০ সালের পরে আবদুল্লাহ আল হারুনের সঙ্গে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। জানি না, আজও হজপিস কর্মী হিসেবে মৃত্যুপথযাত্রীদের পাশে থাকার লড়াই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন কি না।

চার
রজার গোয়েন। জন্ম ১৯৪১ সালে। বাড়ি যুক্তরাজ্যের গ্লস্টারশায়ারে। সামাজিক নেতৃত্ব বিষয়ে এমএ। রজার ১৯৬৪ সালে সার্ভিস সিভিল ইন্টারন্যাশনাল (এসসিআই) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হয়ে প্রথম ঢাকায় এসেছিলেন। রজার বাংলা শিখেছিলেন। বলেন বাঙালিদের মতোই। লেখেনও চমৎকার। আরও মজার বিষয় হচ্ছে, সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন তিনি। রজার একজন ‘ভিনদেশি বাঙালি’।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রজার লন্ডনে বাংলাদেশ সংগ্রাম পরিষদের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে বাঙালিদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। অক্টোবরে (১৯৭১) গ্রানাডা টেলিভিশন কোম্পানির সঙ্গে আবারও বাংলাদেশে আসেন। তাঁরা পাকিস্তান সরকারের অনুমতি নিয়ে গ্রানাডা টেলিভিশনের পক্ষ থেকে ঢাকায় ঢোকেন। পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছিল, তাঁরা অধিকৃত অঞ্চলে খাদ্য বিতরণের ছবি তুলে টেলিভিশনে প্রচার করবেন। রজার যে বাংলা জানতেন, এটা সরকারের লোকজন জানত না। লন্ডনে বাংলাদেশ সংগ্রাম পরিষদের কাজ করেন—এ তথ্যও তাদের কাছে ছিল না। এই সুযোগে রজার ওই দলের গাইড ও দোভাষী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের চিত্র ধারণ করেন। নোয়াখালী, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম এবং চরাঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির ছবিও তোলেন। কিন্তু সেগুলো প্রচার করতে গিয়ে বাধল বিপত্তি।

পাকিস্তান সরকার ফিল্মের পুরো বিল চেক না করে ছাড়বে না। কিন্তু রজারের ভিডিওগুলো রঙিন ফিল্মে ধারণ করা। প্রসেস করতে হলে লন্ডনে পাঠাতে হবে। রজার রাজি হলেন লন্ডন থেকে প্রসেস করে আনতে। পাকিস্তান সরকার তা না করে শান্তিনগরে অবস্থিত তৎকালীন ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশনস দপ্তরে তাঁর সব নেগেটিভ আটকে রাখল। পরে একজন বাঙালি কর্মকর্তা ‘পাসড’ সিল দিয়ে এগুলো গোপনে রজারের হাতে তুলে দেন। এরপর ইংল্যান্ডের গ্রানাডা টেলিভিশন প্রচার করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই ভিডিও চিত্র।

রজারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ২০১৬ সালে। চিঠি চালাচালি হয় ই-মেইলে। তিনি হুমায়ূন আহমেদের জোছনা ও জননীর গল্প বইটির ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। নাম দিয়েছেন লিবারেশন। প্রকাশক রজার নিজেই।

রজার চমৎকার বাংলায় লিখেছেন, ‘জোছনা ও জননীর গল্প বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলাম এই আশায় যে এ দেশে (ইংল্যান্ড) যত বাঙালি মা-বাবাদের ছেলে ও মেয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে বাঙালি হলেও বাংলা ভাষা ভালোমতো জানে না এবং বাংলা বই পড়তে পারে না, তারা এ বইটা ইংরেজিতে পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম সম্বন্ধে অনেক কিছু শিখতে পারবে। ইতিহাসের বই পড়ে যেটুকু বোঝা যাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি বোঝা যাবে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসটি পড়লে—এই ছিল আমার ধারণা। কারণ, জোছনা ও জননীর গল্প ১৯৭১-এর পরিবেশ, সমাজ, ভাব, ঘটনা—সবকিছু মিলিয়ে অতুলনীয় এক জীবন্ত চিত্র। এ দেশের বাঙালি ছেলেমেয়েরা অনেকেই ১৯৭১-এর ঘটনা সম্বন্ধে কিছু জানে না, বাংলাদেশের অবস্থা কেমন ছিল, কত কষ্টে স্বাধীন হয়েছিল, তারা জানে না। তাদের এসব কিছু বোঝানোর আশায় কাজটা করেছিলাম।’

রজারের জীবনের লড়াই ছিল মায়ের সেবা করা। মায়ের সেবা করার জন্য তিনি বিয়ে করেননি। ২০১৬ সালে আমার সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তাঁর মায়ের বয়স হয়েছিল প্রায় ৯৫ বছর। কয়েক দিন আগে রজারের এক বন্ধুর মাধ্যমে জানার চেষ্টা করেছিলাম রজার কেমন আছেন। তিনি খোঁজ নিয়ে জানালেন, রজার ইতিমধ্যেই বার্ধক্যজনিত রোগে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রজারের জীবনের লড়াই ছিল সারা পৃথিবীর কার্বন নিঃসরণের বিরুদ্ধে। জীবনের একপর্যায়ে এসে রজার বিমানভ্রমণ বন্ধ করে দেন। একজন মানুষের লড়াই হয়তো পৃথিবীকে বদলাতে পারবে না। কিন্তু নিজের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে লড়াই চালিয়ে গেলেন তিনি। যে যার জায়গা থেকে লড়াই করে গেলে সত্যিই পৃথিবীটা একদিন বদলে যাবে।