সকালে হঠাৎ মিলন ভাই কল দিয়ে বললেন, ‘আসিফ, খবর শুনছ? আমাদের বন্ধু হাবীব ইমন আর নেই।’
শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, কেউ ভুল বলছে। আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘হাবিব ইমন ভাই মারা গেছেন?’
এই তো মাত্র পাঁচ-ছয় দিন আগে হবে হয়তো, মাস্টারপাড়ায় দেখলাম ওনাকে। আমার একটু তাড়া ছিল, একপ্রকার দৌড়ের ওপর ছিলাম। তাই দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারলাম না। একপ্রকার নিজেকে আড়াল করে চলে গেলাম।
৫ এপ্রিল, সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে, হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। নোয়াখালী বন্ধুসভার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। একজন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও সংগঠক হাবীব ইমন বিদায় নিলেন আমাদের থেকে। ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে, এভাবে বিদায় নেবেন!
হাবীব ইমন ছিলেন আমার স্কুলের বড় ভাই। যদিও তিনি নোয়াখালী জিলা স্কুলের ১৯৯৮ ব্যাচের ছাত্র আর আমি ২০১৮ ব্যাচের। তিনি সেই সময় থেকেই লেখালেখি, সংগঠন আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেন। বিশেষ করে প্রথম আলো বন্ধুসভার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলা ছিল গভীর। যতটুকু জানি, তাঁর জীবনের প্রথম সংগঠন ছিল বন্ধুসভা।
২০২১ সালে তিনি নোয়াখালী বন্ধুসভার এক ঈদ পুনর্মিলনীতে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে বলেছিলাম, ‘ভাই, আপনার একটা লেখা চাই।’ পরবর্তী সময়ে তিনি একটা প্রবন্ধ লিখলেন—‘বন্ধুসভা—অধিকতর আনন্দের স্বপ্ন’ শিরোনামে। সেই লেখাটায় তিনি বন্ধুসভাকে শুধু একটি সংগঠন হিসেবে না দেখে পরিবার হিসেবে দেখেছিলেন। যেখানে মানুষ একত্র হয়, শেখে, ভাবে এবং বড় হয়।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে, বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের দিকে, প্রথম আলো বন্ধুসভার সূচনালগ্ন থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। নোয়াখালী বন্ধুসভার প্রথম কমিটিতে তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ধীরে ধীরে সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকে পরিণত হন।
সেই লেখাতেই হাবীব ইমন তাঁর শুরুর দিনের কথা বলেছিলেন। খুব বেশি মিশতেন না, একটু নিজের ভেতরেই থাকতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে লেখালেখির মাধ্যমে, পাঠক হিসেবে যুক্ত হয়ে, বন্ধুসভার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়। নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখার আনন্দ থেকে শুরু করে পাঠচক্র। সব মিলিয়ে তিনি একসময় পুরোপুরি যুক্ত হয়ে যান এই পরিবারের সঙ্গে।
হাবীব ইমন আরও লিখেছিলেন সেই সময়ের একটি ঘটনা। ১৯৯৯ সালের দিকে অ্যাসিড–সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তহবিল সংগ্রহের সময় বিভিন্ন স্কুলে যাচ্ছিলেন। একটি স্কুলে গিয়ে ক্লাস সিক্সের এক ছাত্র তার জমানো ৫০০ টাকা তাঁদের হাতে তুলে দেয়। ছোট একটা মানুষের সেই বড় মন তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, সেই মুহূর্ত তাঁকে মানুষ ও সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
হাবীব ইমন ভাইয়ের সঙ্গে আমার পুরোনো কথোপকথনগুলো দেখছিলাম। ফেসবুক ইনবক্স ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম তিনি আমাকে প্রথম মেসেজ করেছিলেন, ‘তুমি করে বলছি। খুব ভালো লেখো।’
আর ২০২৬ সালে, আমি যখন দ্বিতীয়বার নোয়াখালী বন্ধুসভার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করি, তিনি আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সেই মেসেজটা প্রথম আজকে দেখেছিলাম, কিন্তু রিপ্লাইটা দেওয়া হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, একটা সাধারণ ‘ধন্যবাদ ভাই’ বলাটাই সবচেয়ে বড় না বলা কথা হয়ে রইল।
২০২২ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের জাতীয় লেখক সম্মেলনে গিয়েছিলাম। হঠাৎ রাত হয়ে গেল, থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। আত্মীয়স্বজন কারও বাসায় যাব না ঠিক করেছিলাম। ভাইকে বলতেই এক মুহূর্ত দেরি করেননি। নিজেই থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
হাবীব ইমন ভাইয়ের সঙ্গে আমার কখনো সরাসরি কাজের সুযোগ হয়নি। কিন্তু তাঁর সান্নিধ্য অনেকবার পেয়েছি। বহু আড্ডায় বহু জায়গায় তাঁর কথাগুলো শুনতাম।
আজ তিনি নেই। কিন্তু তাঁর লেখা আছে, তাঁর কথা আছে, তাঁর দেওয়া ছোট ছোট উৎসাহগুলো আছে। কিছু মানুষ হারিয়ে যায় না, তাঁরা শুধু স্মৃতির ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে। হাবীব ইমন তেমনই একজন।
আমরা যাঁরা এখন বন্ধুসভা করি, তাঁর সঙ্গে ওইভাবে কাজ করতে পারিনি। কিন্তু একসময় তাঁর সঙ্গে যাঁরা বন্ধুসভা করেছিলেন—সেই ফরহাদ কিসলু ভাই, সুমন নূর ভাই, শামীমা আপা, নিলয় মিলন ভাই, জাহান ভাই, পাপ্পু ভাই, প্রণবদা থেকে শুরু করে নোয়াখালী বন্ধুসভার পুরোনো সংগঠকদের ফেসবুক ওয়াল শোকাচ্ছন্ন। পুরো নোয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ শোকাহত। তিনি শুধু নোয়াখালীর নন, তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য জাতীয় অঙ্গনেও বেশ পরিচিত মুখ ছিলেন। তাঁর কলাম, লেখা জাতীয় দৈনিকগুলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হতো। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক লেখক ও কবি।
ছোট্ট এই জীবনে রেখে গেছেন একগুচ্ছ সাহিত্যকর্ম। একাধারে কবি ও সৃজনশীল লেখক, সাংবাদিক হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে কলাম লেখক হিসেবে সমকালীন বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলো পাঠক মহলে বেশ সমাদৃত ছিল। তিনি বাম ধারার যুব গণসংগঠন বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগরের সাবেক সভাপতি ছিলেন।
ইমন ভাই দেখলেই ডাক দিতেন, গল্প শুরু করে দিতেন। সেদিন ভেবেছি, আবার তো দেখা হবেই, তখন গল্প করব। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক…। এখন খুব আফসোস হচ্ছে। বুঝতে পারিনি, সেই দেখাটাই যে ওনার সঙ্গে শেষ দেখা। আর কোনো দিন ভাইয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প হবে না। খোঁজখবর নেওয়া হবে না।
মাঝখানে একদিন হঠাৎ নক দিয়েছিলেন। একটু রাগ করে বলেছিলেন, ‘আমাকে তো তোমরা এখন ডাকো না। বন্ধুসভায় অনেক দিন আসি না, নোয়াখালী এলে একদিন সময় করে আসব, আড্ডা দেব তোমাদের সঙ্গে।’
সেই আড্ডাটা আর হলো না…
সভাপতি, নোয়াখালী বন্ধুসভা