ভালো থেকো আব্বা
হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একজনও খারাপ বাবা নেই।’
যদি প্রশ্ন করেন—তোমার জীবনের হিরো কে? আমি বলব, আমার আব্বা।
আব্বা পেশায় ছিলেন জেলে, লেখাপড়া জানতেন না। গ্রাম্য একজন সহজ–সরল, নির্ঝঞ্ঝাট, ঝামেলামুক্ত সাদাসিধে লোক। তাহলে হিরো কেন?
আমাদের এলাকা ‘বাছের ডাকাতের এলাকা’ বলে পরিচিত ছিল। পাড়ার কেউ কেউ তখন ডাকাতি করতে যেত। তখন সংসারে প্রচণ্ড অভাব–অনটন। আব্বা মাকে বলতেন, ‘গতরের ঘাম ঝরিয়ে খাব, কিন্তু অসৎ রোজগার আমার সন্তানের মুখে দেব না।’
আব্বা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। বোন–ভাবিদের নিয়মিত কোরআন পড়ার ওপর জোর দিতেন। আমাকে রাতে বুকে নিয়ে ঘুমাতে চাইতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, কপালে চুমু খেতেন। আমি তখন বেশ বিরক্ত হতাম। আব্বার যখন চলে যাওয়ার সময়, আমি কিছুটা বেড়ে উঠেছি। আব্বা মনে কোনো কষ্ট পেলে আমাকে আলাদা করে ডেকে ঘটনা বলতেন আর কান্না করে দিতেন। মনে হতো, তিনি আমার সন্তান আর আমি তাঁর বাবা।
আব্বার সঙ্গে নদীতে মাছ মারতে যেতাম। হাত ধরে মাহফিলে নিয়ে যেতেন, রাতে ঘুমিয়ে পড়তাম—ঘাড়ে করে বাড়িতে আনতেন। ঈদগাহে যেতাম। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে ঘেরের হ্যারির টাকা গোপনে এনে আমাকে দিতেন পড়াশোনার খরচের জন্য।
আমাদের এলাকার ওড়াতলায় সাপ্তাহিক হাট হতো। আব্বার হাত ধরে হাটে যেতাম। বারবার জিজ্ঞেস করতেন, ‘কী খাবি?’ আমি নিশ্চুপ। পরে আব্বা নিজের পছন্দমতো খাবার কিনে দিতেন।
আব্বা যখন যেখানেই যেতেন, সব সময় খাবার নিয়ে বাড়িতে ফিরতেন। আমরাও পথ চেয়ে থাকতাম।
আব্বা মারা গেছেন। গত ২৯ জুন ৯ বছর হলো। অসংখ্য স্মৃতি যখন মস্তিষ্কে ভেসে ওঠে, তখন আবেগময় মনটা বড্ড বেশি ভারী হয়ে ওঠে। গায়ের রক্তমাংস পানি করে, বাঘের মুখ থেকে আয় করে এনে, দিনরাত এক করে, অকূল সমুদ্র থেকে রোজগার করে এনে আমাদের একচিলতে সুখের জন্য যে মানুষটি জীবনের সবটুকু বিসর্জন দিলেন, আমাদের এ সুখের দিনে তাঁকে পাইলাম না কাছে! এ দুঃখ কীভাবে বিলাপ করি?
তাই তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—
‘তোমার হল শুরু, আমার হল সারা—
তোমায় আমায় মিলে, এমনি বহে ধারা।
তোমার জ্বলে বাতি তোমার ঘরে সাথি—
আমার তরে রাতি, আমার তরে তারা।
তোমার আছে ডাঙা, আমার আছে জল—
তোমার বসে থাকা, আমার চলাচল।’
পরপারে ভালো থাকবেন আব্বা।
বন্ধু, খুলনা বন্ধুসভা